ঢাকা ১০:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
অভিনেত্রীর সঙ্গে ‘প্রেমালাপ’ ম্যাক্রোঁর, দেখেই ঠাটিয়ে ‘চড়’! ১৫ বছরেই ভারত ‘এ’ দলে বৈভব সূর্যবংশী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বেরোবির নতুন ভিসির নিয়োগ বাতিল হামের বদলে জলাতঙ্কের টিকা প্রয়োগ, ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ মোংলায় নদীতে পড়ে ট্রলার চালক নিখোঁজ, ১৩ ঘণ্টায়ও মেলেনি সন্ধান হামে শিশুমৃত্যুর দায়ীদের শাস্তির দাবি ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবিতে ছাত্র ফ্রন্টের বিক্ষোভ অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তি সহায়তা দেবে সরকার, আবেদন শুরু বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি অধ্যাপক মামুন অর রশিদ চুরি যাওয়া ১০ লাখ টাকা ও ফোনসহ ফেনী থেকে গ্রেফতার ২ আদমদীঘিতে বসনবুড়ি খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন

একটি পাখির দু’টি ডানা

ড. এম. খালেদ আহমদ
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:২৯:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ৭৫৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

প্রতিটি স্বাধীন, সভ্য, আধুনিক দেশের ন্যায় আইনের শাসন সুনিশ্চিত করা বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম লক্ষ্য। বাংলাদেশের সংবিধানের এই অন্যতম নীতি আইনের শাসন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র সহ সকল দেশের সংবিধানে গৃহিত ও বহুল প্রচলিত হয়ে আসছে। প্রকৃতপক্ষে টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসন মূলত আইনের শাসনের বাস্তব প্রয়োগের উপর নির্ভরশীল। আইন প্রণীত হয় জনগনের কল্যাণের জন্য ও সমাজে ভারসাম্য আনয়নের জন্য। এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধানের মাধ্যমে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আইনের শাসনের প্রধান উদ্দেশ্যে হলো সমাজে আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মানুষের কল্যানের জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও সমাজ বিনির্মানে নিশ্চিত করা ও নিরাপদ ভূমিকা।

এ প্রসঙ্গে আইনের শাসন ধারনার অন্যতম প্রর্বতক ডাইসি বলেছেন যে আইনের শাসনে সমতা থাকা উচিত এবং কোনো ভেদাভেদ না করে সকলকে একই আইন ও আদালতের অধীনে বিচার করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ২৮, ২৯ এবং ৩১ অনুচ্ছেদে সমতার নীতির এক অসাধারণ বর্ননা আছে যা প্রতিবেশী দেশগুলোর সংবিধানের তুলনায় অনেক অগ্রগামী। এটি অভিসংবাদিত যে আইনের শাসন গণতন্ত্রের অন্যতম উৎস ও অনিবার্য পূর্বশর্ত কিন্তু এই আইনের শাসন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ছাড়া সম্ভব নয়। তাই আইনের শাসন ও সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাস্তবে খুবই অপরিহার্য।

উপযুক্ত বিচারকের যোগ্যতা সর্ম্পকে কোন কোন আইন বিশেষজ্ঞ লেখকের অভিমত এই যে, “সকল বিচারকের আইন সম্পর্কিত ধারনা একরকম না থাকতে পারে। যদি কোনো বিচারক মনোজগতে এটি ধারনা করেন যে তার ধারনাটিই চূড়ান্ত তাহলে তার পক্ষে আইনজীবীদের উত্থাপিত যুক্তিতর্ক গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে বিচারকের সিদ্ধান্ত অজান্তেই বিভ্রান্তিতে আক্রান্ত হতে পারে। তাই সঠিক ও দৃড় সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী এবং উদার ও ধৈর্যশীল মন নিয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শ্রবণ করাটা একজন বিচারকের সঠিক এবং প্রাথমিক দায়িত্ব। তবে এর মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়টি। সেই সাথে আস্থা বাড়ে বিচারপ্রার্থী মানুষের।” বিচারক নিয়োগে অভিজ্ঞতা খুবই প্রয়োজন সাথে সাথে Professionalism এর গুণাবলি যাচাইও দরকার।

