ঢাকা ০৩:১৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গার্মেন্টস শিল্পে অনিশ্চয়তার ছায়া, সংকটে উৎপাদন

জয়নাল আবেদিন
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১০:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ঢাকার গার্মেন্টস শিল্পাঞ্চলে সকালটা এখন আর শুধু কাজের শুরু নয়—এটা এক অনিশ্চয়তার শুরু। মেশিন চলবে কি চলবে না, বিদ্যুৎ থাকবে কি থাকবে না—এই প্রশ্ন নিয়েই প্রতিদিন কারখানার গেট খুলছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব, জ্বালানি সংকট আর বৈশ্বিক বাজারের চাপ—সব মিলিয়ে দেশের তৈরি পোশাক খাত এখন কঠিন এক সময় পার করছে। ব্যবসায়ীদের হিসাব বলছে, উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, মূল সমস্যা এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। লোডশেডিং বেড়েছে, আর কারখানাগুলো টিকে আছে জেনারেটরের ভরসায়—যার ফলে খরচও দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

একজন গার্মেন্টস মালিকের কথায়, “আগে যে খরচ হতো ১৫-১৬ লাখ টাকা, এখন সেটা প্রায় ৩০ লাখ। লাভ তো দূরের কথা, টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”

এই চাপের মধ্যেই বড় ধাক্কা এসেছে আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক রপ্তানি বাজার হলেও, নতুন শুল্ক নীতি ও অর্ডার কমে যাওয়ায় রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে রপ্তানি প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে। সামগ্রিকভাবে অর্থবছরেও পতনের ধারা অব্যাহত।

কারখানার ভেতরের বাস্তবতা আরও কঠিন। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ থাকে না ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আবার জেনারেটর চালালেও বাড়তি খরচের চাপে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সময়মতো শিপমেন্ট না হলে ক্রেতার আস্থা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

কিছু কারখানা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তুলনামূলক সুবিধা পেলেও দেশের অধিকাংশ রপ্তানিমুখী কারখানা সেই সুবিধার বাইরে। ফলে পুরো খাতটাই চাপের মধ্যে।

এর মধ্যে ডিজেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ও উৎপাদন খরচ আরও বেড়েছে। তুলা ও কাঁচামালের দামও আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে, যা চাপকে আরও বহুগুণ করছে।

একজন ব্যবসায়ীর ভাষায়, “খরচ বাড়ছে, কিন্তু বায়াররা দাম বাড়াতে রাজি না। অর্ডারও আটকে যাচ্ছে। তাহলে আমরা টিকে থাকব কীভাবে?”

এই অবস্থায় সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো কিছু উদ্যোগের কথা বলছে—যেমন জ্বালানি কার্ড, বিশেষ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।

তবু শিল্পের ভেতরের আশঙ্কা স্পষ্ট—এই সংকট যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে শুধু উৎপাদন নয়, শ্রমিকের বেতন, অর্ডার ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খাতটি এখন দাঁড়িয়ে আছে এক নাজুক ভারসাম্যে—একদিকে টিকে থাকার লড়াই, অন্যদিকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

গার্মেন্টস শিল্পে অনিশ্চয়তার ছায়া, সংকটে উৎপাদন

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১০:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকার গার্মেন্টস শিল্পাঞ্চলে সকালটা এখন আর শুধু কাজের শুরু নয়—এটা এক অনিশ্চয়তার শুরু। মেশিন চলবে কি চলবে না, বিদ্যুৎ থাকবে কি থাকবে না—এই প্রশ্ন নিয়েই প্রতিদিন কারখানার গেট খুলছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব, জ্বালানি সংকট আর বৈশ্বিক বাজারের চাপ—সব মিলিয়ে দেশের তৈরি পোশাক খাত এখন কঠিন এক সময় পার করছে। ব্যবসায়ীদের হিসাব বলছে, উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, মূল সমস্যা এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। লোডশেডিং বেড়েছে, আর কারখানাগুলো টিকে আছে জেনারেটরের ভরসায়—যার ফলে খরচও দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

একজন গার্মেন্টস মালিকের কথায়, “আগে যে খরচ হতো ১৫-১৬ লাখ টাকা, এখন সেটা প্রায় ৩০ লাখ। লাভ তো দূরের কথা, টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”

এই চাপের মধ্যেই বড় ধাক্কা এসেছে আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক রপ্তানি বাজার হলেও, নতুন শুল্ক নীতি ও অর্ডার কমে যাওয়ায় রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে রপ্তানি প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে। সামগ্রিকভাবে অর্থবছরেও পতনের ধারা অব্যাহত।

কারখানার ভেতরের বাস্তবতা আরও কঠিন। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ থাকে না ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আবার জেনারেটর চালালেও বাড়তি খরচের চাপে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সময়মতো শিপমেন্ট না হলে ক্রেতার আস্থা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

কিছু কারখানা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তুলনামূলক সুবিধা পেলেও দেশের অধিকাংশ রপ্তানিমুখী কারখানা সেই সুবিধার বাইরে। ফলে পুরো খাতটাই চাপের মধ্যে।

এর মধ্যে ডিজেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ও উৎপাদন খরচ আরও বেড়েছে। তুলা ও কাঁচামালের দামও আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে, যা চাপকে আরও বহুগুণ করছে।

একজন ব্যবসায়ীর ভাষায়, “খরচ বাড়ছে, কিন্তু বায়াররা দাম বাড়াতে রাজি না। অর্ডারও আটকে যাচ্ছে। তাহলে আমরা টিকে থাকব কীভাবে?”

এই অবস্থায় সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো কিছু উদ্যোগের কথা বলছে—যেমন জ্বালানি কার্ড, বিশেষ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।

তবু শিল্পের ভেতরের আশঙ্কা স্পষ্ট—এই সংকট যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে শুধু উৎপাদন নয়, শ্রমিকের বেতন, অর্ডার ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খাতটি এখন দাঁড়িয়ে আছে এক নাজুক ভারসাম্যে—একদিকে টিকে থাকার লড়াই, অন্যদিকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপ।