১২৮ স্কুলে নেই প্রধান শিক্ষক, ইসলামপুরে ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থী

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:৫৯:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে
জামালপুরের ইসলামপুরে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ও জনবল সংকট দীর্ঘদিনের। উপজেলার ১৭৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২৮টিতেই নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকের ৫৬টি পদও শূন্য রয়েছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসেও তিনটি সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও), একজন উচ্চমান সহকারী ও একজন অফিস সহকারীর পদ খালি।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি তদারকির সীমাবদ্ধতা ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমে যাচ্ছে। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামপুরে সরকারি, বেসরকারি ও কেজিসহ মোট ২৮৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৭৯টি সরাসরি সরকারি এবং ৯৮টি নিবন্ধিত বিদ্যালয় পর্যায়ক্রমে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৫১ হাজার ৮৭০ জন।
প্রধান শিক্ষক নেই ১২৮ বিদ্যালয়ে
উপজেলার ১৭৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৭৭টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪৮ জন। ফলে ১২৮টি বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে অনুমোদিত ৯৩৬টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৮৮০ জন। অর্থাৎ ৫৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত ২৮টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকায় পদোন্নতি প্রক্রিয়াও দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। ফলে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে কোনো সহকারী শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব আবার কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করা হচ্ছে।
এতে একদিকে যেমন নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক দায়িত্বও সামলাতে গিয়ে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষক সংকটে ব্যাহত পাঠদান
সহকারী শিক্ষকের ৫৬টি পদ শূন্য থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতও স্বাভাবিক নেই। কোনো কোনো শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির পাঠদান ও অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।
২২ সেপ্টেম্বর উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে শিক্ষার্থী উপস্থিতির চিত্রও পাওয়া গেছে হতাশাজনক। বীর সিংহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬৬ শিক্ষার্থীর বিপরীতে উপস্থিত ছিল মাত্র ১০ জন। মোহাম্মদপুর বালুচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনজন শিক্ষক থাকলেও উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ছয়জন।
পূর্ব পোড়ার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে উপস্থিত পাওয়া যায় চারজনকে। দক্ষিণ মোহাম্মদপুর ও সাজলের চর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল চার থেকে পাঁচজনের মধ্যে।
এ ছাড়া দক্ষিণ চিনাডুলী ও হরিণধরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী কাউকেই উপস্থিত পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যমুনার চরাঞ্চলসহ রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষক অনিয়মিতভাবে বিদ্যালয়ে আসার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কেউ কেউ জেলা সদরে বসবাস করায় নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নেতৃত্ব সংকটেও বাড়ছে সমস্যা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় সাধারণ শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, অনেক সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে সহকর্মীরা যথাযথভাবে মানতে চান না। আবার দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরাও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়েন। ফলে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়ে।
কমছে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ
অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো শিক্ষক সময়মতো বিদ্যালয়ে না আসায় শিক্ষার্থীদেরও স্কুলমুখী হওয়ার আগ্রহ কমছে।
অভিভাবক রিপন মিয়া বলেন, উপজেলার অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা মাদরাসায় ভর্তি করাচ্ছেন।
তবে বীর সিংহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেহেনা খাতুন শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে আশপাশে একাধিক নতুন বিদ্যালয় গড়ে ওঠা এবং মাদরাসায় ভর্তি বাড়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, টিফিনের সময় অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি গেলে পরে আর বিদ্যালয়ে ফিরতে চায় না। অভিভাবকদের সচেতনতার ঘাটতিও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ কমার একটি কারণ বলে তিনি মনে করেন।
তদারকি করাও কঠিন
ইসলামপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা স্বর্ণজীব দেব বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন এবং বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন। তবে ১৭৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়মিত তদারকি করা অত্যন্ত কঠিন।
শিক্ষার মানোন্নয়নে স্থানীয় সচেতন মহল ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহির অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। দ্রুত শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ, বিদ্যালয়গুলোর কার্যকর তদারকি এবং শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা না গেলে ইসলামপুরের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা আরও সংকটে পড়তে পারে।






















