ঢাকা ০৯:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
জরিমানা ছাড়াই ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ভ্যাট রিটার্ন জমার সুযোগ টিকটকের রঙিন দুনিয়ার মোহ, স্বাধীন জীবনের স্বপ্নে ঘর ছাড়ে ৪ স্কুলছাত্রী দুর্গাপূজায় ২০ অক্টোবর চট্টগ্রাম যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্গাপূজায় প্রথমবার বিশেষ বাস সার্ভিস চালু করছে বিআরটিসি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন স্থগিত টাঙ্গাইলে রেমিট্যান্স মেলায় গুরুত্ব পেল প্রবাসী আয়ের সঠিক ব্যবহার সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁস, গ্রেপ্তার ৫ চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডিবির অভিযানে হেরোইনসহ যুবক গ্রেপ্তার ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের ফ্লাইট স্থগিত সরকারি কেনাকাটা ও দরপত্র স্থগিত করল স্থানীয় সরকার বিভাগ

টিকটকের রঙিন দুনিয়ার মোহ, স্বাধীন জীবনের স্বপ্নে ঘর ছাড়ে ৪ স্কুলছাত্রী

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:৩৫:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বয়স মাত্র ৮ থেকে ১২ বছর। যে বয়সে বই-খাতা, স্কুলের ক্লাস আর খেলার মাঠে কাটার কথা সময়, সেই বয়সেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাল্পনিক জীবনযাপনের আকর্ষণে বাড়ি ছাড়ল কুমিল্লার চার স্কুলছাত্রী। স্বাধীনভাবে বাঁচা আর নিজের মতো করে উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিল তারা। দুই দিন পর হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থেকে তাদের উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি শিশুদের মোবাইল ব্যবহার, অনলাইন পরিচয় ও পারিবারিক নজরদারি নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।

সকালে স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল চার শিশু। প্রতিদিনের মতো বই-খাতা নিয়ে স্কুলে পৌঁছানোর কথা ছিল তাদের। কিন্তু সেদিন আর শ্রেণিকক্ষে বসা হয়নি। স্কুলেও যায়নি তারা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও যখন বাড়ি ফেরেনি, তখনই শুরু হয় পরিবারের উদ্বেগ। স্কুল কর্তৃপক্ষ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, চার শিক্ষার্থীর কেউই সেদিন ক্লাসে উপস্থিত হয়নি।

এরপর উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। কোথায় গেল শিশুরা? কার সঙ্গে আছে তারা? নিরাপদে আছে তো? এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেন অভিভাবক ও শিক্ষকরা। খবর পেয়ে অনুসন্ধানে নামে পুলিশ। অবশেষে দুই দিন ধরে চলা উদ্বেগের অবসান ঘটে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে চার শিক্ষার্থীকে উদ্ধারের মধ্য দিয়ে।
কিন্তু তাদের বাড়ি ছাড়ার পেছনের যে কারণ উঠে এসেছে, তা আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দায় দেখা ঝলমলে জীবন কি শিশুদের বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

পর্দার জীবনকে বাস্তব ভেবে ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত

কুমিল্লা পুলিশ লাইন্স সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওই চার শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজন পঞ্চম শ্রেণির এবং একজন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তাদের বয়স ৮ থেকে ১২ বছরের মধ্যে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, পড়াশোনার প্রতি অনীহা এবং টিকটকে দেখা কাল্পনিক জীবনধারার প্রতি আকর্ষণ থেকে তারা বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। টিকটকে ভিডিও আপলোড করার পাশাপাশি অপরিচিত কয়েকজন তরুণের সঙ্গে তাদের পরিচয় ও সখ্য গড়ে উঠেছিল। তবে ওই তরুণদের প্রকৃত নাম-পরিচয় সম্পর্কে তারা নিশ্চিত ছিল না।

পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা জীবনযাপনের ধারণা তাদের প্রভাবিত করেছিল। নিজেদের মতো করে স্বাধীনভাবে বাঁচা ও উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে তারা বাড়ি ছাড়ে।

