প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন
বেড়ানোর কথা বলে নৌকায় স্ত্রীকে হত্যা, খালে বস্তাবন্দি মরদেহ

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৪৭:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন রাজা মিয়া ওরফে রাজু। বিষয়টি জানার পর স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে বিরোধ শুরু হয় তাঁর। সেই বিরোধের জেরেই স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে। বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে জান্নাতুলকে নৌকায় তুলে কর্ণফুলী নদী পেরিয়ে শিকলবাহা খালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যার পর হাত-পা বেঁধে বস্তায় ভরে মরদেহ ফেলে দেওয়া হয় খালে।
গত ১৫ অক্টোবর চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে জান্নাতুল ফেরদৌস হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানিয়ে এসব তথ্য প্রকাশ করে পিবিআই। এ ঘটনায় রাজা মিয়ার সহযোগী হিসেবে অভিযোগ ওঠা দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত রাজা মিয়া এখনো পলাতক।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন মো. মুসলিম উদ্দিন (৩৯) ও শুজুর আহম্মদ (২৪)। পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের একজন মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্তের অংশ হিসেবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটিও জব্দ করা হয়েছে।
বিয়ের তথ্য গোপন, সেখান থেকেই বিরোধ
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, জান্নাতুল ফেরদৌস চট্টগ্রাম নগরের ম্যাপ সুজ লিমিটেড নামের একটি জুতার কারখানায় কাজ করতেন। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে নগরের চান্দগাঁও থানার বাহির সিগন্যাল এলাকার ব্যাপারীপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।
গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন জান্নাতুল। বিয়ের সময় রাজা নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। পরে তাঁর প্রথম বিয়ের বিষয়টি জানতে পারেন জান্নাতুল। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। পিবিআইয়ের দাবি, সেই বিরোধের জের ধরে জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন রাজা।
তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ে ব্রিজঘাটা এলাকায় নিয়ে যান রাজা। পরে তাঁকে সহযোগীদের সঙ্গে একটি সাম্পান নৌকায় তোলা হয়। নৌকাটি শিকলবাহা খালের দিকে যায়।
নৌকার ভেতর হত্যা, বস্তায় ভরে খালে ফেলে দেওয়া
পিবিআইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, রাত ৮টার পর নৌকার ভেতরে জান্নাতুলের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তাঁর মুঠোফোন খালে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে জানা গেছে।
হত্যার পর জান্নাতুলের হাত-পা বেঁধে মরদেহ বস্তাবন্দি করা হয়। পরে কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনে শিকলবাহা খালে মরদেহটি ফেলে দেওয়া হয় বলে পিবিআই জানিয়েছে।
গত ২ আগস্ট শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন খাল থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি জান্নাতুল ফেরদৌসের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় তাঁর মা ছায়রা খাতুন কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গ্রেপ্তার
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এমকেএইচ জাহাংগীর হোসেন জানান, গত ৬ অক্টোবর মামলাটির তদন্তভার গ্রহণের পর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় টেকনাফ থেকে মুসলিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুজুর আহম্মদকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে সন্দেহ করা সাম্পান নৌকাটি জব্দ করা হয়।
পিবিআই জানায়, গ্রেপ্তার মুসলিম উদ্দিন ১৪ অক্টোবর আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যে মুসলিম উদ্দিনকে রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুক্কুর আহমেদের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মামলার প্রধান অভিযুক্ত রাজা মিয়াকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাঁর অবস্থান, হত্যার পরিকল্পনায় অন্য কারও ভূমিকা ছিল কি না এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী—এসব বিষয়ে তদন্তের আরও অগ্রগতি প্রয়োজন।
হত্যার পেছনে সম্পর্কের বিরোধ, তদন্তে আরও যেসব প্রশ্ন
পিবিআইয়ের প্রাথমিক তদন্তে প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করা নিয়ে দাম্পত্য বিরোধকে হত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং স্বীকারোক্তির বিষয়গুলো আদালতে যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যাবে।
এ ঘটনায় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: হত্যার পরিকল্পনা কখন ও কীভাবে করা হয়েছিল, নৌকায় কারা উপস্থিত ছিলেন, মরদেহ সরিয়ে ফেলার কাজে কার কী ভূমিকা ছিল এবং প্রধান অভিযুক্ত রাজা মিয়াকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে। এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনাক্রম আরও স্পষ্ট হবে।
বেড়ানোর কথা বলে স্ত্রীকে নৌকায় তুলে নিয়ে হত্যার অভিযোগ এবং পরে মরদেহ গোপন করার ঘটনাটি দাম্পত্য বিরোধের সহিংস পরিণতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন তদন্তের পাশাপাশি প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার এবং মামলার প্রমাণগুলো যথাযথভাবে আদালতে উপস্থাপন করাই গুরুত্বপূর্ণ।





















