কাগজে শ্রমিক, মাঠে এক্সকাভেটর: কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:২৬:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর কথা থাকলেও বাস্তবে খননযন্ত্র (এক্সকাভেটর) ব্যবহার করে কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ফলে প্রকল্পের ম‚ল উদ্দেশ্য—দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি—প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ ৯৪ হাজার ২১৭ টাকা ব্যয়ে উপজেলার ভান্ডগ্রাম মৌজার শাহীবুর রহমানের জমি এলাকা থেকে নন্দুয়ার জওগাঁও ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ৪ দশমিক ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল পুনঃখননের কাজ চলমান রয়েছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রকল্পের উলেখযোগ্য অংশ শ্রমিকের মজুরির জন্য বরাদ্দ থাকার কথা। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, মাঠপর্যায়ে প্রকৃত শ্রমিকের পরিবর্তে অধিকাংশ কাজই করা হচ্ছে খননযন্ত্রের মাধ্যমে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শ্রমিক তালিকায় বিভিন্ন ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করলেও তাঁদের অনেকেই প্রকৃত শ্রমিক নন। অভিযোগ রয়েছে, তালিকায় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক কর্মী এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি দিনের পর দিন সরকারি প্রকল্পের কাজের আড়ালে ব্যক্তিগত খননযন্ত্র ব্যবহার করে খাল খননের কাজ চালিয়ে যাওয়া হলেও প্রকৃত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়নি।
স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের ভাষ্য, খাল পুনঃখননের ম‚ল উদ্দেশ্য ছিল কৃষিজমিতে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসন। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাব এবং অনিয়মের অভিযোগে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, খালের অনেক অংশে এখনো পূর্ণাঙ্গ খননকাজ সম্পন্ন হয়নি। কোথাও কোথাও শুধু ঝোপঝাড় ও আগাছা পরিষ্কার করে দায়সারাভাবে কাজ দেখানো হচ্ছে। অথচ প্রকল্পের অর্থ উত্তোলনের প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের মতে, এতে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার ম‚ল লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সামিয়েল মার্ডি বাংলা টাইমসকে বলেন, প্রকল্পের সব কার্যক্রম সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করেই পরিচালিত হচ্ছে। শ্রমিক তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ নেই।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, যদি শ্রমিকনির্ভর প্রকল্পে শ্রমিকদের পরিবর্তে যন্ত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকে এবং মজুরির অর্থ প্রকৃত উপকারভোগীদের হাতে না পৌঁছে থাকে, তাহলে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাÐ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রকল্পটির আর্থিক ও কারিগরি কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে শ্রমিক তালিকা, অর্থ বরাদ্দ এবং কাজের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ যদি প্রকৃত শ্রমিকদের কাছে না পৌঁছে অন্যের পকেটে চলে যায়, তাহলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
জনস্বার্থে খাল পুনঃখনন প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাঁদের ভাষায়, উন্নয়নের নামে অনিয়ম ও দুর্নীতির সংস্কৃতি চলতে থাকলে সরকারের মহৎ উদ্যোগও জনগণের আস্থা হারাবে। তাই প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

