শিশুদের কাছে স্বাধীন জীবনের এই কল্পনা কতটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল, তা তাদের সিদ্ধান্ত থেকেই কিছুটা বোঝা যায়। তবে অনলাইন পরিচিতদের কেউ তাদের সরাসরি প্ররোচিত করেছিল কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নিশ্চিত তথ্য নেই।

মোবাইল বিক্রি করে ঢাকায়, পরে চুনারুঘাটে

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর সকালে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হয় চার শিক্ষার্থী। সঙ্গে নেয় ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালঙ্কার।

পরে কুমিল্লার টাউন হল সুপার মার্কেটে একটি মোবাইল ফোন চার হাজার টাকায় বিক্রি করে তারা। সেই টাকা নিয়ে প্রথমে ঢাকায় যায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পেরে ওই দিনই এক শিক্ষার্থীর দাদাবাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের উদ্দেশে রওনা দেয়।

এদিকে, স্কুলে অনুপস্থিতি ও বাড়ি না ফেরার বিষয়টি জানার পর শিক্ষার্থীদের খোঁজ শুরু হয়। স্বজনেরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পুলিশ বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং শিক্ষার্থীদের ছবি ও পরিচিতিসহ দেশের বিভিন্ন থানায় বার্তা পাঠায়।

জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও কোতোয়ালি থানা পুলিশ যৌথভাবে অনুসন্ধান চালায়। পরে ১২ অক্টোবর দিবাগত রাত ২টার দিকে চুনারুঘাট থানা পুলিশের সহায়তায় চার শিক্ষার্থীকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, বিক্রি করা মোবাইল ফোন ও তাদের সঙ্গে থাকা স্বর্ণালঙ্কারও উদ্ধার করা হয়েছে। পরে চার শিক্ষার্থীকে পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।


শিক্ষকদেরও ছিল না এমন ঘটনার ধারণা

শিক্ষার্থীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পুলিশ লাইন্স সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাসিমা বিশ্বাস। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীরা এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা তাঁদের ধারণার বাইরে ছিল।

তিনি জানান, শিক্ষার্থীরা বাড়ি না ফেরার খবর পাওয়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রথমে যাচাই করে দেখে, তারা বিদ্যালয়ে এসেছিল কি না। উপস্থিত না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই পুলিশ সুপারকে জানানো হয়। এরপর পুলিশ অনুসন্ধানের দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করে।

প্রধান শিক্ষিকা আরও জানান, নিখোঁজ চার শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজন পঞ্চম শ্রেণির ও একজন তৃতীয় শ্রেণির। তাঁদের রোল নম্বরও তালিকার পেছনের দিকে ছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পারিবারিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছে।

তবে শিশুরা কীভাবে নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করছিল, সে বিষয়ে বিদ্যালয়ের কাছে আগে থেকে বিস্তারিত তথ্য ছিল না বলে জানান তিনি। এ ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের বিষয়ে আরও সচেতন হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

শিশুদের হাতে স্মার্টফোন, নজরদারিতে কতটা ঘাটতি?

চার শিশুর বাড়ি ছাড়ার ঘটনা কেবল একটি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর অন্তর্নিহিত প্রশ্নগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে। এখানে রয়েছে শিশুদের অনলাইন অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা, পড়াশোনায় আগ্রহ এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের বিষয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ নিজের জীবনের বাছাই করা অংশ তুলে ধরে। ভিডিওতে দেখা স্বাধীনতা, অর্থ উপার্জন কিংবা আকর্ষণীয় জীবনযাপন শিশুদের কাছে বাস্তবের চেয়ে সহজ ও লোভনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু পর্দার সেই উপস্থাপনার আড়ালে থাকা ঝুঁকি, দায়িত্ব ও বাস্তব সীমাবদ্ধতা বোঝার মতো অভিজ্ঞতা তাদের অনেকেরই থাকে না।

বিশেষ করে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। পরিচিত মনে হওয়া কোনো অ্যাকাউন্টের পেছনে কে রয়েছে, তার উদ্দেশ্য কী, কিংবা দেওয়া তথ্য কতটা সত্য—এসব যাচাই করা শিশুদের পক্ষে কঠিন হতে পারে।

তবে এই ঘটনায় শুধু মোবাইল ফোন ব্যবহারকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। শিশুদের পড়াশোনায় অনীহা, অনলাইনে স্বাধীন জীবনের প্রতি আকর্ষণ এবং পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের ধরন—সবকিছুই গুরুত্ব দিয়ে বোঝা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে শিশুদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বদলে তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা, অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা এবং আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া জরুরি।

ফিরে পাওয়া গেছে শিশুরা, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে

দুই দিন পর চার শিক্ষার্থীকে নিরাপদে উদ্ধার করা গেছে—এটাই পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি। সন্তানদের ফিরে পাওয়ার পর অভিভাবকদের উদ্বেগ কিছুটা কমলেও ঘটনাটি থেকে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলো সহজে শেষ হওয়ার নয়।

মাত্র ৮ থেকে ১২ বছর বয়সে চারটি শিশু কীভাবে বাড়ি ছেড়ে অন্য শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কতটা গভীর ছিল এবং তারা অনলাইন জগৎ থেকে স্বাধীন জীবন সম্পর্কে কী ধারণা পেয়েছিল—এসব বিষয় বোঝা প্রয়োজন।

শিশুদের দোষারোপ করে কিংবা তাদের কেবল অবাধ্য হিসেবে চিহ্নিত করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং তাদের সিদ্ধান্তের পেছনের ভাবনা বোঝা, নিরাপদ অনলাইন ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া এবং পরিবার-বিদ্যালয়ের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কুমিল্লার চার স্কুলছাত্রী শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরেছে। কিন্তু তাদের এই যাত্রা মনে করিয়ে দিয়েছে, শিশুদের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে গেলেই তারা ডিজিটাল জগতের ঝুঁকি বুঝতে শেখে না। সেই জগতে কী দেখা উচিত, কার সঙ্গে কথা বলা নিরাপদ এবং পর্দার জীবন আর বাস্তব জীবনের পার্থক্য কোথায়—এসব শেখানোর দায়িত্বও বড়দের।

কারণ, শিশুদের নিরাপত্তা শুধু তাদের ঘরের দরজা বন্ধ রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তারা যে ভার্চুয়াল জগতে প্রতিদিন প্রবেশ করছে, সেখানেও তাদের পাশে থাকা জরুরি।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

টিকটকের রঙিন দুনিয়ার মোহ, স্বাধীন জীবনের স্বপ্নে ঘর ছাড়ে ৪ স্কুলছাত্রী

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:৩৫:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

বয়স মাত্র ৮ থেকে ১২ বছর। যে বয়সে বই-খাতা, স্কুলের ক্লাস আর খেলার মাঠে কাটার কথা সময়, সেই বয়সেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাল্পনিক জীবনযাপনের আকর্ষণে বাড়ি ছাড়ল কুমিল্লার চার স্কুলছাত্রী। স্বাধীনভাবে বাঁচা আর নিজের মতো করে উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিল তারা। দুই দিন পর হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থেকে তাদের উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি শিশুদের মোবাইল ব্যবহার, অনলাইন পরিচয় ও পারিবারিক নজরদারি নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।

সকালে স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল চার শিশু। প্রতিদিনের মতো বই-খাতা নিয়ে স্কুলে পৌঁছানোর কথা ছিল তাদের। কিন্তু সেদিন আর শ্রেণিকক্ষে বসা হয়নি। স্কুলেও যায়নি তারা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও যখন বাড়ি ফেরেনি, তখনই শুরু হয় পরিবারের উদ্বেগ। স্কুল কর্তৃপক্ষ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, চার শিক্ষার্থীর কেউই সেদিন ক্লাসে উপস্থিত হয়নি।

