নীরব ঘাতকে কাঁপছে বাংলাদেশ, ৫ বছরে বজ্রপাতে ১,৭৪৬ মৃত্যু!
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৬:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ৪২ বার পড়া হয়েছে
দেশে বজ্রপাত একটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪—এই পাঁচ বছরে বজ্রপাতে মোট ১ হাজার ৭৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বছরভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী—
২০২০ সালে ৪২৭ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন এবং ২০২৪ সালে ২৯৭ জন প্রাণ হারান।
২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে দেশে বজ্রপাতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত মোট মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এখন বজ্রপাতের কারণে ঘটছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাত থেকে বেঁচে যাওয়া অনেক মানুষও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায় ভোগেন, যেমন পক্ষাঘাত, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, স্মৃতিভ্রংশ ও যৌনক্ষমতা হ্রাস।
এক সময় বাংলাদেশে বজ্রপাতকে বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্যোগ হিসেবে দেখা না হলেও, সময়ের সঙ্গে এর ভয়াবহতা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। রোববার (২৬ এপ্রিল) সারা দেশে বজ্রপাতে ১৪ জনের মৃত্যু আবারও এই ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সর্বশেষ সোমবার (২৭ এপ্রিল) দেশের চার জেলায় বজ্রাঘাতে ছয় কৃষকসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নেত্রকোনায় ৩ জন, সুনামগঞ্জে ৩ জন, হবিগঞ্জে ২ জন এবং নোয়াখালীতে ১ জন মারা গেছেন। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়ছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বজ্রপাত পরিস্থিতির জিআইএস ভিত্তিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি এবং উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা।
গবেষণায় আরও বলা হয়, ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ বিশ্বে বজ্রপাতে উচ্চ ঝুঁকির দেশগুলোর একটি। পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন আসছে, যার ফলে তাপপ্রবাহ ও মৌসুমি বৈচিত্র্যের সঙ্গে বজ্রপাতের ঘটনাও বাড়ছে।
ফলে বজ্রপাত এখন দেশের অন্যতম প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা মোকাবিলায় সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
কেন বাড়ছে বজ্রপাত? জলবায়ু, নগরায়ণ ও প্রতিরোধ ঘাটতিই মূল কারণ
বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন ক্রমশ প্রাণঘাতী দুর্যোগে পরিণত হচ্ছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও দেশে বজ্রপাত পর্যবেক্ষণের আধুনিক ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফিনল্যান্ডের ভাইসালা করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে গড়ে প্রায় ৭ লাখ ৮৬ হাজার বজ্রপাত হয়, যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরাসরি ভূমিতে আঘাত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনই বজ্রপাত বাড়ার প্রধান কারণ। অতিরিক্ত তাপে নদীর পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ায়, যা মেঘে জমে বজ্রপাতের সম্ভাবনা তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বায়ুদূষণ, দ্রুত নগরায়ণ ও শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি। গাছপালা কেটে ফেলার কারণে প্রাকৃতিক সুরক্ষা কমে যাওয়াও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নগরায়ণ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে এখন শুধু হাওর বা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল নয়, নতুন নতুন এলাকাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। গত কয়েক বছরে যশোর, বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, শরীয়তপুর, খুলনা, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতজনিত মৃত্যু বেড়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রাকৃতিক কারণই নয়—সচেতনতার অভাব এবং কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার ঘাটতিও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়াচ্ছে। যদিও ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, পরের বছর স্থাপিত পূর্বাভাস সেন্সরগুলো কার্যকরভাবে কাজ করেনি। একইভাবে তালগাছ রোপণের মাধ্যমে বজ্রপাত নিরোধের প্রকল্পও পরবর্তীতে ব্যর্থ হয়।
ফলে পরিবেশগত পরিবর্তনের পাশাপাশি দুর্বল প্রস্তুতি ও জনসচেতনতার অভাবই বজ্রপাতকে দেশে আরও প্রাণঘাতী করে তুলছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।