এই প্রসঙ্গে বোম্বে হাইকোর্ট এর প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি চাগলার কথা উল্লেখ করে তাহার কথা এইভাবে বলা হয় যে “তার আইন বিষয়ে জ্ঞান ছিলো অপরিসীম, বুদ্ধিমত্তায় ছিলেন প্রখর। সাধারণ জ্ঞান বা কমন সেন্স ছিলো তার অতুলনীয় আদালত কক্ষের ভিতরে বা বাইরে সর্বত্রই তার জ্ঞানের পরিচয় পরিলক্ষিত হতো বলে শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে এটাই হলো একজন বিচারকের শক্তি। আর এই শক্তিই বিচারক ও বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি করে। ৬৯ ডিএলআর (এইচসি) ৩১৭ পৃষ্ঠায় একটি উল্লেখযোগ্য রায় প্রকাশিত হয়েছে। ঐখানে ৭টি মানদন্ডের এর কথা উল্লেখ করা হয়। তার মধ্যে অন্যতম হল বিচারকের বয়স ৪৫ বৎসর হতে হবে এবং আপীল বিভাগে সনদ প্রাপ্তরা অগ্রাধিকার পাবে কিন্তু বাস্তবতা হল যারা হাইকোর্টে সনদ লাভের পর বাস্তবে জেলা আদালতে অনেক দিন প্রাকটিস করেন বা করেছেন এবং অনেক দিন বিদেশে অবস্থান করেন তাদের ক্ষেত্রেও বিচারক হিসাবে নিয়োগ পেতে বয়স নূন্যপক্ষে ৫০ বৎসর বয়স হওয়া দরকার। পেশাগত সফলতা ও অন্যান্য যোগ্যতা পর্যাপ্ত থাকার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ফলাফলের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ এর ধারা ৬ এর উপধারা ২(ক) তে প্রার্থীর বয়স নূন্যতম ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) করা হয়েছে কিন্তু উর্ধ্বদিক থেকে কোনো নির্দিষ্ট বয়স সীমা নেই। বিগত বিচারক নিয়োগকালে বার এর সিনিয়র মেম্বারদের কম নিয়োগ করা হইয়াছে। সেক্ষেত্রে বিচারকর্ম বিভাগ থেকে দুইজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারককে (প্রায় ৬৫ বৎসর এর কাছাকাছি বয়সে) নিয়োগ করা হইয়াছে। সেই বিবেচনায় বার এর প্রবীণ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সদস্য এর নিয়োগ অগ্রাধিকারযোগ্য।

The Counsel Law Reports (SpL), 2017 (ষোলতম সংশোধনী মামলা) এর ৮০৭ নম্বর প্যারাগ্রাফে একজন প্রাক্তন মাননীয় প্রধান বিচারপতির রেফারেন্স দিয়ে বলেছেন সে সময়ে “বিচারক নিয়োগে ভুলের কারণে মহাপ্রলয় ঘটেঠে”। তিনি বিচারব্যবস্থায় সেই সময়ের নিয়োগ নীতির সঠিক প্রয়োগ না করায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানদন্ডের প্রতি এক ভয়াবহ আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই প্রকাশনার ৯০২ নম্বর প্যারাগ্রাফে বলা হয়েছে অতীতের রেওয়াজ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি অন্যান্য বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে তার সহকর্মী বিচারপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি সম্মিলিত মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। এই রীতিটি বিচার বিভাগের ভারসাম্য ও স্বচ্ছতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু বর্তমানে সে ধারা প্রায় বিলুপ্ত; এই ধরনের মতবিনিময় বা পরামর্শের চর্চা এখন আর তেমনভাবে অনুসৃত হয় না, তবে প্রক্রিয়াটাও কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য করা প্রয়োজন যে বিচারপতি নিয়োগের সময় শিক্ষাগত যোগ্যতার সাথে বিশেষভাবে বাস্তব অভিজ্ঞতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিৎ। সাথে সাথে শপথ অনুসারে কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই সকল পক্ষকে পর্যাপ্ত শুনানির সুযোগ দিয়ে ন্যায়ানুগ বিচার করা একজন বিচারকের পরম কর্তব্য। তাছাড়া একজন বিচারক কে ব্যক্তি জীবন সৎ, ন্যায়পরায়ণ আইনজ্ঞ ও জ্ঞানপিপাষু হওয়া বাঞ্চনীয়। সুপ্রীম কোর্ট বার থেকে এখনও বেশিরভাগ বিচারক নিয়োগ করা হয়। একজন বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর প্রতিভা ও নিরপেক্ষতার মানদন্ড দেখে তাকে বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ করা প্রয়োজন বলে মনে করি। একজন নিরপেক্ষ ও প্রতিভাবান আইনজীবীর বিচারক হওয়া এবং ভালো গুণাবলীর অধিকারী হওয়া দরকার। ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার “আইন-ই-আকবরী” গ্রন্থে প্রসঙ্গক্রমে একজন গুনী ব্যক্তির কথা বলতে গিয়ে তাকে উকিলের মতো জ্ঞানবক্তা এবং দরবেশের মতো দৃঢ়চিত্তের কথা উল্লেখ করেন। তাই বিচারক হওয়ার জন্য এই রকম আইনজীবী হওয়া প্রয়োজন। শুধু ভালো আইনজীবী হলে হবে না ভালো শিষ্টাচার (etiquette) এবং-নৈতিকতার (merality) এবং নৈতিকতার (morality) অধিকারী হতে হবে। বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধান বিচারপতিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ এর ধারা ৩ উপধারা ২ এর বিচারক নিয়োগ স্থায়ী কাউন্সিল বিশেষভাবে বিবেচনা করবেন যে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার ও সঠিক পদ্ধতি কোনোভাবে বিঘ্ন না হয় এবং বার ও বেঞ্চ এর ঐতিহ্যবাহী সু-সম্পর্ক বজায় থাকে। শুধু ভালো ফলাফলে নয় অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। সংবিধানের দৃষ্টিকোন থেকে বর্ণিত আইন সঠিকভাবে অনুস্মরণ করা হয়নি। সেখানেও অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় নিয়মের উপেক্ষা করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী ২০ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক প্রথম আলোর সহিত একটি সাক্ষাতকারে বলেন যে,
“সর্বত্র এখন আমার লোক’ নিয়োগের মনোভাব ভর করেছে। আমি যোগ্য লোক খুঁজব, নাকি আমার লোক নিয়োগ দেব-এটাই একটা জটিলতা হয়ে গেছে। জনগণ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে এই অবস্থা থেকে আমাদের সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। হাইকোর্টে এমন আইনজীবী রয়েছেন, যাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা হয়তো খুব ভালো নয়। কিন্তু আইনজীবী হিসেবে চৌকস। তাঁকে নিয়োগ দিতে আপত্তি কোথায়? আমি সিলেটের একজন দেওয়ানি ও আরেকজন ফৌজদারি বিষয়ে আইনজীবীকে জানতাম। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা খুবই খারাপ ছিল। কিন্তু মেধাবী আইনজীবী। অর্থাৎ বারে যোগ দিয়ে তিনি মেহনত করেছেন।”

