ঢাকা ১০:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নতুন ঋণে আইএমএফের দ্বারস্থ বাংলাদেশ, পুরোনো শর্তই কি ফিরছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:১৭:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আগের ঋণ কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এবার নতুন করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ নিতে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় তিন বছর মেয়াদে ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে দর-কষাকষি করছে সরকার। তবে নতুন ঋণের শর্ত কতটা নমনীয় হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ঋণ কর্মসূচির রূপরেখা নির্ধারণে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন অর্থমন্ত্রী। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে চুক্তি সই হতে পারে।

তবে আগের কর্মসূচির শর্ত পূরণে জটিলতার কারণে চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পর নতুন ঋণ আলোচনায় একই ধরনের সংস্কার শর্ত সামনে আসায় তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে, কর্মসূচি বদলালেও শর্তের ক্ষেত্রে কতটা পরিবর্তন আসবে?

সংস্কার আগে, ঋণ পরে—অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ

আইএমএফের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের নিজস্ব সংস্কার অগ্রাধিকার পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, শুধু অর্থের জোগান নিশ্চিত করলেই অর্থনীতির সমস্যার সমাধান হবে না; বরং রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা কাটানো জরুরি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সংস্কার কর্মসূচিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি দেশের নীতিনির্ধারকদের নিজেদেরই উপলব্ধি করতে হবে। এসব সংস্কার বাস্তবায়নে আইএমএফের ঋণ নেওয়া হলে মনে রাখতে হবে, ঋণের আসল অর্থের পাশাপাশি সুদও পরিশোধ করতে হবে।

তাঁর মতে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানো গেলে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হবে।

ব্যাংক, রাজস্ব ও ভর্তুকিতে সংস্কারের চাপ

নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার, জ্বালানি ও কৃষিতে ভর্তুকি কমানো, সরকারি পরিসংখ্যানে স্বচ্ছতা এবং জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সংস্কারের অনেকগুলোই দেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন। ফলে ঋণ নেওয়া না-নেওয়ার বাইরেও সংস্কার বাস্তবায়নের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংস্কারের গতি, সময়সীমা এবং সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

নতুন কর্মসূচিতে পুরোনো জটিলতার আশঙ্কা

ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, আগের ঋণ কর্মসূচিকে কঠিন শর্তযুক্ত বলা হলেও ঠিক কোন শর্তগুলো কঠিন, তা স্পষ্ট করা দরকার।

তিনি বলেন, তা না হলে বিষয়টি ‘নতুন বোতলে পুরোনো শরবত’ দেওয়ার মতো হয়ে যেতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, আগের কর্মসূচির কাজগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে নতুন কর্মসূচিতে সেগুলো বাস্তবায়ন আরও পিছিয়ে যেতে পারে।

ড. জাহিদ হোসেনের বক্তব্যে উঠে এসেছে, আগের কর্মসূচিতে যেসব সংস্কার করার কথা ছিল, সেগুলোই যদি নতুন কর্মসূচিতে আবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে কর্মসূচি পরিবর্তনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

৫৫০ কোটি ডলারের চুক্তি থেকে প্রাপ্তি ৩৬৪ কোটি

এর আগে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি হয়েছিল। ওই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ছাড় করতে পেরেছিল ৩৬৪ কোটি ডলার। তবে শর্ত পূরণ নিয়ে জটিলতার মধ্যে চলতি মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে ওই কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসে বাংলাদেশ।

এখন নতুন করে ঋণ আলোচনায় সরকারের সামনে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—একদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা, অন্যদিকে ঋণের শর্ত যেন দেশের সংস্কার পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করা।

নতুন ঋণের চুক্তি হলে তার প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে শুধু অর্থের পরিমাণের ওপর নয়; বরং শর্তের ধরন, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং ঋণের অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতার ওপরও।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

নতুন ঋণে আইএমএফের দ্বারস্থ বাংলাদেশ, পুরোনো শর্তই কি ফিরছে?

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:১৭:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

আগের ঋণ কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এবার নতুন করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ নিতে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় তিন বছর মেয়াদে ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে দর-কষাকষি করছে সরকার। তবে নতুন ঋণের শর্ত কতটা নমনীয় হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ঋণ কর্মসূচির রূপরেখা নির্ধারণে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন অর্থমন্ত্রী। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে চুক্তি সই হতে পারে।

তবে আগের কর্মসূচির শর্ত পূরণে জটিলতার কারণে চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পর নতুন ঋণ আলোচনায় একই ধরনের সংস্কার শর্ত সামনে আসায় তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে, কর্মসূচি বদলালেও শর্তের ক্ষেত্রে কতটা পরিবর্তন আসবে?

সংস্কার আগে, ঋণ পরে—অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ

আইএমএফের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের নিজস্ব সংস্কার অগ্রাধিকার পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, শুধু অর্থের জোগান নিশ্চিত করলেই অর্থনীতির সমস্যার সমাধান হবে না; বরং রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা কাটানো জরুরি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সংস্কার কর্মসূচিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি দেশের নীতিনির্ধারকদের নিজেদেরই উপলব্ধি করতে হবে। এসব সংস্কার বাস্তবায়নে আইএমএফের ঋণ নেওয়া হলে মনে রাখতে হবে, ঋণের আসল অর্থের পাশাপাশি সুদও পরিশোধ করতে হবে।

তাঁর মতে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানো গেলে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হবে।

ব্যাংক, রাজস্ব ও ভর্তুকিতে সংস্কারের চাপ

নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার, জ্বালানি ও কৃষিতে ভর্তুকি কমানো, সরকারি পরিসংখ্যানে স্বচ্ছতা এবং জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব সংস্কারের অনেকগুলোই দেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন। ফলে ঋণ নেওয়া না-নেওয়ার বাইরেও সংস্কার বাস্তবায়নের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংস্কারের গতি, সময়সীমা এবং সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

নতুন কর্মসূচিতে পুরোনো জটিলতার আশঙ্কা

ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, আগের ঋণ কর্মসূচিকে কঠিন শর্তযুক্ত বলা হলেও ঠিক কোন শর্তগুলো কঠিন, তা স্পষ্ট করা দরকার।

তিনি বলেন, তা না হলে বিষয়টি ‘নতুন বোতলে পুরোনো শরবত’ দেওয়ার মতো হয়ে যেতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, আগের কর্মসূচির কাজগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে নতুন কর্মসূচিতে সেগুলো বাস্তবায়ন আরও পিছিয়ে যেতে পারে।

ড. জাহিদ হোসেনের বক্তব্যে উঠে এসেছে, আগের কর্মসূচিতে যেসব সংস্কার করার কথা ছিল, সেগুলোই যদি নতুন কর্মসূচিতে আবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে কর্মসূচি পরিবর্তনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

৫৫০ কোটি ডলারের চুক্তি থেকে প্রাপ্তি ৩৬৪ কোটি

এর আগে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি হয়েছিল। ওই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ছাড় করতে পেরেছিল ৩৬৪ কোটি ডলার। তবে শর্ত পূরণ নিয়ে জটিলতার মধ্যে চলতি মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে ওই কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসে বাংলাদেশ।

এখন নতুন করে ঋণ আলোচনায় সরকারের সামনে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—একদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা, অন্যদিকে ঋণের শর্ত যেন দেশের সংস্কার পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করা।

নতুন ঋণের চুক্তি হলে তার প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে শুধু অর্থের পরিমাণের ওপর নয়; বরং শর্তের ধরন, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং ঋণের অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতার ওপরও।