কাদিরহাট নুনতোর জামে মসজিদের সম্পত্তি ও আয়-ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন
৩৮৫ একর জমি, তবু মসজিদ জরাজীর্ণ—খাজনা বকেয়া অর্ধকোটি!

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:২৮:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার কাদিরহাট নুনতোর জামে মসজিদের নামে রয়েছে প্রায় ৩৮৫ দশমিক ৭৮ একর জমি। বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকার পরও ঐতিহ্যবাহী মসজিদটির অবকাঠামো রয়েছে জরাজীর্ণ অবস্থায়। এ অবস্থায় মসজিদের সম্পত্তি, ইজারা, আয়-ব্যয় ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মসজিদের নামে থাকা বিপুল সম্পত্তি সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা ও ইজারা দেওয়া হলে সেখান থেকে পাওয়া আয় দিয়ে মসজিদের সংস্কার, উন্নয়ন এবং মুসল্লিদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে বিপুল সম্পত্তি থাকার পরও মসজিদের দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। বরং দিন দিন এর অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ছে।
এ নিয়ে মসজিদের সম্পত্তি থেকে কত টাকা আয় হচ্ছে, সেই অর্থ কোথায় জমা হচ্ছে এবং কোন কোন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মুসল্লিরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাজী ঢাকনা মুহাম্মদ সরকার কাদিরহাট নুনতোর জামে মসজিদের নামে জমি দান করেছিলেন। ওই দান করা সম্পত্তিই পরবর্তী সময়ে মসজিদের অন্যতম প্রধান সম্পদে পরিণত হয়। স্থানীয়দের দাবি, ১৯৫৪ সালে মসজিদের সম্পত্তির কয়েকজন ওয়ারিশ কাদিরহাট এলাকা থেকে নেকমরদ এলাকায় চলে যান। পরবর্তী সময়ে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৩২৭ নম্বর স্মারকের মাধ্যমে সম্পত্তি বিভাজন ও ভোগদখলসংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী ওয়ারিশদের সম্পত্তি ভোগদখলের বিষয়টি নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে কাদিরহাটের কিছু লোক নেকমরদ এলাকায় গিয়ে ঘরবাড়ি নির্মাণ ও জমি দখলের চেষ্টা করছেন। এতে মসজিদের সম্পত্তি নিয়ে নতুন করে বিরোধ ও জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, ভূমি রেকর্ড ও দখলসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
৮ লাখ টাকা আপ্যায়নে, আরও ২৬ লাখ বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের অভিযোগ
মসজিদ পরিচালনা সংক্রান্ত ২০২৩ সালের ৩৯ নম্বর রেজুলেশন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় মুসল্লিরা। তাঁদের দাবি, ওই রেজুলেশনে ২৩ শতাংশ জমি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আপ্যায়নে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া মামলা পরিচালনা, ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন খাতে আরও প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ের হিসাব থাকার পরও মসজিদের নামে থাকা জমির সরকারি খাজনা প্রায় অর্ধকোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এ নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন—মসজিদের বিপুল জমি থেকে নিয়মিত আয় হয়ে থাকলে সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে? কেনই বা দীর্ঘদিন ধরে জমির খাজনা পরিশোধ করা হচ্ছে না?
‘জমি আছে, আয় আছে—তবু মসজিদের এই দশা কেন?’
স্থানীয় কয়েকজন মুসল্লি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মসজিদের নামে শত শত একর জমি থাকার পরও মসজিদটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকবে—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সম্পত্তি থেকে আয় হয়ে থাকলে সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার হলে মসজিদের এমন দশা হওয়ার কথা নয়।
তাঁদের ভাষ্য, মসজিদের নামে থাকা ৩৮৫ দশমিক ৭৮ একর জমির বর্তমান মালিকানা, দখল, ইজারা, খাজনা এবং জমি থেকে প্রাপ্ত আয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা দরকার। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাবও মুসল্লিদের সামনে তুলে ধরার দাবি জানান তাঁরা।
স্থানীয়দের আরও দাবি, মসজিদের সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। এতে মসজিদের সম্পত্তির প্রকৃত অবস্থা, আয়-ব্যয় ও ব্যবস্থাপনার চিত্র স্পষ্ট হবে বলে তাঁরা মনে করছেন।
স্থানীয় মুসল্লিদের মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এসব সম্পত্তি সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যে আয় হবে, তা মসজিদের উন্নয়ন, সংস্কার ও ধর্মীয় কাজে ব্যয় হওয়াই প্রত্যাশিত। তাই কাদিরহাট নুনতোর জামে মসজিদের বিপুল সম্পত্তি ও অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের দাবি তাঁদের।
অভিযোগের বিষয়ে মসজিদের বর্তমান মোতাওয়াল্লি ইউসুফ আলীর বক্তব্য জানতে মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।





















