যুক্তরাষ্ট্রে তারেক রহমানের পাঁচ দিনের সফরে কী কী হলো?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:২৩:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধান হিসেবে এটিই ছিল তাঁর প্রথম জাতিসংঘ সফর। পাঁচ দিনের এই সফরে জাতিসংঘের অধিবেশনে বক্তব্য, একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি, জ্বালানি, রোহিঙ্গা ও জলবায়ু ইস্যু গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সফরে প্রধানমন্ত্রীর ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল। এসব কর্মসূচিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ
সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর একটি ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য। এতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, নারী উন্নয়ন, শিক্ষা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার মতো বৈশ্বিক বিষয় উঠে আসে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রথমবারের মতো সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারেক রহমান বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, প্রধানমন্ত্রী দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—দুই ধরনের শ্রোতাকেই সামনে রেখে বক্তব্য দিয়েছেন। রোহিঙ্গা সংকট, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের মতো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তাঁর বক্তব্যে এসেছে।
রোহিঙ্গা সংকটে পাঁচ দফা প্রস্তাব
সফরে রোহিঙ্গা সংকটও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন।
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই সংকট শুধু মানবিক সমস্যা নয়, এটি পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জেও পরিণত হতে পারে।
১১ দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক উল্লেখযোগ্য।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসব আলোচনায় বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা, জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানো, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার এবং মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১ বিমানের চুক্তি
প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে আরও ১১টি বিমান কেনার চুক্তি করে। তবে প্রধানমন্ত্রী নিজে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের বিমান পরিবহন খাতের সম্প্রসারণের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চুক্তিটিকে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেছে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। তবে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিমান কেনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
এর আগে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় বোয়িংয়ের সঙ্গে আরেকটি চুক্তি হয়েছিল। তখন ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার কথা জানানো হয়।
পারমাণবিক সহযোগিতায় সমঝোতা
সফরের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা সই হয়। প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময়ই এই সমঝোতা হওয়ায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তবে তিনিও এই সমঝোতা স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নেননি।
বোয়িংয়ের চুক্তির মতো পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়টিও সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আগ থেকেই আলোচনায় ছিল। এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ছিল—এমন বক্তব্য বিভিন্ন মহল থেকে এলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে চাপ থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা প্রসঙ্গেও মার্কিন বার্তা
তারেক রহমানের সফরের মধ্যেই নিউইয়র্কে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা শেখ হাসিনার বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক সিদ্ধান্তের প্রত্যাশার কথা জানান। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সফরের অন্যান্য কূটনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি এই বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
মোট কত কর্মসূচি?
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সফরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি, জাতিসংঘের ফাঁকে চারটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান, ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আরও কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চার-পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফরে প্রায় ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সফরকে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আর বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে—প্রথমবারের মতো জাতিসংঘে সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকার ও বৈশ্বিক ইস্যুগুলো একই সঙ্গে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।