এছাড়াও বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আইন কমিশন ০৫ আগস্ট, ২০১২ সালের একটি রিপোর্টে সুপারিশ করেন যে,
“Article 95(2)(a) should not be interpreted to allow mere enrolment as a lawyer for ten years to qualify for appointment as a Judge of the Supreme Court. According to the Law Commission, the lawyer vying for appointment should be a regular practitioner who has conducted a significant number of cases to the satisfaction of the Chief Justice and other Supreme Court Judges. They should also have a minimum of two years practice of conducting cases before the Appellate Division. As for judicial officers, the Law Commission recommended that one should have a minimum of three years experience as a District Judge to qualify for appointment as a Supreme Court Judge.
Activate Win

বিগত কিছু দিন আগে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর বিধি ৩ এর অধীনে দরখাস্ত আহবান করিলেও উক্ত আইন ও সংবিধান ব্যত্যয় ঘটিয়ে বেশির ভাগ ভালো ফলাফলধারীকে নিয়োগ প্রদান করে। বিশ্বস্তসূত্রে শুনা যায় যাদের কোনো একটা পরীক্ষার ফলাফল ৩য় স্থানীয় ছিল তাদের আহবান করা হয় নাই। যদিও অনেকের ক্ষেত্রে বহু বৎসরের প্রফেশনাল অজিতা রয়েছে। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিচারক নিয়োগে অর্থাৎ বিগত সরকারের আমলে “দুই বন্ধু” তত্ত্ব শক্তিশালী ছিল। গত ব্যাচেও বিচারক নিয়োগ একইভাবে “দুই বন্ধু” তত্ত্ব প্রকারান্তরে প্রয়োগের আলামত দেখা যায়। পাশাপাশি অভিজাত তন্ত্র ও এলিট তন্ত্রের/ আত্মীয় তন্ত্রের আনুষঙ্গিক কিছু নমুনা ও দেখা যায়। বিচারক নিয়োগের পাশাপাশি (মাননীয় আপীল বিভাগ কর্তৃক) সিনিয়র অ্যাডভোকেট সিলেকশন বা প্রকাশের ক্ষেত্রে বিগত সরকারের আমলে ঢাকা জজ কোর্টে প্র্যাকটিশনারদেরকেও সিনিয়র অ্যাডভোকেট প্রদান করা হয়। তাছাড়া হাইকোর্ট ও আপীল বিভাগ মিলিয়ে কাটায় কাটায় ১০ (দশ) বৎসরধারীদের ক্ষেত্রেও সিনিয়র অ্যাডভোকেট প্রদান করা হয়। যদিও অনেক নিয়মিত মেধাবী প্র্যাকটিশনার তৎকালীন সময়ে সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে সিলেক্ট হতে পারে নাই। ইদানীংকালেও সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে কিছু তরুণদের সিলেক্ট করার গুঞ্জন লোকমুখে শুনা যায় যদিও সুপ্রীমকোর্ট আপীল বিধিমালা, ১৯৮৮ এর অর্ডার ৫ এর বিধি ১১ তে সিনিয়র অ্যাডভোকেট প্রদান নিয়ে একটি বিধান আছে। বিধানটি নিম্নরূপঃ

“The Chief Justice and the Judges may, on application or otherwise, Select, from time to time, from among those whose names are on the Roll of the Advocates, persons who are judged, by their knowledge, ability and experince, to be worthy of being granted the status of Senior Advocate and on signing the Roll of Senior Advocates shall assume the said status :
Provided that, the Chief Justice and the Judges may, before selecting an Advocate as Senior Advocate, consider whether he could show sufficient appearance before the Court so as to be entitled to be granted the status of Senior Advocate”.

উপরোক্ত প্রবিধানমালায় প্রতীয়মান হয় যে, সিনিয়র অ্যাডভোকেট এর ক্ষেত্রে অত্র কোর্টের নিয়মিত আইনজীবী অথবা আপীল বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন এবং বিধি অনুসারে যাদের অন্যান্য গুণাবলি রয়েছে তারাই সিনিয়র অ্যাডভোকেট পাওয়ার উপযুক্ত। সিনিয়র অ্যাডভোকেটদের ইতিপূর্বে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন করা হতো। বর্তমানে কিছু সংখ্যক সিনিয়র অ্যাডভোকেট বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন পাচ্ছেন না। সেই জন্য রাষ্ট্রীয় প্রটোকল তালিকায় সুস্পষ্টভাবে সিনিয়র অ্যাডভোকেট এর পজিশন নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে যদি সিনিয়র অ্যাডভোকেটদের সুস্পষ্ট পজিশন না থাকে তাহলে প্রটোকল তালিকায় সিনিয়র অ্যাডভোকেটদের মর্যাদা নির্ধারণে রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট দায়িত্ব রয়েছে।

