ঢাকা ১০:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রতিষ্ঠান বাড়ছে, শিক্ষার্থী কমছে: মাধ্যমিকে এক বছরে ঝরেছে ৪ লাখের বেশি ৪৫তম বিসিএসে নিয়োগ পেলেন ১,৭০২ জন, গেজেট প্রকাশ নামাজ পড়ে ফেরা হলো না চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মেহরাজের ৮০ কোটি তরুণ বেকার হতে পারে, দারিদ্র্যে পড়তে পারে ১৩ কোটি মানুষ মন্ত্রীকে না জানিয়ে খাদ্যগুদাম পরিদর্শন, দায়িত্ব হারালেন এপিএস নিজের সন্তান নয়, তবু মৃত শাবককে বুকে আগলে ঘুরছে হাতি সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু নয়, আমরা সবাই বাংলাদেশি: প্রতিমন্ত্রী টুকু ডেঙ্গু প্রতিরোধে সপ্তাহে দুই দিন আধা ঘণ্টা সময় দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ১০০ ফুট সড়কের ৯০ ফুটই বেদখল, চলাচলে চরম ভোগান্তি প্রথম ধাপে ৮০০ ইউপিতে ভোট, পেশিশক্তি দেখালেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা

বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও আর্থিক সংকটের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ

প্রতিষ্ঠান বাড়ছে, শিক্ষার্থী কমছে: মাধ্যমিকে এক বছরে ঝরেছে ৪ লাখের বেশি

জয়নাল আবেদিন
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:১২:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশে মাধ্যমিক শিক্ষায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫ প্রতিবেদনে। এক বছরের ব্যবধানে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি। অথচ একই সময়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কমেছে শিক্ষার্থী। বিপরীতে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেড়েছে।

শিক্ষার্থীর এই বিপরীতমুখী প্রবণতা দেশের শিক্ষা পরিকল্পনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং ঝরে পড়া রোধে নেওয়া উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার নির্দিষ্ট কারণ ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়নি।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) গত জুনে প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫ প্রতিবেদনের সঙ্গে আগের বছরের তথ্য তুলনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। এতে মূলত মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি সম্পূরক হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষার পরিসংখ্যানও প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখের বেশি

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, জুনিয়র স্কুলসহ দেশে সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন ১৯ হাজার ২১১টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ৭৪ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে ১৯ হাজার ১১৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন।

অর্থাৎ এক বছরে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে ৯৪টি। বিপরীতে শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজারের বেশি।

স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর মাধ্যমিক স্তরেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক স্তরসহ মোট শিক্ষার্থী এখন ১৫ লাখ ৩১ হাজারের বেশি। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। অথচ একই সময়ে স্কুল অ্যান্ড কলেজের সংখ্যা ১ হাজার ৫১৪টি থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫৫৬টিতে দাঁড়িয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শুধু মাধ্যমিক স্তরেই শিক্ষার্থী ১১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি।

এ ছাড়া ৫৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৭০ হাজারের বেশি।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ছিল ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯০ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ স্তরে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি।

প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার এ প্রবণতা শিক্ষা পরিকল্পনায় নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। কোথায় শিক্ষার্থীর চাহিদা কমছে, কোথায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কতটা কাজে লাগছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ ছাড়া সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ কঠিন।


বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের প্রভাব কতটা?

মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমার পেছনে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও পরিবারের আর্থিক সংকটের মতো কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। করোনাকালে তৈরি হওয়া শিখন ঘাটতি এবং পরবর্তী সময়ে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়াও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

বাল্যবিবাহের সঙ্গে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার সম্পর্কের একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অনুসন্ধানে। গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে বোর্ড জানতে পারে, ১ হাজার ৩৫০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৪৯ জনের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁদের মধ্যে ৯৭ শতাংশই ছাত্রী।

তবে এই তথ্য দিয়ে দেশের সব মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার কারণ নির্ধারণ করা যায় না। এটি নির্দিষ্টসংখ্যক অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর তথ্য। মাধ্যমিকে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে বাল্যবিবাহের পাশাপাশি আর্থিক সংকট, শিশুশ্রম, স্থানান্তর কিংবা অন্য কোনো কারণ কতটা দায়ী, তা জানতে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান প্রয়োজন।

ব্যানবেইসের একজন কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষা পরিসংখ্যানের প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি।

করোনার পরও কাটেনি শিক্ষার্থী কমার ধাক্কা

মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর আগের বছর ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কমেছিল।

