ঢাকা ১০:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

পূর্বাচলে পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রকল্প, দেশে-বিদেশে জমি-ফ্ল্যাট ও পরিবারের নামে সম্পদের খোঁজ

পুলিশের সম্পদের পাহাড়, নজরদারিতে সাবেক-বর্তমান কর্মকর্তারা

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৪৩:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পুলিশের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে অর্জিত সম্পদের হিসাব কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এই প্রশ্ন ঘিরে নতুন করে নজরদারি শুরু হয়েছে সাবেক ও বর্তমান একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার ওপর। রাজধানীর পূর্বাচলে পুলিশ কর্মকর্তাদের আবাসন প্রকল্পে একাধিক আলিশান বাড়ি ও ফ্ল্যাটের তথ্য, দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি-ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং বিদেশে সম্পদ থাকার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের একজন অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ওই অভিযানে পূর্বাচলের একটি প্রকল্পে সাবেক ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তাদের নামে একাধিক বাড়ি থাকার তথ্য সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস কিংবা কোনো কর্মকর্তা অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করেছেন কি না, তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, শুধু কর্মকর্তাদের নিজের নামে থাকা সম্পদ নয়, তাঁদের স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়স্বজন এবং ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সহযোগীদের নামে থাকা জমি, ফ্ল্যাট ও বিনিয়োগের তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে। চাকরির বেতন, ঘোষিত আয় ও পারিবারিক আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে জীবনযাপনের ব্যয়ের অসংগতি পাওয়া গেলে তা অনুসন্ধানের আওতায় আনা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তার সম্পদের তথ্য সামনে আসতে শুরু করলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয় বলে সূত্রের দাবি। এরই ধারাবাহিকতায় সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের একটি তালিকা তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে জানা গেছে। তবে তালিকায় নাম থাকা মানেই অপরাধে জড়িত থাকা নয়; অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নথিভিত্তিক অনুসন্ধান।

সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন, অনুসন্ধানে পরিবারের সদস্যরাও

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, নজরদারিতে থাকা কর্মকর্তাদের কারও ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি রয়েছে, কারও দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। কয়েকজনের পরিবারের সদস্যদের বিদেশে পড়াশোনার ব্যয় এবং বিদেশে সম্পদ থাকার অভিযোগও যাচাই করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানকারীরা মূলত কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন—কর্মকর্তার বৈধ আয়ের পরিমাণ, সম্পদ কেনার সময় ও অর্থের উৎস, ব্যাংক লেনদেন, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব এবং পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সক্ষমতা। কোনো সম্পদ আত্মীয় বা অন্য কারও নামে থাকলেও সেটির ক্রয়মূল্য কে পরিশোধ করেছেন, কে ভোগদখল করছেন এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী কে—এসব তথ্য মিলিয়ে দেখার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এসেছে। অভিযোগগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তবে কাউকে অযথা হয়রানি না করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

দুদকের কয়েকটি অনুসন্ধান ও মামলায় অগ্রগতি

পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধানের মধ্যে দুদকের কয়েকটি পৃথক পদক্ষেপও আলোচনায় এসেছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা ও সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম এবং তাঁর স্ত্রী জাকিয়া পারভীনের সম্পদ বিবরণী তলবের নোটিশ জারির সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাঁদের নামে প্রায় ৩ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ১৫ অক্টোবর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত প্রায় ৮৩ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পুলিশ পরিদর্শক মো. ফখরুদ্দীন ভূঞা ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ফখরুদ্দীন বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত। অভিযোগের সময় তিনি ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা শাখায় দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এ ছাড়া সাবেক ডিএমপি কমিশনার হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে করা পৃথক দুই মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এর একটি মামলায় তাঁকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। অন্য মামলায় তাঁর ছোট ভাই চিকিৎসক ডা. এবিএম শাহরিয়ারকে প্রধান আসামি এবং হারুন অর রশীদকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে।

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে করা মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হকের অবৈধ সম্পদসংক্রান্ত নথিপত্র ও প্রমাণাদি লুকানোর চেষ্টার অভিযোগে দুদক অভিযান চালিয়েছে। সম্প্রতি পুলিশের এসআই হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধেও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে সংস্থাটি।