এরপর উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। কোথায় গেল শিশুরা? কার সঙ্গে আছে তারা? নিরাপদে আছে তো? এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেন অভিভাবক ও শিক্ষকরা। খবর পেয়ে অনুসন্ধানে নামে পুলিশ। অবশেষে দুই দিন ধরে চলা উদ্বেগের অবসান ঘটে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে চার শিক্ষার্থীকে উদ্ধারের মধ্য দিয়ে।
কিন্তু তাদের বাড়ি ছাড়ার পেছনের যে কারণ উঠে এসেছে, তা আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দায় দেখা ঝলমলে জীবন কি শিশুদের বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

পর্দার জীবনকে বাস্তব ভেবে ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত

কুমিল্লা পুলিশ লাইন্স সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওই চার শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজন পঞ্চম শ্রেণির এবং একজন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তাদের বয়স ৮ থেকে ১২ বছরের মধ্যে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, পড়াশোনার প্রতি অনীহা এবং টিকটকে দেখা কাল্পনিক জীবনধারার প্রতি আকর্ষণ থেকে তারা বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। টিকটকে ভিডিও আপলোড করার পাশাপাশি অপরিচিত কয়েকজন তরুণের সঙ্গে তাদের পরিচয় ও সখ্য গড়ে উঠেছিল। তবে ওই তরুণদের প্রকৃত নাম-পরিচয় সম্পর্কে তারা নিশ্চিত ছিল না।

পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা জীবনযাপনের ধারণা তাদের প্রভাবিত করেছিল। নিজেদের মতো করে স্বাধীনভাবে বাঁচা ও উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে তারা বাড়ি ছাড়ে।

শিশুদের কাছে স্বাধীন জীবনের এই কল্পনা কতটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল, তা তাদের সিদ্ধান্ত থেকেই কিছুটা বোঝা যায়। তবে অনলাইন পরিচিতদের কেউ তাদের সরাসরি প্ররোচিত করেছিল কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নিশ্চিত তথ্য নেই।

মোবাইল বিক্রি করে ঢাকায়, পরে চুনারুঘাটে

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর সকালে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হয় চার শিক্ষার্থী। সঙ্গে নেয় ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালঙ্কার।

পরে কুমিল্লার টাউন হল সুপার মার্কেটে একটি মোবাইল ফোন চার হাজার টাকায় বিক্রি করে তারা। সেই টাকা নিয়ে প্রথমে ঢাকায় যায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পেরে ওই দিনই এক শিক্ষার্থীর দাদাবাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের উদ্দেশে রওনা দেয়।

এদিকে, স্কুলে অনুপস্থিতি ও বাড়ি না ফেরার বিষয়টি জানার পর শিক্ষার্থীদের খোঁজ শুরু হয়। স্বজনেরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পুলিশ বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং শিক্ষার্থীদের ছবি ও পরিচিতিসহ দেশের বিভিন্ন থানায় বার্তা পাঠায়।

জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও কোতোয়ালি থানা পুলিশ যৌথভাবে অনুসন্ধান চালায়। পরে ১২ অক্টোবর দিবাগত রাত ২টার দিকে চুনারুঘাট থানা পুলিশের সহায়তায় চার শিক্ষার্থীকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, বিক্রি করা মোবাইল ফোন ও তাদের সঙ্গে থাকা স্বর্ণালঙ্কারও উদ্ধার করা হয়েছে। পরে চার শিক্ষার্থীকে পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।


শিক্ষকদেরও ছিল না এমন ঘটনার ধারণা

শিক্ষার্থীদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পুলিশ লাইন্স সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাসিমা বিশ্বাস। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীরা এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা তাঁদের ধারণার বাইরে ছিল।

তিনি জানান, শিক্ষার্থীরা বাড়ি না ফেরার খবর পাওয়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রথমে যাচাই করে দেখে, তারা বিদ্যালয়ে এসেছিল কি না। উপস্থিত না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই পুলিশ সুপারকে জানানো হয়। এরপর পুলিশ অনুসন্ধানের দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করে।

প্রধান শিক্ষিকা আরও জানান, নিখোঁজ চার শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজন পঞ্চম শ্রেণির ও একজন তৃতীয় শ্রেণির। তাঁদের রোল নম্বরও তালিকার পেছনের দিকে ছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পারিবারিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছে।

তবে শিশুরা কীভাবে নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করছিল, সে বিষয়ে বিদ্যালয়ের কাছে আগে থেকে বিস্তারিত তথ্য ছিল না বলে জানান তিনি। এ ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের বিষয়ে আরও সচেতন হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

শিশুদের হাতে স্মার্টফোন, নজরদারিতে কতটা ঘাটতি?