করোনার সময় দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের শিখন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কতটা পুনরুদ্ধার হয়েছে এবং কোন শ্রেণিতে ঝরে পড়ার প্রবণতা বেশি—এসব তথ্যের বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিসংখ্যানে প্রতিষ্ঠান বাড়লেও শিক্ষার্থী কমার বিষয়টি তাই শুধু জনসংখ্যা বা ভর্তি-সংক্রান্ত পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীরা কেন বিদ্যালয় ছেড়ে যাচ্ছে, কোন বয়সে ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেশি এবং বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

কারিগরি শিক্ষায়ও কমছে শিক্ষার্থী

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে ৬ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি।


কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যেও কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার চিত্র উঠে এসেছে।

কর্মমুখী শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্য পূরণে যেখানে কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন, সেখানে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রবণতা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার মান, প্রশিক্ষণের বাস্তব উপযোগিতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহ—সবকিছু পর্যালোচনা করা দরকার।

মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে উল্টো চিত্র

মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমলেও মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেড়েছে।

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দাখিল, আলিম, ফাজিল (পাস), ফাজিল (অনার্স) ও কামিল পর্যায়ের শিক্ষা দেওয়া হয়—এমন মাদ্রাসা রয়েছে ৯ হাজার ২৯৬টি। ২০২৫ সালে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে ৯ হাজার ২৬৯টি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ছিল ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি।

অর্থাৎ এক বছরে মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে ২৭টি এবং শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। এ হিসাবে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি ও কওমি মাদ্রাসার তথ্য অন্তর্ভুক্ত নেই।


অন্যদিকে, দেশে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল রয়েছে ১৪৩টি। এসব প্রতিষ্ঠানে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২৯ হাজার ৬৭২ জন। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৭৭ জন। অর্থাৎ এক বছরে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৫৯৫ জন।

তবে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাড়ার তথ্য থেকেই শিক্ষার্থীরা কেন এসব ধারায় যাচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এ জন্য পরিবারগুলোর সিদ্ধান্ত, শিক্ষার ব্যয়, পাঠ্যক্রম, প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এবং শিক্ষার মান নিয়ে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন।

নিবিড় গবেষণার তাগিদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে করোনার পর শিখন ঘাটতি, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, সাম্প্রতিক নানা বিষয়, শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়া এবং শিক্ষাক্রমের প্রভাব থাকতে পারে।

তিনি বলেন, মাধ্যমিকে এত শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণসহ প্রতিবেদনের অন্যান্য পরিসংখ্যানের প্রবণতা বুঝতে নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

সার্বিকভাবে, মাধ্যমিকে চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়া এবং একই সময়ে বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার তথ্য শিক্ষা খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। তবে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে সমস্যার উৎস চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। শ্রেণিভিত্তিক ভর্তি ও উপস্থিতি, ঝরে পড়ার হার, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, পারিবারিক আয় এবং শিক্ষার মানের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কারণ নির্ণয় না করে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন কিংবা শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে সমস্যার মূল জায়গাটি অচিহ্নিত থেকে যেতে পারে। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া কমাতে এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে তাই তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা ও কার্যকর নজরদারিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও আর্থিক সংকটের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ

প্রতিষ্ঠান বাড়ছে, শিক্ষার্থী কমছে: মাধ্যমিকে এক বছরে ঝরেছে ৪ লাখের বেশি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:১২:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

দেশে মাধ্যমিক শিক্ষায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫ প্রতিবেদনে। এক বছরের ব্যবধানে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি। অথচ একই সময়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কমেছে শিক্ষার্থী। বিপরীতে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেড়েছে।

শিক্ষার্থীর এই বিপরীতমুখী প্রবণতা দেশের শিক্ষা পরিকল্পনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং ঝরে পড়া রোধে নেওয়া উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার নির্দিষ্ট কারণ ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়নি।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) গত জুনে প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫ প্রতিবেদনের সঙ্গে আগের বছরের তথ্য তুলনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। এতে মূলত মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি সম্পূরক হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষার পরিসংখ্যানও প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠান বেড়েছে, শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখের বেশি

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, জুনিয়র স্কুলসহ দেশে সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন ১৯ হাজার ২১১টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ৭৪ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে ১৯ হাজার ১১৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন।

অর্থাৎ এক বছরে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে ৯৪টি। বিপরীতে শিক্ষার্থী কমেছে ৪ লাখ ৮ হাজারের বেশি।

স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোর মাধ্যমিক স্তরেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক স্তরসহ মোট শিক্ষার্থী এখন ১৫ লাখ ৩১ হাজারের বেশি। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। অথচ একই সময়ে স্কুল অ্যান্ড কলেজের সংখ্যা ১ হাজার ৫১৪টি থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫৫৬টিতে দাঁড়িয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শুধু মাধ্যমিক স্তরেই শিক্ষার্থী ১১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি।

এ ছাড়া ৫৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৭০ হাজারের বেশি।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ছিল ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯০ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ স্তরে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি।

প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার এ প্রবণতা শিক্ষা পরিকল্পনায় নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। কোথায় শিক্ষার্থীর চাহিদা কমছে, কোথায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কতটা কাজে লাগছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ ছাড়া সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ কঠিন।


বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের প্রভাব কতটা?

মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমার পেছনে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও পরিবারের আর্থিক সংকটের মতো কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। করোনাকালে তৈরি হওয়া শিখন ঘাটতি এবং পরবর্তী সময়ে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়াও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।

বাল্যবিবাহের সঙ্গে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার সম্পর্কের একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অনুসন্ধানে। গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে বোর্ড জানতে পারে, ১ হাজার ৩৫০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৪৯ জনের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁদের মধ্যে ৯৭ শতাংশই ছাত্রী।

তবে এই তথ্য দিয়ে দেশের সব মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার কারণ নির্ধারণ করা যায় না। এটি নির্দিষ্টসংখ্যক অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর তথ্য। মাধ্যমিকে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে বাল্যবিবাহের পাশাপাশি আর্থিক সংকট, শিশুশ্রম, স্থানান্তর কিংবা অন্য কোনো কারণ কতটা দায়ী, তা জানতে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান প্রয়োজন।

ব্যানবেইসের একজন কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষা পরিসংখ্যানের প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি।

করোনার পরও কাটেনি শিক্ষার্থী কমার ধাক্কা

মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর আগের বছর ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কমেছিল।

করোনার সময় দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের শিখন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কতটা পুনরুদ্ধার হয়েছে এবং কোন শ্রেণিতে ঝরে পড়ার প্রবণতা বেশি—এসব তথ্যের বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিসংখ্যানে প্রতিষ্ঠান বাড়লেও শিক্ষার্থী কমার বিষয়টি তাই শুধু জনসংখ্যা বা ভর্তি-সংক্রান্ত পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীরা কেন বিদ্যালয় ছেড়ে যাচ্ছে, কোন বয়সে ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেশি এবং বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

কারিগরি শিক্ষায়ও কমছে শিক্ষার্থী

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে ৬ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি।


কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যেও কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার চিত্র উঠে এসেছে।

কর্মমুখী শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্য পূরণে যেখানে কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন, সেখানে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রবণতা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার মান, প্রশিক্ষণের বাস্তব উপযোগিতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহ—সবকিছু পর্যালোচনা করা দরকার।

মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে উল্টো চিত্র

মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমলেও মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেড়েছে।

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দাখিল, আলিম, ফাজিল (পাস), ফাজিল (অনার্স) ও কামিল পর্যায়ের শিক্ষা দেওয়া হয়—এমন মাদ্রাসা রয়েছে ৯ হাজার ২৯৬টি। ২০২৫ সালে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে ৯ হাজার ২৬৯টি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ছিল ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি।

অর্থাৎ এক বছরে মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে ২৭টি এবং শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। এ হিসাবে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি ও কওমি মাদ্রাসার তথ্য অন্তর্ভুক্ত নেই।


অন্যদিকে, দেশে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল রয়েছে ১৪৩টি। এসব প্রতিষ্ঠানে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২৯ হাজার ৬৭২ জন। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৭৭ জন। অর্থাৎ এক বছরে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৫৯৫ জন।

তবে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাড়ার তথ্য থেকেই শিক্ষার্থীরা কেন এসব ধারায় যাচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এ জন্য পরিবারগুলোর সিদ্ধান্ত, শিক্ষার ব্যয়, পাঠ্যক্রম, প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এবং শিক্ষার মান নিয়ে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন।

নিবিড় গবেষণার তাগিদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে করোনার পর শিখন ঘাটতি, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, সাম্প্রতিক নানা বিষয়, শিশুশ্রমে যুক্ত হওয়া এবং শিক্ষাক্রমের প্রভাব থাকতে পারে।

তিনি বলেন, মাধ্যমিকে এত শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণসহ প্রতিবেদনের অন্যান্য পরিসংখ্যানের প্রবণতা বুঝতে নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

সার্বিকভাবে, মাধ্যমিকে চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়া এবং একই সময়ে বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার তথ্য শিক্ষা খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। তবে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে সমস্যার উৎস চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। শ্রেণিভিত্তিক ভর্তি ও উপস্থিতি, ঝরে পড়ার হার, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, পারিবারিক আয় এবং শিক্ষার মানের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কারণ নির্ণয় না করে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন কিংবা শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে সমস্যার মূল জায়গাটি অচিহ্নিত থেকে যেতে পারে। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া কমাতে এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে তাই তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা ও কার্যকর নজরদারিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।