সরকারের আইন কর্মকর্তা নিয়োগের সময় সাধারনত সুপ্রীম কোর্ট এর সিনিয়র অ্যাডভোকেটগণ, অ্যাটর্নি জেনারে বা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হয়ে থাকেন কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া। ইতিপূর্বে দেখা যেত সিভিল, ক্রিমিনাল এবং রীটে পাদর্শীদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়া হতো। ২০০২ সালের বিএলসি তে প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যায় একজন অ্যাটর্নি জেনারেল, ৩ জন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, ১৫ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, ৫৪ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। বর্তমানে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ১০৩ জন এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ২২৮ জন। সে অনুসারে অন্তত ৬ থেকে ৮ জন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ করা প্রয়োজন। যাহা প্রচুর সংখ্যক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ও কিছু সংখ্যক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এর বাস্তব প্রশিক্ষণ ও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। ২০০১/২০০২ এর পর হইতে সরকারের অতিরিক্ত সচিব প্রচুর পরিমানে বৃদ্ধি পেয়েছে সে তুলনায় আনুপাতিক হারে এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ হন নাই। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে আইন সংশোধন প্রয়োজন। বর্তমান পত্রপত্রিকা হতে দেখা যাচ্ছে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তাদের পুনঃমূল্যায়ন করা হচ্ছে। উহাদের মধ্যে কেহ কেহ তামাদিতে বারিত থাকলেও তাহাদারকেও পূনঃমূল্যায়ন করা দরকার। গুণীজনরা বলে থাকেন বার ও বেঞ্চ একটি পাখির দুটি শাখা বা একটি বন্দুকের দুটি নল, সেহেতু বার ও বেঞ্চের সুম্পর্ক না থাকিলে বিচার এবং আইনের শাসন উন্নত পর্যায়ে পৌছাবে না। কতিপয় (কিয়াদাংশ) বিচারপতি বিচার আসনে বসলে মনে করেন যে আইনজীবীরা ইনফিরিয়র। এই ধারণাটি সঠিক নহে। এই প্রসঙ্গে একজন প্রখ্যাত কবির কবিতার দু’টি উল্লেখযোগ্য-
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে
আজি এ মহামানবের সাগরতীরে।

মাননীয় বিচারক মহোদয় ও বিজ্ঞ আইনজীবীদের সম্পর্ক ও অনুরূপ বলে মনে করি। কারণ নিরপেক্ষ বিচারালয় প্রতিষ্ঠায় বিচারক ও আইনজীবীদের গভীর সুসম্পর্কের প্রয়োজন। সেই জন্য সম্পর্ক উন্নতি থাকিলে বিচারালয়, সমাজ এবং দেশের সংস্কৃতি ও অর্থনীতি উন্নত হবে।

আইনাজনে মাননীয় বিচারক ও আইনজীবীদের সম্পর্ক সুমধুর এবং একটি পাখির দুটি ডানার চলন্তিকার মতো সুউজ্জ্বল থাকা দরকার।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ সংবিধানের অনুপম বৈশিষ্ট্য হলো সমতা নীতির আলোকে বলা যায়, বার ও বেঞ্চ একে অপরের সম্পূরক এবং পরিপূরক এ বিষয়ে ৩৫ ডিএলআর (এডি) ২৯০ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “Both the bar and bench are two arms of the same machinery unless the work done harmoniously justice cannot be properly administered” এই জন্য বার ও বে’র সুসম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে এবং সমৃদ্ধির জন্য সাম্য ও ন্যায় বিচার একান্ত দরকার। বিচারকার্যে ন্যায় বিচার এবং বিচার সম্পর্কিত অন্যান্য কার্য যেমন- আইনজীবীদের অধিকার, প্রিভিলেজ ও সকল ক্ষেত্রে সকলের জন্য সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদসহ অন্যান্য সাম্য সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ অনুসারে সমতা নীতির আলোকে অন্যান্য প্রাসাঙ্গিক বিচার বিশ্লেষণ করা বিশেষ বিবেচনার দাবী রাখে। অন্যথায় বার ও বেঞ্চের সুসম্পর্কের ঘাটতি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়, বিধায় মাননীয় বিচারকবৃদ্ধের প্রতি নিবেদন বর্ণিত/উল্লেখিত রায়, প্রতিষ্ঠিত আইন ও নীতির আলোকে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা বির্নিমানে ও বিকাশে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনধারা উন্নয়নের জন্য সাম্য ও সমতার নীতি অনুসারে সামগ্রিকভাবে বর্ণিত সকল বিষয়সহ ন্যায় বিচারের বিষয়টি গভীরভাব বিবেচনা করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা। সকল সাম্য নীতি অনুসরণ করা খুবই জরুরী অন্যথায় দেশে আইনের শাসন ও সমাজ ব্যবস্থা বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। আইন পেশায় সামন্তনীতি বা সিন্ডিকেট প্রথার প্রচলন যেমন রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমি কবিতার মর্মানুসারে যত বৈষম্য ও গ্রাসনীতি কোনোভাবে কাম্য নয়। যাহা ভবিষ্যতে বিচ্ছেদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার কারণ হয়ে দাড়াবে। বর্তমানে সিন্ডিকেট নামে একটি শব্দ খুবই বেশি হারে শুনা যায় যাহা ন্যায়বিচার ও সমতা নীতিকে ব্যহত করে এবং পরিনতিতে সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক হারে ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। এজন্য হযরত মোহাম্মদ (সঃ) একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে বলেছেন “তোমাদের পূর্বের কতক জাতিকে বিচার-ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনার অভাবে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হয়েছিল”। তাই আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্র সহ সকল ক্ষেত্রে সাম্য ও সুষ্ঠু ন্যায়পরায়ণ বিচার ব্যবস্থা কাম্য।