এসব ঘটনা পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পদ অর্জনের উৎস নিয়ে দুদকের চলমান কার্যক্রমের অংশ। তবে প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত, অভিযোগপত্র ও আদালতের সিদ্ধান্তের অবস্থান আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

যেসব কর্মকর্তার নাম আলোচনায়

গোয়েন্দা সংস্থা ও দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট তালিকায় সাবেক ও বর্তমান একাধিক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার নাম রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, খন্দকার গোলাম ফারুক ও শফিকুল ইসলাম; ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ; পিবিআইর সাবেক প্রধান বনজ কুমার মজুমদার; সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ওয়াই এম বেলালুর রহমান; র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশীদ এবং সিআইডির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া।

এ ছাড়া অতিরিক্ত আইজিপি দেবদাস ভট্টাচার্য্য, খন্দকার লুৎফুল কবীর, ট্যুরিস্ট পুলিশের সাবেক প্রধান মীর রেজাউল আলম, রংপুর রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি আবদুল বাতেন, চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির ও শেখ নাজমুল আলমের নামও আলোচনায় রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

তালিকায় আরও রয়েছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মাহবুব আলম, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান, সাবেক ডিআইজি জয়দেব কুমার ভদ্র ও ইমাম হোসেন, সিটিটিসির সাবেক প্রধান মো. আসাদুজ্জামান, শাহ মিজান শফিউর রহমান, আনিসুর রহমান, মোল্যা নজরুল ইসলাম, এসএম মোস্তাক আহমেদ, জিহাদুল কবীর, মো. ইলিয়াস শরীফ, শাহ আবিদ হোসেন, মো. জামিল হাসান ও সৈয়দ নূরুল ইসলাম।

এ ছাড়া বিপ্লব বিজয় তালুকদার, হামিদুল আলম, ড. শামসুন্নাহার, শেখ রফিকুল ইসলাম, ড. একেএম ইকবাল হোসেন, বিপ্লব কুমার সরকার, মারুফ হোসেন সরদার, বিজয় বসাক, সুব্রত কুমার হালদার, আ স ম মাহতাব উদ্দিন, মোহা. আহমারুজ্জামান, খন্দকার নূরুন্নবী, এসএম মেহেদী হাসান, মোহাম্মদ জায়েদুল ইসলাম, প্রলয় কুমার জোয়ারদার, এসএম শফিউল্লাহ, মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, আসমা সিদ্দীকা মিলি ও গোলাম মোস্তফা রাসেলসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

তবে তালিকায় নাম থাকার অর্থ তাঁদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে, কার সম্পদ অনুসন্ধানাধীন, কার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং কার ক্ষেত্রে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এসব বিষয় পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি।

সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিধান, বাস্তবায়ন কতটা?

সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিধান রয়েছে। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ১৩ বিধিতে সম্পত্তির ঘোষণা এবং সম্পদের পরিবর্তনের বিবরণ দাখিলের বিষয় উল্লেখ আছে। বিধিমালা ও পরবর্তী সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পদের হিসাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা জারি হয়েছিল। কিন্তু ওই নির্দেশনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, কতজন কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে বিবরণী জমা দিয়েছেন এবং জমা দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও তা কার্যকরভাবে যাচাই না হলে কাগজে-কলমে থাকা হিসাবের সঙ্গে প্রকৃত সম্পদের পার্থক্য শনাক্ত করা কঠিন। বিশেষ করে পরিবারের সদস্য বা অন্য ব্যক্তির নামে সম্পদ রাখার অভিযোগ থাকলে শুধু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিবরণী দিয়ে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ সম্ভব নয়।

তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন

পুলিশের কাজের ধরন বিবেচনায় কিছু ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ বেশি সামনে আসে। মামলা গ্রহণ, তদন্ত, গ্রেপ্তার, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, অপরাধপ্রবণ এলাকায় অভিযান এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ বা প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধীনস্থ কর্মকর্তা, ঘনিষ্ঠ সহকর্মী কিংবা প্রভাবশালী কারও স্বার্থ জড়িত থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এ কারণে অভিযোগের তথ্য, আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের মালিকানা সূক্ষ্মভাবে যাচাই করতে তদন্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, অভিযোগ এলেই কাউকে হয়রানি করার সুযোগ নেই। তবে গুরুতর অভিযোগগুলো যাচাই করে বৈধ আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনুসন্ধানের কেন্দ্রে পূর্বাচলের প্রকল্প

পূর্বাচলে পুলিশ কর্মকর্তাদের আবাসন প্রকল্প ঘিরে ওঠা প্রশ্ন এখন অনুসন্ধানের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রকল্পে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার অর্থ কোথা থেকে এসেছে, বরাদ্দ ও মালিকানা কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, কোনো কর্মকর্তা একাধিক সম্পত্তির মালিক হয়েছেন কি না—এসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের বরাদ্দপত্র, জমির দলিল, নির্মাণ ব্যয়, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আয়কর নথি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোনো সম্পত্তি পরিবারের সদস্যের নামে থাকলে অর্থের প্রকৃত উৎস এবং সুবিধাভোগী কে, সেটিও অনুসন্ধানে বিবেচনায় নিতে হবে।

বিদেশে সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় নিয়েও গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য এসেছে বলে সূত্রের দাবি। তবে সন্তান বিদেশে পড়াশোনা করছেন—এ তথ্য নিজে কোনো অবৈধ সম্পদের প্রমাণ নয়। তদন্তে দেখতে হবে, শিক্ষাব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে এসেছে, পরিবারের বৈধ আয় দিয়ে সেই ব্যয় বহন করা সম্ভব কি না এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে কোনো অনিয়মের যোগসূত্র রয়েছে কি না।

তালিকা নয়, প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা

পুলিশের একটি অংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু বিচ্ছিন্ন অভিযোগ, গোয়েন্দা তথ্য কিংবা কোনো তালিকায় নাম থাকার ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। একইভাবে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হওয়ায় অভিযোগের অনুসন্ধান থেমে থাকাও গ্রহণযোগ্য নয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়, ব্যাংক ও ভূমি নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি যাচাই, বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য সংগ্রহ এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিধান কার্যকর করা এবং নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহির জন্য নয়, পুরো বাহিনীর পেশাগত মর্যাদা ও জনআস্থা পুনর্গঠনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত এই অনুসন্ধানের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে—কতজনের নাম তালিকায় রয়েছে তার ওপর নয়, বরং অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ পাওয়া গেল এবং সেই প্রমাণের ভিত্তিতে আইন কতটা সমানভাবে প্রয়োগ করা হলো, তার ওপর।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

পূর্বাচলে পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রকল্প, দেশে-বিদেশে জমি-ফ্ল্যাট ও পরিবারের নামে সম্পদের খোঁজ

পুলিশের সম্পদের পাহাড়, নজরদারিতে সাবেক-বর্তমান কর্মকর্তারা

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৪৩:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

পুলিশের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে অর্জিত সম্পদের হিসাব কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এই প্রশ্ন ঘিরে নতুন করে নজরদারি শুরু হয়েছে সাবেক ও বর্তমান একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার ওপর। রাজধানীর পূর্বাচলে পুলিশ কর্মকর্তাদের আবাসন প্রকল্পে একাধিক আলিশান বাড়ি ও ফ্ল্যাটের তথ্য, দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি-ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং বিদেশে সম্পদ থাকার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের একজন অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ওই অভিযানে পূর্বাচলের একটি প্রকল্পে সাবেক ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তাদের নামে একাধিক বাড়ি থাকার তথ্য সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস কিংবা কোনো কর্মকর্তা অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করেছেন কি না, তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, শুধু কর্মকর্তাদের নিজের নামে থাকা সম্পদ নয়, তাঁদের স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়স্বজন এবং ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সহযোগীদের নামে থাকা জমি, ফ্ল্যাট ও বিনিয়োগের তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে। চাকরির বেতন, ঘোষিত আয় ও পারিবারিক আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে জীবনযাপনের ব্যয়ের অসংগতি পাওয়া গেলে তা অনুসন্ধানের আওতায় আনা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তার সম্পদের তথ্য সামনে আসতে শুরু করলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয় বলে সূত্রের দাবি। এরই ধারাবাহিকতায় সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের একটি তালিকা তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে জানা গেছে। তবে তালিকায় নাম থাকা মানেই অপরাধে জড়িত থাকা নয়; অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নথিভিত্তিক অনুসন্ধান।

সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন, অনুসন্ধানে পরিবারের সদস্যরাও

