দরপত্রের স্বচ্ছতা, ব্যয় ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
ভারতের হাতে ১৭ হাজার কোটি টাকার কাজ, বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫৩:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো নিয়ে টানাপোড়েন, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা এবং অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনে অমীমাংসিত বিরোধ—সব মিলিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অস্বস্তি এখনো কাটেনি। রাজনৈতিক পর্যায়ে যখন পারস্পরিক আস্থার সংকট, তখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো উদ্যোগগুলোর একটি মেট্রোরেল লাইন-১-এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের কাজ পেল ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (এলঅ্যান্ডটি)। সরকারি ক্রয়প্রস্তাব অনুযায়ী, প্যাকেজ দুটির প্রস্তাবিত মূল্য ১৭ হাজার ৫১২ কোটি টাকার বেশি।
এই চুক্তি তাই কেবল একটি অবকাঠামো নির্মাণের খবর নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে অর্থনৈতিক স্বার্থ, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার প্রশ্ন। রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেও ভারতীয় প্রতিষ্ঠানকে এত বড় কাজ দেওয়ার পেছনে কী বিবেচনা কাজ করেছে? প্রতিযোগিতায় অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান কী ছিল? দরপত্র মূল্যায়নে কোন মানদণ্ড প্রাধান্য পেয়েছে? আর হাজার হাজার কোটি টাকার এই চুক্তিতে বাংলাদেশের আর্থিক ও কৌশলগত স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত?
এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে চুক্তিটিকে নিছক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।
পুরো মেট্রোরেল নয়, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ
প্রথমেই পরিষ্কার করা দরকার, মেট্রোরেল লাইন-১-এর পুরো কাজ ভারতীয় প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়নি। প্রায় ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের দায়িত্ব পেয়েছে এলঅ্যান্ডটি। একটি প্যাকেজে রেললাইন ও বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা, অন্যটিতে সংকেত, টেলিযোগাযোগ এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর স্থাপন করা হবে।
অর্থাৎ ট্রেন চলাচলের জন্য অপরিহার্য অবকাঠামো ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বড় একটি অংশের দায়িত্ব পাচ্ছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি। এসব ব্যবস্থা শুধু নির্মাণের সময় নয়, মেট্রোরেল চালু হওয়ার পরও এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে।
প্রশ্ন হলো, এত গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছে? প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় জনবলকে প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশের সরবরাহ এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণের শর্ত কতটা শক্তিশালী? এসব বিষয় চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও জনসমক্ষে সেগুলোর বিস্তারিত তথ্য নেই।
দুই প্যাকেজে ১৭ হাজার ৫১২ কোটি টাকা
সরকারি ক্রয়প্রস্তাব অনুযায়ী, সিপি-০৯ প্যাকেজের প্রস্তাবিত মূল্য ১১ হাজার ৬৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এলঅ্যান্ডটি জাপানের সুমিতোমো করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে এই কাজ করবে। এর আওতায় রেললাইন স্থাপন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থা, ট্র্যাকশন সাবস্টেশন এবং সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। নকশা থেকে শুরু করে সরঞ্জাম সংগ্রহ, স্থাপন, পরীক্ষা ও চালুর দায়িত্বও থাকবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের।
অন্যদিকে, সিপি-১০ প্যাকেজের প্রস্তাবিত মূল্য ৬ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এতে ট্রেন চলাচলের সংকেতব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ এবং প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর স্থাপন করা হবে। দুটি প্যাকেজের প্রস্তাবিত মোট মূল্য ১৭ হাজার ৫১২ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। এলঅ্যান্ডটির ২৭ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তিতে সুনির্দিষ্ট চুক্তিমূল্য প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি তাদের নিজস্ব শ্রেণিবিন্যাসে কাজটিকে ৫ হাজার কোটি থেকে ১০ হাজার কোটি ভারতীয় রুপির ‘মেজর অর্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। সরকারি ক্রয়প্রস্তাবের টাকার অঙ্ক এবং প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত অর্ডার-শ্রেণি এক নয়। তাই চূড়ান্ত চুক্তিমূল্য ও আর্থিক শর্ত স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু মূল্যায়নের হিসাব কোথায়?
এলঅ্যান্ডটির পক্ষে একটি বড় যুক্তি হলো, প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার মেট্রোরেল লাইন-৬-এর সমন্বিত রেলব্যবস্থা স্থাপনের কাজ করেছে। ফলে বাংলাদেশের প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কারিগরি পরিবেশ সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আগের কাজের অভিজ্ঞতা নতুন প্রকল্পে অগ্রাধিকার পাওয়ার একটি যৌক্তিক কারণ হতে পারে।
কিন্তু অভিজ্ঞতাই কি একমাত্র বিবেচনা ছিল? দরপত্রে কতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল? প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত মূল্য কত ছিল? কারিগরি সক্ষমতা, নির্মাণকাল, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সুবিধার তুলনামূলক মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়েছে? সর্বনিম্ন দরদাতা না হলেও কোন যুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটি নির্বাচিত হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন।
কারণ সরকারি অর্থের বড় অংশ ব্যয় করে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া মানেই শুধু নির্মাণের দায়িত্ব হস্তান্তর নয়; এর সঙ্গে প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ নির্ভরশীলতার বিষয়ও জড়িয়ে থাকে। ফলে দরপত্রের সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি যত বেশি স্বচ্ছ হবে, ততই চুক্তির গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
দিল্লির সঙ্গে বিরোধ, বাণিজ্যে সহযোগিতা
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা জটিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁকে ফেরত পাঠানোর দাবি দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তির অন্যতম কারণ। এর পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা ও পানি বণ্টনের মতো পুরোনো বিরোধও রয়ে গেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১৬ আগস্টের প্রতিবেদনে ভারতের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সফর নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি উপযুক্ত কূটনৈতিক পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্কের স্বাভাবিকতা এখনো প্রশ্নের মুখে।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানকে হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। তবে বাণিজ্যিক সহযোগিতা ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে এক করে দেখারও সুযোগ নেই। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত স্বার্থ রয়েছে। মেট্রোরেল প্রকল্পে জাপানের অর্থায়ন এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণও সেই বাস্তবতার অংশ।
তবে রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক চলতে পারে—এই যুক্তি দিয়ে চুক্তির স্বচ্ছতা ও বাংলাদেশের স্বার্থ যাচাইয়ের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। আবার একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে বলেই একে রাজনৈতিক ছাড় বা কূটনৈতিক সমঝোতার ফল বলারও ভিত্তি নেই। সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ জানতে হলে দরপত্র ও চুক্তির নথিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লাভের হিসাব শুধু যাত্রীসুবিধায় সীমাবদ্ধ নয়
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেট্রোরেল লাইন-১ চালু হলে বিমানবন্দর, কমলাপুর, নতুন বাজার ও পূর্বাচলের মধ্যে যাতায়াত সহজ হবে। যানজটে সময় নষ্ট কমবে, কর্মঘণ্টা বাঁচবে এবং গণপরিবহনের ওপর মানুষের আস্থা বাড়তে পারে। কিন্তু এসব সম্ভাব্য সুবিধার বিপরীতে প্রকল্পের ব্যয়, পরিচালন খরচ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ের হিসাবও জরুরি।
বিশেষ করে সংকেত, টেলিযোগাযোগ ও বিদ্যুৎব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ কে করবে, যন্ত্রাংশ কোথা থেকে আসবে, স্থানীয় প্রকৌশলীরা কতটা সক্ষম হবেন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর কতটা নির্ভর করতে হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর চুক্তিতেই থাকা প্রয়োজন।
প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও যদি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার বা রক্ষণাবেক্ষণ সেবার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে নির্মাণপর্বের ব্যয়ের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। তাই শুধু প্রকল্প নির্মাণের দর নয়, পুরো জীবনচক্রের ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না ১৭ হাজার কোটি টাকার চুক্তি
এই চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়, বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে। দরপত্র মূল্যায়নের তথ্য, চুক্তির শর্ত, প্রযুক্তি হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা, স্থানীয় জনবলের অংশগ্রহণ, রক্ষণাবেক্ষণের দায় এবং ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি—সবকিছু স্পষ্ট হওয়া দরকার।
প্রকল্পের অর্থায়নে জাইকার ভূমিকা থাকলেও চুক্তির প্রতিটি শর্তের দায় বাংলাদেশের। বিদেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে বলে সরকারের জবাবদিহি কমে যায় না। বরং বিপুল অঙ্কের সরকারি ব্যয় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর কারণে নজরদারি আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত ভারতীয় প্রতিষ্ঠান কাজ পেল কি না, সেটিই বাংলাদেশের সাফল্য বা ব্যর্থতার মাপকাঠি হতে পারে না। আসল প্রশ্ন—কাজটি প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছে কি না, ব্যয় যৌক্তিক কি না, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেশে তৈরি হচ্ছে কি না এবং চুক্তির শর্তে জনগণের স্বার্থ সুরক্ষিত আছে কি না।
ঢাকা-দিল্লির রাজনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলেছে কি না, তা সময়ই বলবে। কিন্তু ১৭ হাজার কোটি টাকার এই চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা রক্ষা পেল, সেই হিসাব এখনই জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।





