লেখক পরিচতি:

ড. এম. খালেদ আহমদ, সিনিয়র এডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

সাবেক সহ-সভাপতি, সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েসন

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

একটি পাখির দু’টি ডানা

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:২৯:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

প্রতিটি স্বাধীন, সভ্য, আধুনিক দেশের ন্যায় আইনের শাসন সুনিশ্চিত করা বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম লক্ষ্য। বাংলাদেশের সংবিধানের এই অন্যতম নীতি আইনের শাসন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র সহ সকল দেশের সংবিধানে গৃহিত ও বহুল প্রচলিত হয়ে আসছে। প্রকৃতপক্ষে টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসন মূলত আইনের শাসনের বাস্তব প্রয়োগের উপর নির্ভরশীল। আইন প্রণীত হয় জনগনের কল্যাণের জন্য ও সমাজে ভারসাম্য আনয়নের জন্য। এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধানের মাধ্যমে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আইনের শাসনের প্রধান উদ্দেশ্যে হলো সমাজে আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মানুষের কল্যানের জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও সমাজ বিনির্মানে নিশ্চিত করা ও নিরাপদ ভূমিকা।

এ প্রসঙ্গে আইনের শাসন ধারনার অন্যতম প্রর্বতক ডাইসি বলেছেন যে আইনের শাসনে সমতা থাকা উচিত এবং কোনো ভেদাভেদ না করে সকলকে একই আইন ও আদালতের অধীনে বিচার করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ২৮, ২৯ এবং ৩১ অনুচ্ছেদে সমতার নীতির এক অসাধারণ বর্ননা আছে যা প্রতিবেশী দেশগুলোর সংবিধানের তুলনায় অনেক অগ্রগামী। এটি অভিসংবাদিত যে আইনের শাসন গণতন্ত্রের অন্যতম উৎস ও অনিবার্য পূর্বশর্ত কিন্তু এই আইনের শাসন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ছাড়া সম্ভব নয়। তাই আইনের শাসন ও সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাস্তবে খুবই অপরিহার্য।

উপযুক্ত বিচারকের যোগ্যতা সর্ম্পকে কোন কোন আইন বিশেষজ্ঞ লেখকের অভিমত এই যে, “সকল বিচারকের আইন সম্পর্কিত ধারনা একরকম না থাকতে পারে। যদি কোনো বিচারক মনোজগতে এটি ধারনা করেন যে তার ধারনাটিই চূড়ান্ত তাহলে তার পক্ষে আইনজীবীদের উত্থাপিত যুক্তিতর্ক গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে বিচারকের সিদ্ধান্ত অজান্তেই বিভ্রান্তিতে আক্রান্ত হতে পারে। তাই সঠিক ও দৃড় সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী এবং উদার ও ধৈর্যশীল মন নিয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শ্রবণ করাটা একজন বিচারকের সঠিক এবং প্রাথমিক দায়িত্ব। তবে এর মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়টি। সেই সাথে আস্থা বাড়ে বিচারপ্রার্থী মানুষের।” বিচারক নিয়োগে অভিজ্ঞতা খুবই প্রয়োজন সাথে সাথে Professionalism এর গুণাবলি যাচাইও দরকার।

এই প্রসঙ্গে বোম্বে হাইকোর্ট এর প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি চাগলার কথা উল্লেখ করে তাহার কথা এইভাবে বলা হয় যে “তার আইন বিষয়ে জ্ঞান ছিলো অপরিসীম, বুদ্ধিমত্তায় ছিলেন প্রখর। সাধারণ জ্ঞান বা কমন সেন্স ছিলো তার অতুলনীয় আদালত কক্ষের ভিতরে বা বাইরে সর্বত্রই তার জ্ঞানের পরিচয় পরিলক্ষিত হতো বলে শোনা যায়। প্রকৃতপক্ষে এটাই হলো একজন বিচারকের শক্তি। আর এই শক্তিই বিচারক ও বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি করে। ৬৯ ডিএলআর (এইচসি) ৩১৭ পৃষ্ঠায় একটি উল্লেখযোগ্য রায় প্রকাশিত হয়েছে। ঐখানে ৭টি মানদন্ডের এর কথা উল্লেখ করা হয়। তার মধ্যে অন্যতম হল বিচারকের বয়স ৪৫ বৎসর হতে হবে এবং আপীল বিভাগে সনদ প্রাপ্তরা অগ্রাধিকার পাবে কিন্তু বাস্তবতা হল যারা হাইকোর্টে সনদ লাভের পর বাস্তবে জেলা আদালতে অনেক দিন প্রাকটিস করেন বা করেছেন এবং অনেক দিন বিদেশে অবস্থান করেন তাদের ক্ষেত্রেও বিচারক হিসাবে নিয়োগ পেতে বয়স নূন্যপক্ষে ৫০ বৎসর বয়স হওয়া দরকার। পেশাগত সফলতা ও অন্যান্য যোগ্যতা পর্যাপ্ত থাকার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ফলাফলের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ এর ধারা ৬ এর উপধারা ২(ক) তে প্রার্থীর বয়স নূন্যতম ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) করা হয়েছে কিন্তু উর্ধ্বদিক থেকে কোনো নির্দিষ্ট বয়স সীমা নেই। বিগত বিচারক নিয়োগকালে বার এর সিনিয়র মেম্বারদের কম নিয়োগ করা হইয়াছে। সেক্ষেত্রে বিচারকর্ম বিভাগ থেকে দুইজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারককে (প্রায় ৬৫ বৎসর এর কাছাকাছি বয়সে) নিয়োগ করা হইয়াছে। সেই বিবেচনায় বার এর প্রবীণ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সদস্য এর নিয়োগ অগ্রাধিকারযোগ্য।

