১০১ চুক্তি নিয়ে ভারতের সঙ্গে নতুন হিসাব-নিকাশ, ফল জানাবে সরকার

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:৫০:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পর্যালোচনা করছে সরকার। এসব চুক্তি পর্যালোচনার ফলাফল শিগগিরই জানানো হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে সরকারদলীয় অন্যান্য হুইপও উপস্থিত ছিলেন।
১০১ এমওইউ নিয়ে পর্যালোচনা
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের চুক্তি এবং এর আওতায় বন্ধুরাষ্ট্রের জাহাজ চলাচল প্রসঙ্গে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, “আমরা চুক্তিগুলো, মানে সব—১০১টা এমওইউ নিয়ে আমরা আলোচনা করছি এবং সেটার অনতিবিলম্বে ফল আপনারা পাবেন।”
তৃতীয় অধিবেশনে ছয় বিল পাস
চিফ হুইপ জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন নয় কার্যদিবস চলেছে। এ সময়ে ছয়টি বিল উত্থাপন ও পাস হয়েছে। বিভিন্ন বিধিতে মোট ১ হাজার ৬৭৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজে ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর সংসদের অধিবেশন বসার ধারাবাহিকতায় তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে নূরুল ইসলাম বলেন, আগামী অধিবেশনও একই ধারায় অনুষ্ঠিত হবে।
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের ধারা নিয়ে ব্যাখ্যা
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা এবং পরে সমালোচনার মুখে তা বাদ দিয়ে বিল পাসের বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ হুইপ বলেন, সব বিষয়কে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায় না।
তিনি বলেন, সরকার বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। সে লক্ষ্যেই ওই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে কেউ আগ্রহ না দেখানোয় সেটি বাতিল করা হয়েছে।
স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যসংখ্যা ও সভাপতির পদ প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, অতীতে বিরোধী দল থেকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করার নজির খুব বেশি নেই।
তবে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি হিসেবে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে রাখা হয়েছে। সরকারি অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহির ক্ষেত্রে সরকারি হিসাব কমিটি সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কমিটি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নূরুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২৪টিতে বিরোধী দলের সদস্য রাখা হয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে হিসাব করলে এই সংখ্যা কিছুটা বেশি।
তিনি জানান, ২২টি কমিটিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য এবং বাকি কমিটিগুলোতে দুজন করে সদস্য রাখা হয়েছে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন গুরুত্বপূর্ণ
তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া ছয়টি বিলের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, নতুন আইনের মাধ্যমে বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করার পরও সেই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার পাবেন। এর উদ্দেশ্য বৃদ্ধ মা-বাবাকে সুরক্ষা দেওয়া।
অনেক ক্ষেত্রে সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পর বাবা-মা বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন কিংবা তাঁদের যথাযথ ভরণপোষণ হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন আইনে বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তির ওপর ভোগের অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
মানবাধিকার ও গুমবিরোধী বিলেও কঠোর বিধান
এই অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাস হয়েছে বলেও জানান নূরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, বিলগুলো তৈরির আগে বিভিন্ন অংশীজন, আইনজীবী, বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের মতামত নেওয়া হয়েছে। ১৬ জন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গেও আলোচনা করে তাঁদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে।
চিফ হুইপ বলেন, অধ্যাদেশে শাস্তির ক্ষেত্রে যে সীমা ছিল, পাস হওয়া বিলে তা আরও কঠোর করা হয়েছে। এমনকি মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।
প্রতিবেশীসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক চায় সরকার
বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলেও জানান চিফ হুইপ। তবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
নূরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়। তবে যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ বেশি, তাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দেশের যথাযথ মর্যাদার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হবে।
পাঁচ মাসে ২০৫ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ
সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয় তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া ২০৫ কোটি ডলারের ঋণ গত পাঁচ মাসে পরিশোধ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই অর্থ জনগণের করের টাকা। তাই সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধে বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সরকারি অর্থের একটি টাকাও যাতে অপচয় না হয়, সে চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা
দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সমালোচনার বিষয়ে নূরুল ইসলাম বলেন, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে অন্তত দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে। ফলে চাইলেই দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ খাতে আগের সরকারের বিভিন্ন চুক্তি ও দায়মুক্তিরও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কিছু কেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে, এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে।
তিনি জানান, আগের সরকারের করা দায়মুক্তির বিধান বাতিল করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিবর্তে সরকারকে সরাসরি ক্ষমতা দেওয়ার ব্যবস্থারও সমালোচনা করেন তিনি।
‘জুলাই সনদের পুরোটা বাস্তবায়ন হবে’
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার বলে মন্তব্য করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, “জুলাই সনদের বিষয়ে সরকারের অবস্থান দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন পর্যন্ত পরিষ্কার। সরকার পুরোটা বাস্তবায়ন করবে।”
জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদে স্বাক্ষর হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি বাস্তবায়নের কথা বলেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাই সরকার জুলাই সনদ শতভাগ বাস্তবায়ন করবে।
তবে চিফ হুইপ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধান সংশোধন ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।
বিরোধী পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনের পর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও নূরুল ইসলাম বলেন, সংস্কার করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতেই হবে।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী আনা হয়েছে। ভারতেও সংবিধান বহুবার সংশোধন করা হয়েছে।























