ইউপি ভোটে বদলে গেল নিয়ম, জামানত পাঁচ গুণ—হুমকি দিলে প্রার্থিতা বাতিল

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:০৭:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ঘিরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়মে পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের জামানত পাঁচ গুণ বাড়ানোর পাশাপাশি নির্বাচনি ব্যয়ের সীমাও বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভোটার, নির্বাচনি কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের হুমকি বা বাধা দেওয়ার ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন বিধিমালার সংশোধনী গেজেট প্রকাশ করেছে ইসি। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, এবার ইউপি নির্বাচন হবে নির্দলীয় প্রতীকে। চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে মোট ৪২টি প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে।
জামানত ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার
নতুন নিয়মে চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য প্রার্থীদের জামানতও ১ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার টাকা।
জামানতের অর্থ ট্রেজারি চালান, পে-অর্ডার অথবা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুকূলে জমা দিতে হবে। একই প্রার্থীর একাধিক মনোনয়নপত্র দাখিল হলেও একাধিক জামানত দিতে হবে না।
১৫ শতাংশ ভোট না পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত
জামানত ফেরতের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন কোনো প্রার্থী প্রদত্ত মোট ভোটের অন্তত ১৫ শতাংশ পেলে জামানত ফেরত পাবেন। এর কম ভোট পেলে তা বাজেয়াপ্ত হয়ে সরকারি কোষাগারে জমা হবে। আগে এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল মোট ভোটের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
দ্বিগুণ হলো নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা
চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা ৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে। সদস্য প্রার্থীর ক্ষেত্রেও সীমা ১ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ২ লাখ টাকা।
চেয়ারম্যান প্রার্থীকে নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব পরিচালনার জন্য তফসিলি ব্যাংকে আলাদা হিসাব খুলতে হবে। ওই হিসাব থেকেই নির্বাচনি ব্যয়ের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। কোনো খাতে ২০ হাজার টাকা বা তার বেশি ব্যয় হলে তা চেকের মাধ্যমে পরিশোধের বিধান রাখা হয়েছে।
চেয়ারম্যান প্রার্থীর হলফনামা বাধ্যতামূলক
নতুন বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জন্য হলফনামা দেওয়ার বিধান যুক্ত হয়েছে। এতে প্রার্থী ও তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের দেশে-বিদেশে থাকা সম্পদের বিবরণ দিতে হবে। পাশাপাশি টিআইএন নম্বর ও আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।
হলফনামায় প্রার্থী ফেরারি আসামি কি না, সেই তথ্যও উল্লেখ করতে হবে। তবে সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য প্রার্থীদের জন্য একই ধরনের হলফনামার বিধান রাখা হয়নি।
হুমকি-বাধায় সর্বোচ্চ দুই বছরের সাজা
নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, কমিশন অনুমোদিত গণমাধ্যমকর্মী বা পর্যবেক্ষককে হুমকি, ভয়ভীতি, আঘাত বা বলপ্রয়োগ করে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তাঁদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত করলেও শাস্তির বিধান রয়েছে।
একইভাবে ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, কোনো প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া কিংবা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করাও অপরাধ। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলও করতে পারবে।
কেন্দ্রের ফল স্থগিত, প্রয়োজনে পুনঃভোট
বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি, কারসাজি বা অন্য কোনো অনিয়মের কারণে কোনো ভোটকেন্দ্রের ফলাফল চরমভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হলে সেই কেন্দ্রের ফল স্থগিত করতে পারবে কমিশন। পরে অনুসন্ধানে প্রয়োজন মনে হলে ওই কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোটগ্রহণের নির্দেশও দেওয়া যাবে।
এ ছাড়া দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে বিজয়ী নির্ধারণের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সমান সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে পুনরায় ভোট হবে।
প্রতিবন্ধী ভোটারের জন্য সহায়তার সুযোগ
দৃষ্টি বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা অন্য কোনো কারণে ভোট দিতে সহায়তা প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ভোটারকে সহায়তার জন্য কমপক্ষে ২১ বছর বয়সী একজন ব্যক্তিকে সঙ্গে নেওয়ার অনুমতি দিতে পারবেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা।
ভোটার নিজে ব্যালটে চিহ্ন দিতে না পারলে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী সহায়তাকারী তা করতে পারবেন। তবে সহায়তাকারী প্রার্থী, প্রার্থীর এজেন্ট, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হতে পারবেন না।
থাকছে ৪২ প্রতীক, নেই দলীয় প্রতীক
সংশোধিত বিধিমালায় দলীয় প্রতীকের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে আসন্ন ইউপি নির্বাচন হবে নির্দলীয় প্রতীকে। চেয়ারম্যান পদে ২০টি, সাধারণ সদস্য পদে ১২টি এবং সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে ১০টি—মোট ৪২টি প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান পদে নির্ধারিত প্রতীকগুলোর মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার, কলার ছড়ি, ঘণ্টা, ঘোড়া, চিংড়ি, জগ, টেবিল, টেলিফোন, মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল, রেল ইঞ্জিন, সোফা ও হাঁস।
সাধারণ সদস্য পদে উট, কাপ-পিরিচ, ঘুড়ি, জাহাজ, টর্চলাইট, টিউবওয়েল, ট্রাক্টর, তালা, ফুটবল, বৈদ্যুতিক পাখা, বৈদ্যুতিক বাল্ব ও মোরগ প্রতীক রাখা হয়েছে। সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে থাকছে আলমারি, কলস, পালকি, ফলের ঝুড়ি, মাইক, সেলাই মেশিন, সূর্যমুখী ফুল, হরিণ ও হেলিকপ্টার।
নতুন বিধিমালায় তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনি অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘন নজরদারিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মনিটরিং কমিটি গঠনের সুযোগও রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে আসন্ন ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থিতা, ব্যয়, প্রচারণা, ভোটগ্রহণ ও ফল ঘোষণার ক্ষেত্রে একাধিক নিয়মে পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন।






