The Counsel Law Reports (SpL), 2017 (ষোলতম সংশোধনী মামলা) এর ৮০৭ নম্বর প্যারাগ্রাফে একজন প্রাক্তন মাননীয় প্রধান বিচারপতির রেফারেন্স দিয়ে বলেছেন সে সময়ে “বিচারক নিয়োগে ভুলের কারণে মহাপ্রলয় ঘটেঠে”। তিনি বিচারব্যবস্থায় সেই সময়ের নিয়োগ নীতির সঠিক প্রয়োগ না করায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানদন্ডের প্রতি এক ভয়াবহ আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই প্রকাশনার ৯০২ নম্বর প্যারাগ্রাফে বলা হয়েছে অতীতের রেওয়াজ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি অন্যান্য বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে তার সহকর্মী বিচারপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি সম্মিলিত মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। এই রীতিটি বিচার বিভাগের ভারসাম্য ও স্বচ্ছতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু বর্তমানে সে ধারা প্রায় বিলুপ্ত; এই ধরনের মতবিনিময় বা পরামর্শের চর্চা এখন আর তেমনভাবে অনুসৃত হয় না, তবে প্রক্রিয়াটাও কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য করা প্রয়োজন যে বিচারপতি নিয়োগের সময় শিক্ষাগত যোগ্যতার সাথে বিশেষভাবে বাস্তব অভিজ্ঞতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিৎ। সাথে সাথে শপথ অনুসারে কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই সকল পক্ষকে পর্যাপ্ত শুনানির সুযোগ দিয়ে ন্যায়ানুগ বিচার করা একজন বিচারকের পরম কর্তব্য। তাছাড়া একজন বিচারক কে ব্যক্তি জীবন সৎ, ন্যায়পরায়ণ আইনজ্ঞ ও জ্ঞানপিপাষু হওয়া বাঞ্চনীয়। সুপ্রীম কোর্ট বার থেকে এখনও বেশিরভাগ বিচারক নিয়োগ করা হয়। একজন বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর প্রতিভা ও নিরপেক্ষতার মানদন্ড দেখে তাকে বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ করা প্রয়োজন বলে মনে করি। একজন নিরপেক্ষ ও প্রতিভাবান আইনজীবীর বিচারক হওয়া এবং ভালো গুণাবলীর অধিকারী হওয়া দরকার। ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার “আইন-ই-আকবরী” গ্রন্থে প্রসঙ্গক্রমে একজন গুনী ব্যক্তির কথা বলতে গিয়ে তাকে উকিলের মতো জ্ঞানবক্তা এবং দরবেশের মতো দৃঢ়চিত্তের কথা উল্লেখ করেন। তাই বিচারক হওয়ার জন্য এই রকম আইনজীবী হওয়া প্রয়োজন। শুধু ভালো আইনজীবী হলে হবে না ভালো শিষ্টাচার (etiquette) এবং-নৈতিকতার (merality) এবং নৈতিকতার (morality) অধিকারী হতে হবে। বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধান বিচারপতিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ এর ধারা ৩ উপধারা ২ এর বিচারক নিয়োগ স্থায়ী কাউন্সিল বিশেষভাবে বিবেচনা করবেন যে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার ও সঠিক পদ্ধতি কোনোভাবে বিঘ্ন না হয় এবং বার ও বেঞ্চ এর ঐতিহ্যবাহী সু-সম্পর্ক বজায় থাকে। শুধু ভালো ফলাফলে নয় অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। সংবিধানের দৃষ্টিকোন থেকে বর্ণিত আইন সঠিকভাবে অনুস্মরণ করা হয়নি। সেখানেও অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় নিয়মের উপেক্ষা করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী ২০ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক প্রথম আলোর সহিত একটি সাক্ষাতকারে বলেন যে,
“সর্বত্র এখন আমার লোক’ নিয়োগের মনোভাব ভর করেছে। আমি যোগ্য লোক খুঁজব, নাকি আমার লোক নিয়োগ দেব-এটাই একটা জটিলতা হয়ে গেছে। জনগণ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে এই অবস্থা থেকে আমাদের সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। হাইকোর্টে এমন আইনজীবী রয়েছেন, যাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা হয়তো খুব ভালো নয়। কিন্তু আইনজীবী হিসেবে চৌকস। তাঁকে নিয়োগ দিতে আপত্তি কোথায়? আমি সিলেটের একজন দেওয়ানি ও আরেকজন ফৌজদারি বিষয়ে আইনজীবীকে জানতাম। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা খুবই খারাপ ছিল। কিন্তু মেধাবী আইনজীবী। অর্থাৎ বারে যোগ দিয়ে তিনি মেহনত করেছেন।”

