ঢাকা ০৮:৫১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ইংরেজি-গণিত পড়ান বিষয়বহির্ভূত শিক্ষক, প্রশিক্ষণ নেই ৪০ শতাংশের রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে ‘টোপ’ বাংলাদেশিরা, প্রাণ গেছে ২০ জনের দেবীর আরাধনায় মুখর মণ্ডপ, আজ মহাসপ্তমীর পূজা মায়ের সঙ্গে অভিমান করে প্রাণ গেল অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীর ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য নয়, সবার অধিকার সমান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মৃত্যুদণ্ডের আগে ঢাকাকে জানায়নি সৌদি আরব, জবাব চেয়ে চিঠি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার সব ধর্মের মূল শিক্ষা: প্রধানমন্ত্রী সীমান্তের ১৩ পূজামণ্ডপে বিজিবির কড়া নিরাপত্তা, প্রস্তুত আরও দুই প্লাটুন রাস্তায় মাদকাসক্ত অবস্থায় ‘রাজকুমারী’, ৩ মাসের রিহ্যাব ও জরিমানা শিক্ষাকে বাণিজ্যে পরিণত করেছিল ফ্যাসিস্ট সরকার’: প্রতিমন্ত্রী টুকু

রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে ‘টোপ’ বাংলাদেশিরা, প্রাণ গেছে ২০ জনের

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:৪৫:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে তরুণদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তাঁদের রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। এরপর সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো হচ্ছে ইউক্রেনের সম্মুখসারির যুদ্ধে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত বলছে, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে এসব বাংলাদেশিকে একধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। এভাবে যুদ্ধে পাঠানো ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে পুলিশের বিশেষ ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

ভুক্তভোগীদের একজন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ২১ বছর বয়সী রাজন হোসেন। তাঁর ভাষ্য, নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলে গত মে মাসে তাঁকে রাশিয়ায় পাঠায় জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সি। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁর পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর বাধ্য করা হয় রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে।

রাজন জানান, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তাঁকে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নেওয়া হয়। সেখানে তিন সপ্তাহ অস্ত্র চালানোসহ যুদ্ধের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর তাঁকে পাঠানো হয় ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে।

রাজনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে আরও ২৯ বাংলাদেশিকে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল। প্রথম দিনই ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় তাঁদের ১৭ জনের মৃত্যু হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও তিনজন মারা যান। সব মিলিয়ে তাঁদের দলের ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

ড্রোন হামলায় আহত হয়ে চার দিনে ফিরলেন ক্যাম্পে

সম্মুখসারিতে পাঠানোর দুই দিনের মাথায় ড্রোন হামলার শিকার হন রাজন। এতে তাঁর কোমর ও পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর দাবি, আঘাতের পর কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে গিয়েছিল। তখন সঙ্গে থাকা ওয়াকিটকির মাধ্যমে রুশ সেনাদের কাছে সাহায্য চান তিনি। কিন্তু কেউ তাঁকে উদ্ধারে আসেনি।

কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর একপর্যায়ে হাত ও বুকের ওপর ভর দিয়ে অবশ দুই পা টেনে সামনে এগোতে থাকেন রাজন। এভাবে প্রায় চার দিনে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রুশ সেনা ক্যাম্পে পৌঁছান তিনি।

রাজন বলেন, ওই চার দিন তিনি কিছুই খেতে পারেননি। এমনকি এক ফোঁটা পানিও পাননি।

চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার পর দেশে ফিরে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেন রাজন ও তাঁর পরিবার। সেই অভিযোগের তদন্তে নামে এসআরবি।

তিন এজেন্সির মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশিকে পাঠানোর অভিযোগ

তদন্ত করতে গিয়ে জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের পাশাপাশি আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের আরও দুটি এজেন্সির সন্ধান পেয়েছে এসআরবি। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব এজেন্সি বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কয়েক মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ৩০ জনকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছে।


এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।

তদন্তকারীরা বলছেন, বাংলাদেশি এই চক্রের সঙ্গে দুজন বিদেশি নাগরিকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের একজন রাশিয়ার নাগরিক ইগর এবং অন্যজন কিরগিজস্তানের নাগরিক জুলিয়া বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের ভাষ্য, ইগরের প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলেই মূলত বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। এ কাজে জুলিয়া সহযোগিতা করেছেন বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