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, নজরদারিতে থাকা কর্মকর্তাদের কারও ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি রয়েছে, কারও দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। কয়েকজনের পরিবারের সদস্যদের বিদেশে পড়াশোনার ব্যয় এবং বিদেশে সম্পদ থাকার অভিযোগও যাচাই করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানকারীরা মূলত কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন—কর্মকর্তার বৈধ আয়ের পরিমাণ, সম্পদ কেনার সময় ও অর্থের উৎস, ব্যাংক লেনদেন, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব এবং পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সক্ষমতা। কোনো সম্পদ আত্মীয় বা অন্য কারও নামে থাকলেও সেটির ক্রয়মূল্য কে পরিশোধ করেছেন, কে ভোগদখল করছেন এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী কে—এসব তথ্য মিলিয়ে দেখার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এসেছে। অভিযোগগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তবে কাউকে অযথা হয়রানি না করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

দুদকের কয়েকটি অনুসন্ধান ও মামলায় অগ্রগতি

পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধানের মধ্যে দুদকের কয়েকটি পৃথক পদক্ষেপও আলোচনায় এসেছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা ও সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম এবং তাঁর স্ত্রী জাকিয়া পারভীনের সম্পদ বিবরণী তলবের নোটিশ জারির সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাঁদের নামে প্রায় ৩ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ১৫ অক্টোবর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত প্রায় ৮৩ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পুলিশ পরিদর্শক মো. ফখরুদ্দীন ভূঞা ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ফখরুদ্দীন বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত। অভিযোগের সময় তিনি ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা শাখায় দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এ ছাড়া সাবেক ডিএমপি কমিশনার হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে করা পৃথক দুই মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এর একটি মামলায় তাঁকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। অন্য মামলায় তাঁর ছোট ভাই চিকিৎসক ডা. এবিএম শাহরিয়ারকে প্রধান আসামি এবং হারুন অর রশীদকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে।

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে করা মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হকের অবৈধ সম্পদসংক্রান্ত নথিপত্র ও প্রমাণাদি লুকানোর চেষ্টার অভিযোগে দুদক অভিযান চালিয়েছে। সম্প্রতি পুলিশের এসআই হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধেও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে সংস্থাটি।

এসব ঘটনা পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পদ অর্জনের উৎস নিয়ে দুদকের চলমান কার্যক্রমের অংশ। তবে প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত, অভিযোগপত্র ও আদালতের সিদ্ধান্তের অবস্থান আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

যেসব কর্মকর্তার নাম আলোচনায়

গোয়েন্দা সংস্থা ও দুদকের অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট তালিকায় সাবেক ও বর্তমান একাধিক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার নাম রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, খন্দকার গোলাম ফারুক ও শফিকুল ইসলাম; ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ; পিবিআইর সাবেক প্রধান বনজ কুমার মজুমদার; সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ওয়াই এম বেলালুর রহমান; র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশীদ এবং সিআইডির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া।

এ ছাড়া অতিরিক্ত আইজিপি দেবদাস ভট্টাচার্য্য, খন্দকার লুৎফুল কবীর, ট্যুরিস্ট পুলিশের সাবেক প্রধান মীর রেজাউল আলম, রংপুর রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি আবদুল বাতেন, চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির ও শেখ নাজমুল আলমের নামও আলোচনায় রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

তালিকায় আরও রয়েছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মাহবুব আলম, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান, সাবেক ডিআইজি জয়দেব কুমার ভদ্র ও ইমাম হোসেন, সিটিটিসির সাবেক প্রধান মো. আসাদুজ্জামান, শাহ মিজান শফিউর রহমান, আনিসুর রহমান, মোল্যা নজরুল ইসলাম, এসএম মোস্তাক আহমেদ, জিহাদুল কবীর, মো. ইলিয়াস শরীফ, শাহ আবিদ হোসেন, মো. জামিল হাসান ও সৈয়দ নূরুল ইসলাম।

এ ছাড়া বিপ্লব বিজয় তালুকদার, হামিদুল আলম, ড. শামসুন্নাহার, শেখ রফিকুল ইসলাম, ড. একেএম ইকবাল হোসেন, বিপ্লব কুমার সরকার, মারুফ হোসেন সরদার, বিজয় বসাক, সুব্রত কুমার হালদার, আ স ম মাহতাব উদ্দিন, মোহা. আহমারুজ্জামান, খন্দকার নূরুন্নবী, এসএম মেহেদী হাসান, মোহাম্মদ জায়েদুল ইসলাম, প্রলয় কুমার জোয়ারদার, এসএম শফিউল্লাহ, মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, আসমা সিদ্দীকা মিলি ও গোলাম মোস্তফা রাসেলসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

তবে তালিকায় নাম থাকার অর্থ তাঁদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে, কার সম্পদ অনুসন্ধানাধীন, কার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং কার ক্ষেত্রে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এসব বিষয় পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি।

সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিধান, বাস্তবায়ন কতটা?

সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিধান রয়েছে। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ১৩ বিধিতে সম্পত্তির ঘোষণা এবং সম্পদের পরিবর্তনের বিবরণ দাখিলের বিষয় উল্লেখ আছে। বিধিমালা ও পরবর্তী সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পদের হিসাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা জারি হয়েছিল। কিন্তু ওই নির্দেশনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, কতজন কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে বিবরণী জমা দিয়েছেন এবং জমা দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও তা কার্যকরভাবে যাচাই না হলে কাগজে-কলমে থাকা হিসাবের সঙ্গে প্রকৃত সম্পদের পার্থক্য শনাক্ত করা কঠিন। বিশেষ করে পরিবারের সদস্য বা অন্য ব্যক্তির নামে সম্পদ রাখার অভিযোগ থাকলে শুধু কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিবরণী দিয়ে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ সম্ভব নয়।

তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন

পুলিশের কাজের ধরন বিবেচনায় কিছু ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ বেশি সামনে আসে। মামলা গ্রহণ, তদন্ত, গ্রেপ্তার, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, অপরাধপ্রবণ এলাকায় অভিযান এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ বা প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধীনস্থ কর্মকর্তা, ঘনিষ্ঠ সহকর্মী কিংবা প্রভাবশালী কারও স্বার্থ জড়িত থাকলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এ কারণে অভিযোগের তথ্য, আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের মালিকানা সূক্ষ্মভাবে যাচাই করতে তদন্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, অভিযোগ এলেই কাউকে হয়রানি করার সুযোগ নেই। তবে গুরুতর অভিযোগগুলো যাচাই করে বৈধ আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনুসন্ধানের কেন্দ্রে পূর্বাচলের প্রকল্প

পূর্বাচলে পুলিশ কর্মকর্তাদের আবাসন প্রকল্প ঘিরে ওঠা প্রশ্ন এখন অনুসন্ধানের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রকল্পে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার অর্থ কোথা থেকে এসেছে, বরাদ্দ ও মালিকানা কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, কোনো কর্মকর্তা একাধিক সম্পত্তির মালিক হয়েছেন কি না—এসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের বরাদ্দপত্র, জমির দলিল, নির্মাণ ব্যয়, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আয়কর নথি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কোনো সম্পত্তি পরিবারের সদস্যের নামে থাকলে অর্থের প্রকৃত উৎস এবং সুবিধাভোগী কে, সেটিও অনুসন্ধানে বিবেচনায় নিতে হবে।

বিদেশে সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় নিয়েও গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য এসেছে বলে সূত্রের দাবি। তবে সন্তান বিদেশে পড়াশোনা করছেন—এ তথ্য নিজে কোনো অবৈধ সম্পদের প্রমাণ নয়। তদন্তে দেখতে হবে, শিক্ষাব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে এসেছে, পরিবারের বৈধ আয় দিয়ে সেই ব্যয় বহন করা সম্ভব কি না এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে কোনো অনিয়মের যোগসূত্র রয়েছে কি না।

তালিকা নয়, প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা

পুলিশের একটি অংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিন্তু বিচ্ছিন্ন অভিযোগ, গোয়েন্দা তথ্য কিংবা কোনো তালিকায় নাম থাকার ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। একইভাবে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হওয়ায় অভিযোগের অনুসন্ধান থেমে থাকাও গ্রহণযোগ্য নয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়, ব্যাংক ও ভূমি নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি যাচাই, বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য সংগ্রহ এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিধান কার্যকর করা এবং নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহির জন্য নয়, পুরো বাহিনীর পেশাগত মর্যাদা ও জনআস্থা পুনর্গঠনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত এই অনুসন্ধানের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে—কতজনের নাম তালিকায় রয়েছে তার ওপর নয়, বরং অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ পাওয়া গেল এবং সেই প্রমাণের ভিত্তিতে আইন কতটা সমানভাবে প্রয়োগ করা হলো, তার ওপর।