এছাড়াও বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আইন কমিশন ০৫ আগস্ট, ২০১২ সালের একটি রিপোর্টে সুপারিশ করেন যে,
“Article 95(2)(a) should not be interpreted to allow mere enrolment as a lawyer for ten years to qualify for appointment as a Judge of the Supreme Court. According to the Law Commission, the lawyer vying for appointment should be a regular practitioner who has conducted a significant number of cases to the satisfaction of the Chief Justice and other Supreme Court Judges. They should also have a minimum of two years practice of conducting cases before the Appellate Division. As for judicial officers, the Law Commission recommended that one should have a minimum of three years experience as a District Judge to qualify for appointment as a Supreme Court Judge.
Activate Win

বিগত কিছু দিন আগে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর বিধি ৩ এর অধীনে দরখাস্ত আহবান করিলেও উক্ত আইন ও সংবিধান ব্যত্যয় ঘটিয়ে বেশির ভাগ ভালো ফলাফলধারীকে নিয়োগ প্রদান করে। বিশ্বস্তসূত্রে শুনা যায় যাদের কোনো একটা পরীক্ষার ফলাফল ৩য় স্থানীয় ছিল তাদের আহবান করা হয় নাই। যদিও অনেকের ক্ষেত্রে বহু বৎসরের প্রফেশনাল অজিতা রয়েছে। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিচারক নিয়োগে অর্থাৎ বিগত সরকারের আমলে “দুই বন্ধু” তত্ত্ব শক্তিশালী ছিল। গত ব্যাচেও বিচারক নিয়োগ একইভাবে “দুই বন্ধু” তত্ত্ব প্রকারান্তরে প্রয়োগের আলামত দেখা যায়। পাশাপাশি অভিজাত তন্ত্র ও এলিট তন্ত্রের/ আত্মীয় তন্ত্রের আনুষঙ্গিক কিছু নমুনা ও দেখা যায়। বিচারক নিয়োগের পাশাপাশি (মাননীয় আপীল বিভাগ কর্তৃক) সিনিয়র অ্যাডভোকেট সিলেকশন বা প্রকাশের ক্ষেত্রে বিগত সরকারের আমলে ঢাকা জজ কোর্টে প্র্যাকটিশনারদেরকেও সিনিয়র অ্যাডভোকেট প্রদান করা হয়। তাছাড়া হাইকোর্ট ও আপীল বিভাগ মিলিয়ে কাটায় কাটায় ১০ (দশ) বৎসরধারীদের ক্ষেত্রেও সিনিয়র অ্যাডভোকেট প্রদান করা হয়। যদিও অনেক নিয়মিত মেধাবী প্র্যাকটিশনার তৎকালীন সময়ে সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে সিলেক্ট হতে পারে নাই। ইদানীংকালেও সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে কিছু তরুণদের সিলেক্ট করার গুঞ্জন লোকমুখে শুনা যায় যদিও সুপ্রীমকোর্ট আপীল বিধিমালা, ১৯৮৮ এর অর্ডার ৫ এর বিধি ১১ তে সিনিয়র অ্যাডভোকেট প্রদান নিয়ে একটি বিধান আছে। বিধানটি নিম্নরূপঃ

“The Chief Justice and the Judges may, on application or otherwise, Select, from time to time, from among those whose names are on the Roll of the Advocates, persons who are judged, by their knowledge, ability and experince, to be worthy of being granted the status of Senior Advocate and on signing the Roll of Senior Advocates shall assume the said status :
Provided that, the Chief Justice and the Judges may, before selecting an Advocate as Senior Advocate, consider whether he could show sufficient appearance before the Court so as to be entitled to be granted the status of Senior Advocate”.

উপরোক্ত প্রবিধানমালায় প্রতীয়মান হয় যে, সিনিয়র অ্যাডভোকেট এর ক্ষেত্রে অত্র কোর্টের নিয়মিত আইনজীবী অথবা আপীল বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন এবং বিধি অনুসারে যাদের অন্যান্য গুণাবলি রয়েছে তারাই সিনিয়র অ্যাডভোকেট পাওয়ার উপযুক্ত। সিনিয়র অ্যাডভোকেটদের ইতিপূর্বে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন করা হতো। বর্তমানে কিছু সংখ্যক সিনিয়র অ্যাডভোকেট বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন পাচ্ছেন না। সেই জন্য রাষ্ট্রীয় প্রটোকল তালিকায় সুস্পষ্টভাবে সিনিয়র অ্যাডভোকেট এর পজিশন নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে যদি সিনিয়র অ্যাডভোকেটদের সুস্পষ্ট পজিশন না থাকে তাহলে প্রটোকল তালিকায় সিনিয়র অ্যাডভোকেটদের মর্যাদা নির্ধারণে রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট দায়িত্ব রয়েছে।