বিদেশি দুই নাগরিককে এখনো আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ। তবে বাংলাদেশি এজেন্সিগুলোর মূল সমন্বয়কারী হিসেবে অভিযুক্ত জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তে ‘টোপ’ ব্যবহারের অভিযোগ

এসআরবির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের তিনটি দলে ভাগ করে মোতায়েন করা হয়েছিল। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁদের ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁদের ওপর ড্রোন হামলা হলে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়। পরে সেই অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশিদের একধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

তবে এটি পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনার ভিত্তিতে করা ধারণা। যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের ব্যবহারের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

স্বপ্ন ছিল উন্নত জীবনের, ফিরছে মৃত্যুসংবাদ

ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে যুদ্ধে গিয়ে নিহত বাংলাদেশিরা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান বলে জানা যাচ্ছে। তাঁদের অনেকেই পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কেউ জমি বা গবাদিপশু বিক্রি করেছেন, কেউ জমি বন্ধক রেখেছেন, আবার কেউ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন।

লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুনের পরিবারও তেমনই একটি পরিবার। ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য গরু-ছাগল বিক্রি, জমি বন্ধক এবং ঋণ—সবই করেছিলেন তাঁর বাবা আব্দুল মাজিদ।

আব্দুল মাজিদ বলেন, তাঁর আশা ছিল ছেলে কাজ করে টাকা পাঠাবে। সেই টাকা দিয়ে জমির বন্ধক ছাড়াবেন, ঋণ পরিশোধ করবেন এবং আবার গরু-ছাগল কিনবেন। কিন্তু ছেলেকে যুদ্ধে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনাই তাঁর একমাত্র চাওয়া।

পরিবারের খোঁজ, মরদেহ ফেরানোর অপেক্ষা

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে গত এক বছরে তিন ডজনের বেশি আবেদন পেয়েছে সরকার।

এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রুশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছয় বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্যদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে এবং নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছিলেন কর্মকর্তারা।

তবে এখনো ওই ছয়জনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

চাকরির আশায় বিদেশে যাওয়া তরুণদের যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারগুলোর সামনে এখন বড় অনিশ্চয়তা—নিখোঁজ স্বজনের খোঁজ পাওয়া যাবে কি না, আর নিহতদের মরদেহ আদৌ দেশে ফিরবে কি না। পুলিশের তদন্তে মানব পাচার, প্রতারণা ও বিদেশি চক্রের সংশ্লিষ্টতার যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা কত দূর এগোয়, এখন সেদিকেই নজর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে ‘টোপ’ বাংলাদেশিরা, প্রাণ গেছে ২০ জনের

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:৪৫:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে তরুণদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তাঁদের রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। এরপর সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো হচ্ছে ইউক্রেনের সম্মুখসারির যুদ্ধে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত বলছে, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে এসব বাংলাদেশিকে একধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। এভাবে যুদ্ধে পাঠানো ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে পুলিশের বিশেষ ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

ভুক্তভোগীদের একজন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ২১ বছর বয়সী রাজন হোসেন। তাঁর ভাষ্য, নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির কথা বলে গত মে মাসে তাঁকে রাশিয়ায় পাঠায় জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সি। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁর পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর বাধ্য করা হয় রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে।

রাজন জানান, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তাঁকে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নেওয়া হয়। সেখানে তিন সপ্তাহ অস্ত্র চালানোসহ যুদ্ধের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর তাঁকে পাঠানো হয় ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে।

রাজনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে আরও ২৯ বাংলাদেশিকে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল। প্রথম দিনই ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় তাঁদের ১৭ জনের মৃত্যু হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও তিনজন মারা যান। সব মিলিয়ে তাঁদের দলের ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

ড্রোন হামলায় আহত হয়ে চার দিনে ফিরলেন ক্যাম্পে

সম্মুখসারিতে পাঠানোর দুই দিনের মাথায় ড্রোন হামলার শিকার হন রাজন। এতে তাঁর কোমর ও পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর দাবি, আঘাতের পর কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে গিয়েছিল। তখন সঙ্গে থাকা ওয়াকিটকির মাধ্যমে রুশ সেনাদের কাছে সাহায্য চান তিনি। কিন্তু কেউ তাঁকে উদ্ধারে আসেনি।

কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর একপর্যায়ে হাত ও বুকের ওপর ভর দিয়ে অবশ দুই পা টেনে সামনে এগোতে থাকেন রাজন। এভাবে প্রায় চার দিনে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রুশ সেনা ক্যাম্পে পৌঁছান তিনি।

রাজন বলেন, ওই চার দিন তিনি কিছুই খেতে পারেননি। এমনকি এক ফোঁটা পানিও পাননি।

চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার পর দেশে ফিরে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করেন রাজন ও তাঁর পরিবার। সেই অভিযোগের তদন্তে নামে এসআরবি।

তিন এজেন্সির মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশিকে পাঠানোর অভিযোগ

তদন্ত করতে গিয়ে জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের পাশাপাশি আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের আরও দুটি এজেন্সির সন্ধান পেয়েছে এসআরবি। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব এজেন্সি বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কয়েক মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ৩০ জনকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছে।


এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।

তদন্তকারীরা বলছেন, বাংলাদেশি এই চক্রের সঙ্গে দুজন বিদেশি নাগরিকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের একজন রাশিয়ার নাগরিক ইগর এবং অন্যজন কিরগিজস্তানের নাগরিক জুলিয়া বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের ভাষ্য, ইগরের প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলেই মূলত বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। এ কাজে জুলিয়া সহযোগিতা করেছেন বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

বিদেশি দুই নাগরিককে এখনো আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ। তবে বাংলাদেশি এজেন্সিগুলোর মূল সমন্বয়কারী হিসেবে অভিযুক্ত জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তে ‘টোপ’ ব্যবহারের অভিযোগ

এসআরবির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের তিনটি দলে ভাগ করে মোতায়েন করা হয়েছিল। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁদের ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁদের ওপর ড্রোন হামলা হলে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়। পরে সেই অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে। এ কারণে বাংলাদেশিদের একধরনের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

তবে এটি পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনার ভিত্তিতে করা ধারণা। যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের ব্যবহারের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

স্বপ্ন ছিল উন্নত জীবনের, ফিরছে মৃত্যুসংবাদ

ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে যুদ্ধে গিয়ে নিহত বাংলাদেশিরা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান বলে জানা যাচ্ছে। তাঁদের অনেকেই পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কেউ জমি বা গবাদিপশু বিক্রি করেছেন, কেউ জমি বন্ধক রেখেছেন, আবার কেউ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন।

লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মামুনের পরিবারও তেমনই একটি পরিবার। ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য গরু-ছাগল বিক্রি, জমি বন্ধক এবং ঋণ—সবই করেছিলেন তাঁর বাবা আব্দুল মাজিদ।

আব্দুল মাজিদ বলেন, তাঁর আশা ছিল ছেলে কাজ করে টাকা পাঠাবে। সেই টাকা দিয়ে জমির বন্ধক ছাড়াবেন, ঋণ পরিশোধ করবেন এবং আবার গরু-ছাগল কিনবেন। কিন্তু ছেলেকে যুদ্ধে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনাই তাঁর একমাত্র চাওয়া।

পরিবারের খোঁজ, মরদেহ ফেরানোর অপেক্ষা

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে গত এক বছরে তিন ডজনের বেশি আবেদন পেয়েছে সরকার।

এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রুশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছয় বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্যদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে এবং নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছিলেন কর্মকর্তারা।

তবে এখনো ওই ছয়জনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

চাকরির আশায় বিদেশে যাওয়া তরুণদের যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারগুলোর সামনে এখন বড় অনিশ্চয়তা—নিখোঁজ স্বজনের খোঁজ পাওয়া যাবে কি না, আর নিহতদের মরদেহ আদৌ দেশে ফিরবে কি না। পুলিশের তদন্তে মানব পাচার, প্রতারণা ও বিদেশি চক্রের সংশ্লিষ্টতার যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা কত দূর এগোয়, এখন সেদিকেই নজর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর।