ঢাকা ০৪:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রধানমন্ত্রীর স্লোগানকে হাদিস বলায় সমালোচনা, প্রত্যাহার সচিব শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে অর্থায়নের অভিযোগ, তালিকায় ১২ শিল্প গ্রুপ টিকা না কেনায় হামের প্রকোপ: ইউনূস সরকারের দায় নির্ধারণে তদন্ত ৮৩০ পর্যটক নিয়ে ‘এমভি বার আউলিয়া’র যাত্রা পর্যটকদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত কক্সবাজারের হোটেলগুলোতে? ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে ইসির তোড়জোড় হামের টিকাকাণ্ডে অন্তর্বর্তী সরকারের দায় খুঁজতে তদন্ত কমিশন চুরির বিরোধে কৃষককে পিটিয়ে হত্যা অনুমোদনহীন প্ল্যান্টে হেভি ক্রুড আমদানির অনুমতি চায় সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএসসি সংস্কারসহ ১৩ দফা দাবি শিবিরের, নিয়োগে দলীয় প্রভাব বন্ধের আহ্বান

বিশেষ প্রতিবেদন/ ‘দুই বেগমের যুদ্ধ’র সমাপ্তি

সুপন রায়
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৩৭:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬ ১২১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ, প্রভাবশালী ও দ্বন্দ্বমুখর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে যা পরিচিত ছিল ‘দুই বেগমের রাজনীতি’ বা ‘দুই বেগমের যুদ্ধ’ নামে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা, তা সময়ের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও প্রতিহিংসার রাজনীতিতে রূপ নেয়। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের ক্ষমতা হস্তান্তর, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলন, ২০০১ সালের নির্বাচন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা—এসব ঘটনা দুই নেত্রীর সম্পর্ককে ক্রমে সহনশীলতা থেকে বৈরিতার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়।

দুই নেত্রীর শাসনামলেই মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদ নিয়ে অভিযোগ-সমালোচনা ছিল। তবে শেখ হাসিনার টানা দেড় দশকের শাসনে বিরোধী দমন, বিতর্কিত নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরম রূপ নেয় বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যার পরিণতিতে গণ-অভ্যুত্থানে তার ক্ষমতাচ্যুতি ঘটে। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ দুই দশক কেটেছে ক্ষমতার বাইরে—আন্দোলন, কারাবাস ও অসুস্থতার মধ্যে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বনির্ভর এই রাজনীতির একটি অধ্যায় শেষ হলেও দ্বি-দলীয় রাজনীতির কাঠামো ভাঙেনি। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নতুন বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামীর উত্থান দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই অধ্যায়ের সমাপ্তি কি আদৌ নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করবে, নাকি পুরোনো ধারাই নতুন রূপে অব্যাহত থাকবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার স্বল্পভাষী ও সহনশীল আচরণ তাকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে রূপ দিয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে তিনি কখনো নির্বাচনে পরাজিত হননি—এটিও তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ‘দুই নেত্রীর রাজনীতি’র অধ্যায় শেষ হলেও দ্বি-দলীয় রাজনীতির কাঠামো ভাঙেনি। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামী। সামনে নির্বাচনকে ঘিরে নতুন বাস্তবতায় রাজনীতি নতুন মোড় নিলেও, বিশ্লেষকদের মতে পুরোনো দ্বি-দলীয় ধারাই আপাতত অব্যাহত থাকবে।

অর্থাৎ, একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও বাংলাদেশের রাজনীতির মৌলিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এখনও অনিশ্চিত।

সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়েই খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দুই নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। সেই আন্দোলনে দুজনের নেতৃত্ব ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, তবে তখনো তা বৈরিতায় রূপ নেয়নি।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর মাত্র ৩৬ বছর বয়সে বিপর্যস্ত বিএনপির নেতৃত্ব নেন খালেদা জিয়া। অন্যদিকে ১৯৮১ সালে নির্বাসন থেকে ফিরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সাতদলীয় জোট ও আওয়ামী লীগের আটদলীয় জোট আলাদা থাকলেও আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন এই দুই নেত্রী। প্রয়োজনে তারা বৈঠকেও বসেছিলেন, যা আন্দোলনকে গতি দেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও এর পরবর্তী সময়ে দুই নেত্রীর মধ্যে রাজনৈতিক সহনশীলতা বিদ্যমান ছিল। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার এবং ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে শেখ হাসিনার প্রথম সরকার—এই দুই মেয়াদেই সম্পর্ক পুরোপুরি বৈরিতায় পৌঁছায়নি।

তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু, ১৯৯৬ সালের একতরফা নির্বাচন এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রাজনীতিতে টানাপোড়েন বাড়িয়ে তোলে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের বিজয়ের পর রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর দুই নেত্রীর সম্পর্ক চূড়ান্ত বৈরিতায় রূপ নেয়। এরপর আর স্বাভাবিক রাজনৈতিক সম্পর্ক ফেরেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈরিতাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন ও সংঘাতের সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

অর্থাৎ, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে জন্ম নেওয়া যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা একসময় সহনশীল ছিল, তা সময়ের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রূপ নিয়ে বৈরিতায় পরিণত হয়—যার প্রভাব বহু বছর ধরে দেশের রাজনীতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিএনপি–আওয়ামী লীগের সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে যে চরম বৈরিতায় পৌঁছেছে, তার পেছনে কয়েকটি ঘটনা রাজনৈতিক বাঁকবদলের বড় কারণ হয়ে উঠেছে।

২০০৪ সালে বিএনপি–জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা দুই দলের সম্পর্ককে গভীর বৈরিতার দিকে ঠেলে দেয়। এই ঘটনার পর রাজনৈতিক আস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। এর পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবন থেকে খালেদা জিয়ার উচ্ছেদকে প্রতিহিংসার রাজনীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই নেত্রীর তিক্ততার প্রভাবে রাজনীতিতে প্রতিশোধমূলক ধারাই প্রাধান্য পেতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৬–০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে রাজনীতিকদের হাত থেকে ক্ষমতা সরে গিয়ে তা পড়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। সে সময় খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা—দুই নেত্রীই কারাবন্দী হন এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলই দমন–নির্যাতনের মুখে পড়ে।

এই সময়েই আলোচনায় আসে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা ও রাজনৈতিক সংস্কারের ধারণা, যা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বিএনপিই তখন তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়; খালেদা জিয়া এবং তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান গ্রেফতার হন। রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসনে যান, যার অবসান ঘটে ১৭ বছর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার মাধ্যমে।

সেনাসমর্থিত সরকারের সময় বিএনপি ভাঙার চেষ্টাও হয়েছিল। তবে খালেদা জিয়া দলটিকে ঐক্যবদ্ধ রেখে আবার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করতে সক্ষম হন।

পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপির বর্জন, সেই নির্বাচনকে ঘিরে সহিংস আন্দোলন এবং ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন—যেখানে বিএনপি অংশ নিয়ে মাত্র পাঁচটি আসন পায়—দুই দলের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে। ‘রাতের ভোট’সহ নানা অনিয়মের অভিযোগে ওই নির্বাচন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এরপর ২০২৪ সালের নির্বাচনেও বিএনপি ও তার মিত্ররা অংশ নেয়নি।

এর মাঝেই ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী করা হয়। দুই বছর পর কোভিড–১৯ মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও তার চলাচল সীমিত ছিল। এসব ঘটনাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্পর্ককে চরম বৈরিতার পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

অর্থাৎ, একের পর এক সংঘাতপূর্ণ ঘটনা, বিতর্কিত নির্বাচন ও প্রতিহিংসার রাজনীতি খালেদা–হাসিনার সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতায় রূপ দিয়েছে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া তিন জোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়, যা আন্দোলনে সাময়িক ছেদ তৈরি করেছিল। তবে খালেদা জিয়া সেই নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আন্দোলনে অটল থাকেন, ফলে ‘আপসহীন’ নেত্রী হিসেবে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও দৃঢ় হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জেনারেল এরশাদের শাসনামল থেকে শুরু করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বিএনপি ভাঙার চেষ্টা হয়েছে। দলের একাধিক নেতা বেরিয়ে গিয়ে নতুন দলও গঠন করেছেন। কিন্তু খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলে রূপ দিতে সক্ষম হন। জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপিকে তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে পরিণত করেন এবং নানা মত ও স্রোতের সমন্বয়ে গঠিত দলটির ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন।

খালেদা জিয়া ১৯৯১ ও ২০০১ সালে পূর্ণ মেয়াদে এবং ১৯৯৬ সালে স্বল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোট প্রায় ১০ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। এছাড়া তিনি দুই দফা সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।

তবে তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ দুই দশক কেটেছে ক্ষমতার বাইরে। এর বড় অংশজুড়ে ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, আর শেষ পর্যায়ে কারাবাস ও দীর্ঘ অসুস্থতা। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে টানা দুই বছর তিনি কারাবন্দী ছিলেন। মুক্তির পর বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি।

বিএনপির অভিযোগ, কারাবাসের কারণে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা গুরুতর আকার ধারণ করে এবং শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু ঘটে, যার দায় তারা আওয়ামী লীগের ওপর চাপায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের অভিযোগ, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল, যার দায় তারা বিএনপির ওপর আরোপ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব পারস্পরিক অভিযোগ ও সংঘাতই খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতায় রূপ দিয়েছে এবং সেই বৈরিতার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর ছাপ রেখে গেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বিশেষ প্রতিবেদন/ ‘দুই বেগমের যুদ্ধ’র সমাপ্তি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৩৭:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ, প্রভাবশালী ও দ্বন্দ্বমুখর অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে যা পরিচিত ছিল ‘দুই বেগমের রাজনীতি’ বা ‘দুই বেগমের যুদ্ধ’ নামে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা, তা সময়ের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও প্রতিহিংসার রাজনীতিতে রূপ নেয়। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের ক্ষমতা হস্তান্তর, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলন, ২০০১ সালের নির্বাচন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা—এসব ঘটনা দুই নেত্রীর সম্পর্ককে ক্রমে সহনশীলতা থেকে বৈরিতার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়।

দুই নেত্রীর শাসনামলেই মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদ নিয়ে অভিযোগ-সমালোচনা ছিল। তবে শেখ হাসিনার টানা দেড় দশকের শাসনে বিরোধী দমন, বিতর্কিত নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরম রূপ নেয় বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যার পরিণতিতে গণ-অভ্যুত্থানে তার ক্ষমতাচ্যুতি ঘটে। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ দুই দশক কেটেছে ক্ষমতার বাইরে—আন্দোলন, কারাবাস ও অসুস্থতার মধ্যে।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বনির্ভর এই রাজনীতির একটি অধ্যায় শেষ হলেও দ্বি-দলীয় রাজনীতির কাঠামো ভাঙেনি। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নতুন বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামীর উত্থান দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই অধ্যায়ের সমাপ্তি কি আদৌ নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করবে, নাকি পুরোনো ধারাই নতুন রূপে অব্যাহত থাকবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার স্বল্পভাষী ও সহনশীল আচরণ তাকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে রূপ দিয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে তিনি কখনো নির্বাচনে পরাজিত হননি—এটিও তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ‘দুই নেত্রীর রাজনীতি’র অধ্যায় শেষ হলেও দ্বি-দলীয় রাজনীতির কাঠামো ভাঙেনি। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামী। সামনে নির্বাচনকে ঘিরে নতুন বাস্তবতায় রাজনীতি নতুন মোড় নিলেও, বিশ্লেষকদের মতে পুরোনো দ্বি-দলীয় ধারাই আপাতত অব্যাহত থাকবে।

অর্থাৎ, একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও বাংলাদেশের রাজনীতির মৌলিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এখনও অনিশ্চিত।

সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়েই খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দুই নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। সেই আন্দোলনে দুজনের নেতৃত্ব ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, তবে তখনো তা বৈরিতায় রূপ নেয়নি।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর মাত্র ৩৬ বছর বয়সে বিপর্যস্ত বিএনপির নেতৃত্ব নেন খালেদা জিয়া। অন্যদিকে ১৯৮১ সালে নির্বাসন থেকে ফিরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সাতদলীয় জোট ও আওয়ামী লীগের আটদলীয় জোট আলাদা থাকলেও আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন এই দুই নেত্রী। প্রয়োজনে তারা বৈঠকেও বসেছিলেন, যা আন্দোলনকে গতি দেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও এর পরবর্তী সময়ে দুই নেত্রীর মধ্যে রাজনৈতিক সহনশীলতা বিদ্যমান ছিল। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার এবং ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে শেখ হাসিনার প্রথম সরকার—এই দুই মেয়াদেই সম্পর্ক পুরোপুরি বৈরিতায় পৌঁছায়নি।

তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু, ১৯৯৬ সালের একতরফা নির্বাচন এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রাজনীতিতে টানাপোড়েন বাড়িয়ে তোলে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের বিজয়ের পর রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর দুই নেত্রীর সম্পর্ক চূড়ান্ত বৈরিতায় রূপ নেয়। এরপর আর স্বাভাবিক রাজনৈতিক সম্পর্ক ফেরেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈরিতাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন ও সংঘাতের সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