সরকারের আইন কর্মকর্তা নিয়োগের সময় সাধারনত সুপ্রীম কোর্ট এর সিনিয়র অ্যাডভোকেটগণ, অ্যাটর্নি জেনারে বা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হয়ে থাকেন কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া। ইতিপূর্বে দেখা যেত সিভিল, ক্রিমিনাল এবং রীটে পাদর্শীদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়া হতো। ২০০২ সালের বিএলসি তে প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যায় একজন অ্যাটর্নি জেনারেল, ৩ জন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, ১৫ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, ৫৪ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। বর্তমানে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ১০৩ জন এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ২২৮ জন। সে অনুসারে অন্তত ৬ থেকে ৮ জন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ করা প্রয়োজন। যাহা প্রচুর সংখ্যক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ও কিছু সংখ্যক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এর বাস্তব প্রশিক্ষণ ও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। ২০০১/২০০২ এর পর হইতে সরকারের অতিরিক্ত সচিব প্রচুর পরিমানে বৃদ্ধি পেয়েছে সে তুলনায় আনুপাতিক হারে এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ হন নাই। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে আইন সংশোধন প্রয়োজন। বর্তমান পত্রপত্রিকা হতে দেখা যাচ্ছে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তাদের পুনঃমূল্যায়ন করা হচ্ছে। উহাদের মধ্যে কেহ কেহ তামাদিতে বারিত থাকলেও তাহাদারকেও পূনঃমূল্যায়ন করা দরকার। গুণীজনরা বলে থাকেন বার ও বেঞ্চ একটি পাখির দুটি শাখা বা একটি বন্দুকের দুটি নল, সেহেতু বার ও বেঞ্চের সুম্পর্ক না থাকিলে বিচার এবং আইনের শাসন উন্নত পর্যায়ে পৌছাবে না। কতিপয় (কিয়াদাংশ) বিচারপতি বিচার আসনে বসলে মনে করেন যে আইনজীবীরা ইনফিরিয়র। এই ধারণাটি সঠিক নহে। এই প্রসঙ্গে একজন প্রখ্যাত কবির কবিতার দু’টি উল্লেখযোগ্য-
দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে
আজি এ মহামানবের সাগরতীরে।

মাননীয় বিচারক মহোদয় ও বিজ্ঞ আইনজীবীদের সম্পর্ক ও অনুরূপ বলে মনে করি। কারণ নিরপেক্ষ বিচারালয় প্রতিষ্ঠায় বিচারক ও আইনজীবীদের গভীর সুসম্পর্কের প্রয়োজন। সেই জন্য সম্পর্ক উন্নতি থাকিলে বিচারালয়, সমাজ এবং দেশের সংস্কৃতি ও অর্থনীতি উন্নত হবে।

আইনাজনে মাননীয় বিচারক ও আইনজীবীদের সম্পর্ক সুমধুর এবং একটি পাখির দুটি ডানার চলন্তিকার মতো সুউজ্জ্বল থাকা দরকার।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ সংবিধানের অনুপম বৈশিষ্ট্য হলো সমতা নীতির আলোকে বলা যায়, বার ও বেঞ্চ একে অপরের সম্পূরক এবং পরিপূরক এ বিষয়ে ৩৫ ডিএলআর (এডি) ২৯০ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “Both the bar and bench are two arms of the same machinery unless the work done harmoniously justice cannot be properly administered” এই জন্য বার ও বে’র সুসম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে এবং সমৃদ্ধির জন্য সাম্য ও ন্যায় বিচার একান্ত দরকার। বিচারকার্যে ন্যায় বিচার এবং বিচার সম্পর্কিত অন্যান্য কার্য যেমন- আইনজীবীদের অধিকার, প্রিভিলেজ ও সকল ক্ষেত্রে সকলের জন্য সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদসহ অন্যান্য সাম্য সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ অনুসারে সমতা নীতির আলোকে অন্যান্য প্রাসাঙ্গিক বিচার বিশ্লেষণ করা বিশেষ বিবেচনার দাবী রাখে। অন্যথায় বার ও বেঞ্চের সুসম্পর্কের ঘাটতি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়, বিধায় মাননীয় বিচারকবৃদ্ধের প্রতি নিবেদন বর্ণিত/উল্লেখিত রায়, প্রতিষ্ঠিত আইন ও নীতির আলোকে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা বির্নিমানে ও বিকাশে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনধারা উন্নয়নের জন্য সাম্য ও সমতার নীতি অনুসারে সামগ্রিকভাবে বর্ণিত সকল বিষয়সহ ন্যায় বিচারের বিষয়টি গভীরভাব বিবেচনা করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা। সকল সাম্য নীতি অনুসরণ করা খুবই জরুরী অন্যথায় দেশে আইনের শাসন ও সমাজ ব্যবস্থা বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। আইন পেশায় সামন্তনীতি বা সিন্ডিকেট প্রথার প্রচলন যেমন রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমি কবিতার মর্মানুসারে যত বৈষম্য ও গ্রাসনীতি কোনোভাবে কাম্য নয়। যাহা ভবিষ্যতে বিচ্ছেদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার কারণ হয়ে দাড়াবে। বর্তমানে সিন্ডিকেট নামে একটি শব্দ খুবই বেশি হারে শুনা যায় যাহা ন্যায়বিচার ও সমতা নীতিকে ব্যহত করে এবং পরিনতিতে সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক হারে ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। এজন্য হযরত মোহাম্মদ (সঃ) একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে বলেছেন “তোমাদের পূর্বের কতক জাতিকে বিচার-ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনার অভাবে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হয়েছিল”। তাই আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্র সহ সকল ক্ষেত্রে সাম্য ও সুষ্ঠু ন্যায়পরায়ণ বিচার ব্যবস্থা কাম্য।

লেখক পরিচতি:

ড. এম. খালেদ আহমদ, সিনিয়র এডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

সাবেক সহ-সভাপতি, সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েসন