ঢাকা ০৯:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
হোটেলকক্ষে ১৯ ইয়াবা, গ্রেপ্তার দুই পুলিশ কারাগারে ইংরেজি-গণিত পড়ান বিষয়বহির্ভূত শিক্ষক, প্রশিক্ষণ নেই ৪০ শতাংশের রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে ‘টোপ’ বাংলাদেশিরা, প্রাণ গেছে ২০ জনের দেবীর আরাধনায় মুখর মণ্ডপ, আজ মহাসপ্তমীর পূজা মায়ের সঙ্গে অভিমান করে প্রাণ গেল অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীর ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য নয়, সবার অধিকার সমান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মৃত্যুদণ্ডের আগে ঢাকাকে জানায়নি সৌদি আরব, জবাব চেয়ে চিঠি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার সব ধর্মের মূল শিক্ষা: প্রধানমন্ত্রী সীমান্তের ১৩ পূজামণ্ডপে বিজিবির কড়া নিরাপত্তা, প্রস্তুত আরও দুই প্লাটুন রাস্তায় মাদকাসক্ত অবস্থায় ‘রাজকুমারী’, ৩ মাসের রিহ্যাব ও জরিমানা

ইংরেজি-গণিত পড়ান বিষয়বহির্ভূত শিক্ষক, প্রশিক্ষণ নেই ৪০ শতাংশের

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:৫০:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি ও গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পাঠদান করছেন এমন ২০ হাজারের বেশি শিক্ষক, যাঁদের স্নাতক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয় পড়ার অভিজ্ঞতা নেই। এর পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের নেই পেশাগত প্রশিক্ষণ। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট ও প্রশিক্ষণের ঘাটতিতে শিক্ষার্থীদের শিখনমান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান–২০২৫’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাধ্যমিকে ইংরেজি পড়ানো ৯ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয় ছিল না। একইভাবে গণিত পড়ানো ১০ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে গণিত ছিল না। অর্থাৎ, দুই বিষয়ে মোট ২০ হাজার ১৫১ জন শিক্ষক স্নাতকে সংশ্লিষ্ট বিষয় না পড়েও শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন।

শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মতে, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের ঘাটতি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মানকে প্রভাবিত করছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখনঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অনেককে পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য বিদ্যালয়ের বাইরে কোচিং ও ব্যক্তিগত শিক্ষকের পেছনে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

ইংরেজি-গণিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করেন ৬৪ হাজার ২৫৩ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ৯ হাজার ৯৮২ জন স্নাতক পাস করলেও স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি পড়েননি। এ ছাড়া এইচএসসি পাস ৪ হাজার ২১২ জন শিক্ষকও ইংরেজি পড়াচ্ছেন। বাকি প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষকের ইংরেজিসহ স্নাতক, স্নাতক (সম্মান) বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে।

গণিতের চিত্রও প্রায় একই। এ বিষয়ে পাঠদান করেন ৬৭ হাজার ৬৯৭ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জন স্নাতক (পাস) হলেও তাঁদের স্নাতক পর্যায়ে গণিত বিষয় ছিল না। প্রায় ২৯ হাজার শিক্ষক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গণিত পড়েছেন। অন্যদের মধ্যে এমন শিক্ষকও রয়েছেন, যাঁদের উচ্চমাধ্যমিক বা ডিগ্রি পর্যায়ে গণিত পড়ার অভিজ্ঞতা নেই।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে সাধারণত কমপক্ষে স্নাতক পাস হতে হয়। তবে ব্যানবেইসের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ে নিজেদের মতো করে অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক পাস শিক্ষকও রয়েছেন।

প্রশিক্ষণ নেই প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের

শুধু বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা নয়, শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণেও বড় ঘাটতি রয়েছে। ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ১৬ হাজার ৭৩৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৭ জন। তাঁদের প্রায় ৬৫ শতাংশ বিএড, এমএড ও বিপিএডের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বাকি প্রায় ৩৫ শতাংশ শিক্ষকের এ ধরনের প্রশিক্ষণ নেই।

নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা ২ হাজার ৪৭৪টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ২৫ হাজারের বেশি। তাঁদের মধ্যে পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাত্র ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ।

অন্যদিকে, মাধ্যমিক স্তর রয়েছে এমন ১ হাজার ৫৫৬টি স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক আছেন ৩৫ হাজারের বেশি। তাঁদের প্রায় ৫১ শতাংশ পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

সব মিলিয়ে মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ রয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষক এ প্রশিক্ষণের বাইরে। অথচ সারা দেশে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী রয়েছে ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি।

শিক্ষকসংকটে ব্যাহত পাঠদান

বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকটের প্রভাব দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। প্রায় ১৯০ বছরের পুরোনো ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে দুই পালায় পাঠদান হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে ইংরেজির শিক্ষক থাকার কথা আটজন, কর্মরত আছেন চারজন। গণিতের ছয়টি পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন চারজন।

ঢাকার বাইরের চিত্রও ভিন্ন নয়। সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ৪৮৬ জন ছাত্রী পড়াশোনা করলেও শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুজন। তাঁরা হলেন সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক এবং ইসলাম শিক্ষার সহকারী শিক্ষক জুলহাস সুজন।

এ পরিস্থিতিতে ছাত্রীদের পাঠদান সচল রাখতে অস্থায়ীভাবে ছয়জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন বলে জানান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক।


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় অনেক শিক্ষককে নিজের বিষয়ের বাইরে অন্য বিষয়েও ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে পাঠ্যসূচি অনুযায়ী যথাযথ পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মৌলিক ধারণা দুর্বল থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এসএসসির ফলেও ইংরেজি-গণিতে দুর্বলতা

শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলও ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগের বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৯ হাজার।

কুমিল্লা ছাড়া আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে ছিল। কয়েকটি বোর্ডে গণিতেও ফল তুলনামূলক খারাপ হয়েছে।

ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ। সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ, গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ। এমনকি পাসের হারে শীর্ষে থাকা ঢাকা বোর্ডেও ইংরেজিতে পাসের হার ছিল ৭৮ শতাংশের কিছু বেশি, যা গত বছর ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ।

ইংরেজি ও গণিত—দুটিই বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়ায় এসব বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ফলাফলে। মাধ্যমিক পর্যায়ে এই দুই বিষয়ে দুর্বল ভিত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পরও অনেক শিক্ষার্থীকে ইংরেজিতে সাধারণ যোগাযোগ করতে সমস্যায় পড়তে হয়।

শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে উদ্যোগের কথা

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে শুধু পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের ঘাটতি নয়, সার্বিকভাবেই শিক্ষকসংকট রয়েছে। দ্রুত কীভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে ‘খান একাডেমি বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে শিক্ষা বিষয়ে ডিগ্রিধারীরা যাতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন, সে ব্যবস্থার পরিকল্পনাও রয়েছে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের আগেই পেশাগত প্রশিক্ষণ ও সনদের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

তাঁর মতে, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু করা যথেষ্ট নয়; কার্যকরভাবে পড়ানোর দক্ষতা অর্জনে পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিতে হবে।

শিক্ষাবিদদের মতে, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা নিশ্চিত করা, শিক্ষকসংকট দূর করা এবং নিয়োগের আগে পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা—এই তিনটি ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মাধ্যমিক শিক্ষার শিখনঘাটতি কাটানো কঠিন হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ইংরেজি-গণিত পড়ান বিষয়বহির্ভূত শিক্ষক, প্রশিক্ষণ নেই ৪০ শতাংশের

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:৫০:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি ও গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পাঠদান করছেন এমন ২০ হাজারের বেশি শিক্ষক, যাঁদের স্নাতক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয় পড়ার অভিজ্ঞতা নেই। এর পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের নেই পেশাগত প্রশিক্ষণ। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট ও প্রশিক্ষণের ঘাটতিতে শিক্ষার্থীদের শিখনমান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান–২০২৫’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাধ্যমিকে ইংরেজি পড়ানো ৯ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয় ছিল না। একইভাবে গণিত পড়ানো ১০ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে গণিত ছিল না। অর্থাৎ, দুই বিষয়ে মোট ২০ হাজার ১৫১ জন শিক্ষক স্নাতকে সংশ্লিষ্ট বিষয় না পড়েও শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন।

শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মতে, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের ঘাটতি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মানকে প্রভাবিত করছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখনঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অনেককে পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য বিদ্যালয়ের বাইরে কোচিং ও ব্যক্তিগত শিক্ষকের পেছনে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

ইংরেজি-গণিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করেন ৬৪ হাজার ২৫৩ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ৯ হাজার ৯৮২ জন স্নাতক পাস করলেও স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি পড়েননি। এ ছাড়া এইচএসসি পাস ৪ হাজার ২১২ জন শিক্ষকও ইংরেজি পড়াচ্ছেন। বাকি প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষকের ইংরেজিসহ স্নাতক, স্নাতক (সম্মান) বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে।