চার শিশুর বাড়ি ছাড়ার ঘটনা কেবল একটি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর অন্তর্নিহিত প্রশ্নগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে। এখানে রয়েছে শিশুদের অনলাইন অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা, পড়াশোনায় আগ্রহ এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের বিষয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ নিজের জীবনের বাছাই করা অংশ তুলে ধরে। ভিডিওতে দেখা স্বাধীনতা, অর্থ উপার্জন কিংবা আকর্ষণীয় জীবনযাপন শিশুদের কাছে বাস্তবের চেয়ে সহজ ও লোভনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু পর্দার সেই উপস্থাপনার আড়ালে থাকা ঝুঁকি, দায়িত্ব ও বাস্তব সীমাবদ্ধতা বোঝার মতো অভিজ্ঞতা তাদের অনেকেরই থাকে না।

বিশেষ করে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। পরিচিত মনে হওয়া কোনো অ্যাকাউন্টের পেছনে কে রয়েছে, তার উদ্দেশ্য কী, কিংবা দেওয়া তথ্য কতটা সত্য—এসব যাচাই করা শিশুদের পক্ষে কঠিন হতে পারে।

তবে এই ঘটনায় শুধু মোবাইল ফোন ব্যবহারকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। শিশুদের পড়াশোনায় অনীহা, অনলাইনে স্বাধীন জীবনের প্রতি আকর্ষণ এবং পরিবারের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের ধরন—সবকিছুই গুরুত্ব দিয়ে বোঝা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে শিশুদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বদলে তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা, অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা এবং আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া জরুরি।

ফিরে পাওয়া গেছে শিশুরা, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে

দুই দিন পর চার শিক্ষার্থীকে নিরাপদে উদ্ধার করা গেছে—এটাই পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি। সন্তানদের ফিরে পাওয়ার পর অভিভাবকদের উদ্বেগ কিছুটা কমলেও ঘটনাটি থেকে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলো সহজে শেষ হওয়ার নয়।

মাত্র ৮ থেকে ১২ বছর বয়সে চারটি শিশু কীভাবে বাড়ি ছেড়ে অন্য শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কতটা গভীর ছিল এবং তারা অনলাইন জগৎ থেকে স্বাধীন জীবন সম্পর্কে কী ধারণা পেয়েছিল—এসব বিষয় বোঝা প্রয়োজন।

শিশুদের দোষারোপ করে কিংবা তাদের কেবল অবাধ্য হিসেবে চিহ্নিত করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং তাদের সিদ্ধান্তের পেছনের ভাবনা বোঝা, নিরাপদ অনলাইন ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া এবং পরিবার-বিদ্যালয়ের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কুমিল্লার চার স্কুলছাত্রী শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরেছে। কিন্তু তাদের এই যাত্রা মনে করিয়ে দিয়েছে, শিশুদের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে গেলেই তারা ডিজিটাল জগতের ঝুঁকি বুঝতে শেখে না। সেই জগতে কী দেখা উচিত, কার সঙ্গে কথা বলা নিরাপদ এবং পর্দার জীবন আর বাস্তব জীবনের পার্থক্য কোথায়—এসব শেখানোর দায়িত্বও বড়দের।

কারণ, শিশুদের নিরাপত্তা শুধু তাদের ঘরের দরজা বন্ধ রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তারা যে ভার্চুয়াল জগতে প্রতিদিন প্রবেশ করছে, সেখানেও তাদের পাশে থাকা জরুরি।