অর্থাৎ, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে জন্ম নেওয়া যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা একসময় সহনশীল ছিল, তা সময়ের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রূপ নিয়ে বৈরিতায় পরিণত হয়—যার প্রভাব বহু বছর ধরে দেশের রাজনীতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিএনপি–আওয়ামী লীগের সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে যে চরম বৈরিতায় পৌঁছেছে, তার পেছনে কয়েকটি ঘটনা রাজনৈতিক বাঁকবদলের বড় কারণ হয়ে উঠেছে।

২০০৪ সালে বিএনপি–জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা দুই দলের সম্পর্ককে গভীর বৈরিতার দিকে ঠেলে দেয়। এই ঘটনার পর রাজনৈতিক আস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। এর পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবন থেকে খালেদা জিয়ার উচ্ছেদকে প্রতিহিংসার রাজনীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই নেত্রীর তিক্ততার প্রভাবে রাজনীতিতে প্রতিশোধমূলক ধারাই প্রাধান্য পেতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৬–০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে রাজনীতিকদের হাত থেকে ক্ষমতা সরে গিয়ে তা পড়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। সে সময় খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা—দুই নেত্রীই কারাবন্দী হন এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলই দমন–নির্যাতনের মুখে পড়ে।

এই সময়েই আলোচনায় আসে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা ও রাজনৈতিক সংস্কারের ধারণা, যা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বিএনপিই তখন তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়; খালেদা জিয়া এবং তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান গ্রেফতার হন। রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসনে যান, যার অবসান ঘটে ১৭ বছর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার মাধ্যমে।

সেনাসমর্থিত সরকারের সময় বিএনপি ভাঙার চেষ্টাও হয়েছিল। তবে খালেদা জিয়া দলটিকে ঐক্যবদ্ধ রেখে আবার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করতে সক্ষম হন।

পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপির বর্জন, সেই নির্বাচনকে ঘিরে সহিংস আন্দোলন এবং ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন—যেখানে বিএনপি অংশ নিয়ে মাত্র পাঁচটি আসন পায়—দুই দলের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে। ‘রাতের ভোট’সহ নানা অনিয়মের অভিযোগে ওই নির্বাচন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এরপর ২০২৪ সালের নির্বাচনেও বিএনপি ও তার মিত্ররা অংশ নেয়নি।

এর মাঝেই ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী করা হয়। দুই বছর পর কোভিড–১৯ মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও তার চলাচল সীমিত ছিল। এসব ঘটনাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্পর্ককে চরম বৈরিতার পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

অর্থাৎ, একের পর এক সংঘাতপূর্ণ ঘটনা, বিতর্কিত নির্বাচন ও প্রতিহিংসার রাজনীতি খালেদা–হাসিনার সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতায় রূপ দিয়েছে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া তিন জোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়, যা আন্দোলনে সাময়িক ছেদ তৈরি করেছিল। তবে খালেদা জিয়া সেই নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আন্দোলনে অটল থাকেন, ফলে ‘আপসহীন’ নেত্রী হিসেবে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও দৃঢ় হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জেনারেল এরশাদের শাসনামল থেকে শুরু করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বিএনপি ভাঙার চেষ্টা হয়েছে। দলের একাধিক নেতা বেরিয়ে গিয়ে নতুন দলও গঠন করেছেন। কিন্তু খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলে রূপ দিতে সক্ষম হন। জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপিকে তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে পরিণত করেন এবং নানা মত ও স্রোতের সমন্বয়ে গঠিত দলটির ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন।

খালেদা জিয়া ১৯৯১ ও ২০০১ সালে পূর্ণ মেয়াদে এবং ১৯৯৬ সালে স্বল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোট প্রায় ১০ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। এছাড়া তিনি দুই দফা সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।

তবে তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ দুই দশক কেটেছে ক্ষমতার বাইরে। এর বড় অংশজুড়ে ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, আর শেষ পর্যায়ে কারাবাস ও দীর্ঘ অসুস্থতা। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে টানা দুই বছর তিনি কারাবন্দী ছিলেন। মুক্তির পর বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি।

বিএনপির অভিযোগ, কারাবাসের কারণে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা গুরুতর আকার ধারণ করে এবং শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু ঘটে, যার দায় তারা আওয়ামী লীগের ওপর চাপায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের অভিযোগ, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল, যার দায় তারা বিএনপির ওপর আরোপ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব পারস্পরিক অভিযোগ ও সংঘাতই খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতায় রূপ দিয়েছে এবং সেই বৈরিতার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর ছাপ রেখে গেছে।