গণিতের চিত্রও প্রায় একই। এ বিষয়ে পাঠদান করেন ৬৭ হাজার ৬৯৭ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জন স্নাতক (পাস) হলেও তাঁদের স্নাতক পর্যায়ে গণিত বিষয় ছিল না। প্রায় ২৯ হাজার শিক্ষক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গণিত পড়েছেন। অন্যদের মধ্যে এমন শিক্ষকও রয়েছেন, যাঁদের উচ্চমাধ্যমিক বা ডিগ্রি পর্যায়ে গণিত পড়ার অভিজ্ঞতা নেই।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে সাধারণত কমপক্ষে স্নাতক পাস হতে হয়। তবে ব্যানবেইসের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ে নিজেদের মতো করে অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক পাস শিক্ষকও রয়েছেন।

প্রশিক্ষণ নেই প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের

শুধু বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা নয়, শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণেও বড় ঘাটতি রয়েছে। ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ১৬ হাজার ৭৩৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৭ জন। তাঁদের প্রায় ৬৫ শতাংশ বিএড, এমএড ও বিপিএডের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বাকি প্রায় ৩৫ শতাংশ শিক্ষকের এ ধরনের প্রশিক্ষণ নেই।

নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা ২ হাজার ৪৭৪টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ২৫ হাজারের বেশি। তাঁদের মধ্যে পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাত্র ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ।

অন্যদিকে, মাধ্যমিক স্তর রয়েছে এমন ১ হাজার ৫৫৬টি স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক আছেন ৩৫ হাজারের বেশি। তাঁদের প্রায় ৫১ শতাংশ পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

সব মিলিয়ে মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ রয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষক এ প্রশিক্ষণের বাইরে। অথচ সারা দেশে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী রয়েছে ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি।

শিক্ষকসংকটে ব্যাহত পাঠদান

বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকটের প্রভাব দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। প্রায় ১৯০ বছরের পুরোনো ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে দুই পালায় পাঠদান হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে ইংরেজির শিক্ষক থাকার কথা আটজন, কর্মরত আছেন চারজন। গণিতের ছয়টি পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন চারজন।

ঢাকার বাইরের চিত্রও ভিন্ন নয়। সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ৪৮৬ জন ছাত্রী পড়াশোনা করলেও শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুজন। তাঁরা হলেন সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক এবং ইসলাম শিক্ষার সহকারী শিক্ষক জুলহাস সুজন।

এ পরিস্থিতিতে ছাত্রীদের পাঠদান সচল রাখতে অস্থায়ীভাবে ছয়জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন বলে জানান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক।


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় অনেক শিক্ষককে নিজের বিষয়ের বাইরে অন্য বিষয়েও ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে পাঠ্যসূচি অনুযায়ী যথাযথ পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মৌলিক ধারণা দুর্বল থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এসএসসির ফলেও ইংরেজি-গণিতে দুর্বলতা

শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলও ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগের বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৯ হাজার।

কুমিল্লা ছাড়া আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে ছিল। কয়েকটি বোর্ডে গণিতেও ফল তুলনামূলক খারাপ হয়েছে।

ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ। সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ, গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ। এমনকি পাসের হারে শীর্ষে থাকা ঢাকা বোর্ডেও ইংরেজিতে পাসের হার ছিল ৭৮ শতাংশের কিছু বেশি, যা গত বছর ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ।

ইংরেজি ও গণিত—দুটিই বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়ায় এসব বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ফলাফলে। মাধ্যমিক পর্যায়ে এই দুই বিষয়ে দুর্বল ভিত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পরও অনেক শিক্ষার্থীকে ইংরেজিতে সাধারণ যোগাযোগ করতে সমস্যায় পড়তে হয়।

শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে উদ্যোগের কথা

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে শুধু পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের ঘাটতি নয়, সার্বিকভাবেই শিক্ষকসংকট রয়েছে। দ্রুত কীভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে ‘খান একাডেমি বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে শিক্ষা বিষয়ে ডিগ্রিধারীরা যাতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন, সে ব্যবস্থার পরিকল্পনাও রয়েছে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের আগেই পেশাগত প্রশিক্ষণ ও সনদের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

তাঁর মতে, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু করা যথেষ্ট নয়; কার্যকরভাবে পড়ানোর দক্ষতা অর্জনে পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিতে হবে।

শিক্ষাবিদদের মতে, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা নিশ্চিত করা, শিক্ষকসংকট দূর করা এবং নিয়োগের আগে পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা—এই তিনটি ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মাধ্যমিক শিক্ষার শিখনঘাটতি কাটানো কঠিন হবে।