ঢাকা ০৩:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে বদলে গেছে উত্তরাঞ্চলের নদীর মানচিত্র

রাজশাহী ব্যুরো
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৮:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাজশাহীসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে একসময় প্রাণবন্ত ছিল নদী, খাল আর জলাশয়ের বিস্তীর্ণ নেটওয়ার্ক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব, নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং দখল–দূষণের কারণে রাজশাহী বিভাগের অন্তত ৪০টির বেশি নদী ও খাল এখন অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

স্থানীয়দের ভাষায়, যে নদীগুলো একসময় মাছ, নৌকা আর জীবিকার ভরসা ছিল, সেগুলো এখন শুকিয়ে ধু ধু বালুচরে পরিণত হচ্ছে। পদ্মার শাখা নদীগুলোতে নাব্যতা হারিয়ে গেছে, আর শুষ্ক মৌসুমে মূল পদ্মাও অনেক জায়গায় মরুভূমির মতো রূপ নেয়।

পরিবেশের এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জীববৈচিত্র্যে। একসময় এসব নদীতে যে ডলফিন, ঘড়িয়াল, দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত, তা এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। পদ্মার ইলিশও আগের মতো আর দেখা যায় না বলে আক্ষেপ করেন স্থানীয় জেলেরা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীগুলোতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দখল ও দূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এ অবস্থায় নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটি রাজশাহী ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বড়কুঠী পদ্মাপারে গণজমায়েত করে নতুন করে পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি জানায়। সেখানে বক্তারা বলেন, গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন–জীবিকা গভীর সংকটে পড়েছে।

তাদের মতে, ১৯৭৬ সালের ফারাক্কা লং মার্চ বাংলাদেশের পানি অধিকার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আজও প্রাসঙ্গিক।

পরিবেশবিদরা বলছেন, গত পাঁচ দশকে ফারাক্কার প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, অনেক গভীর নলকূপ অকার্যকর হয়ে পড়ছে, আর সেচনির্ভর কৃষিও ঝুঁকিতে পড়ছে।

নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা অভিযোগ করেন, পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীকেন্দ্রিক জীবিকা হারিয়েছে লাখো মানুষ। শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।

তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ নিশ্চিত করে কিছুটা হলেও নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হতে পারে।

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেছেন, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে পদ্মা নদী অববাহিকায় পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর মতে, শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় পদ্মা অনেক জায়গায় প্রায় মরুভূমির মতো পরিস্থিতিতে পৌঁছায়। এ অবস্থায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত নদীর পানির স্তর ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন। সংরক্ষিত পানি বিভিন্ন নদীপথে সরবরাহ করে শুকনো মৌসুমেও পানিপ্রবাহ সচল রাখা যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, বর্তমানে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা অনেক বেড়েছে। তাঁর মতে, পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে সেচ কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে কৃষকের উপকার হবে এবং দীর্ঘদিনের পানিসংকটও অনেকটা কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সব মিলিয়ে নদীগুলোকে ঘিরে একসময়কার প্রাণচাঞ্চল্য আজ সংকটের মুখে। আর সেই সংকট কাটিয়ে উঠতে টিকে থাকার লড়াই করছে পদ্মা ও তার শাখা নদীগুলো—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে বদলে গেছে উত্তরাঞ্চলের নদীর মানচিত্র

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৮:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

রাজশাহীসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে একসময় প্রাণবন্ত ছিল নদী, খাল আর জলাশয়ের বিস্তীর্ণ নেটওয়ার্ক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব, নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং দখল–দূষণের কারণে রাজশাহী বিভাগের অন্তত ৪০টির বেশি নদী ও খাল এখন অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

স্থানীয়দের ভাষায়, যে নদীগুলো একসময় মাছ, নৌকা আর জীবিকার ভরসা ছিল, সেগুলো এখন শুকিয়ে ধু ধু বালুচরে পরিণত হচ্ছে। পদ্মার শাখা নদীগুলোতে নাব্যতা হারিয়ে গেছে, আর শুষ্ক মৌসুমে মূল পদ্মাও অনেক জায়গায় মরুভূমির মতো রূপ নেয়।

পরিবেশের এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জীববৈচিত্র্যে। একসময় এসব নদীতে যে ডলফিন, ঘড়িয়াল, দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত, তা এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। পদ্মার ইলিশও আগের মতো আর দেখা যায় না বলে আক্ষেপ করেন স্থানীয় জেলেরা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীগুলোতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দখল ও দূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এ অবস্থায় নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটি রাজশাহী ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বড়কুঠী পদ্মাপারে গণজমায়েত করে নতুন করে পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি জানায়। সেখানে বক্তারা বলেন, গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন–জীবিকা গভীর সংকটে পড়েছে।

তাদের মতে, ১৯৭৬ সালের ফারাক্কা লং মার্চ বাংলাদেশের পানি অধিকার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আজও প্রাসঙ্গিক।

পরিবেশবিদরা বলছেন, গত পাঁচ দশকে ফারাক্কার প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের নদীগুলো ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, অনেক গভীর নলকূপ অকার্যকর হয়ে পড়ছে, আর সেচনির্ভর কৃষিও ঝুঁকিতে পড়ছে।

নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা অভিযোগ করেন, পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীকেন্দ্রিক জীবিকা হারিয়েছে লাখো মানুষ। শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।

তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ নিশ্চিত করে কিছুটা হলেও নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হতে পারে।

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেছেন, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে পদ্মা নদী অববাহিকায় পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর মতে, শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় পদ্মা অনেক জায়গায় প্রায় মরুভূমির মতো পরিস্থিতিতে পৌঁছায়। এ অবস্থায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত নদীর পানির স্তর ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন। সংরক্ষিত পানি বিভিন্ন নদীপথে সরবরাহ করে শুকনো মৌসুমেও পানিপ্রবাহ সচল রাখা যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, বর্তমানে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা অনেক বেড়েছে। তাঁর মতে, পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে সেচ কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে কৃষকের উপকার হবে এবং দীর্ঘদিনের পানিসংকটও অনেকটা কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সব মিলিয়ে নদীগুলোকে ঘিরে একসময়কার প্রাণচাঞ্চল্য আজ সংকটের মুখে। আর সেই সংকট কাটিয়ে উঠতে টিকে থাকার লড়াই করছে পদ্মা ও তার শাখা নদীগুলো—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।