কওমি মাদ্রাসায় ছেলেশিশু যৌন নির্যাতন: বারবার ঘটছে, থামানো যাচ্ছে না কেন?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:১০:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
কওমি মাদ্রাসায় সন্তানকে ভর্তি করানোর পেছনে অভিভাবকদের বড় প্রত্যাশা থাকে—ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে সে হাফেজ হবে। কিন্তু সেই স্বপ্নের জায়গায় কোনো কোনো পরিবারের জন্য নেমে আসছে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। আবাসিক মাদ্রাসায় ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসছে বারবার। কোনো ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে, কেউ গ্রেপ্তার হচ্ছে; আবার অনেক ঘটনা প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই চাপা পড়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সাত বছর বয়সী এক শিশুর বাবা বাশার (ছদ্মনাম) জানান, ছয় মাস আগে ছেলেকে স্থানীয় একটি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিলেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে প্রথমে কয়েকজন বেশি বয়সী শিক্ষার্থী এবং পরে এক শিক্ষক শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করেন।
বাশারের ভাষ্য, তাঁর ছেলে নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি মাদ্রাসার একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের কাছে জানিয়েছিল। কিন্তু অভিযোগের প্রতিকার না করে শিশুটিকে মারধর করা হয় এবং বিষয়টি গোপন রাখতে চাপ দেওয়া হয়। এমনকি বাবা-মাকে কিছু না বলার জন্য কোরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ করানোর অভিযোগও করেছেন তিনি।
বাবার দাবি, ভয়ে শিশুটি দীর্ঘদিন পরিবারের কাছে কিছু বলেনি। রাতে আতঙ্কে ঘুমাতে পারত না; অভিযুক্ত শিক্ষকের ভয়ে অন্য জায়গায় লুকিয়ে থাকত। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি জানাজানি হলে ২৬ আগস্ট মামলা করেন শিশুটির বাবা। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলায় ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুই শিক্ষকসহ পাঁচজন কারাগারে, দুজন জামিনে এবং তিনজন পলাতক রয়েছেন।
এটি একটি পরিবারের অভিযোগ ও মামলা-সংক্রান্ত বর্ণনা। তবে এ ধরনের ঘটনা কতটা বিস্তৃত, তার নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান ছাড়া সব কওমি মাদ্রাসা সম্পর্কে সাধারণীকরণ করা যায় না। তবু একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় শিশুদের নিরাপত্তা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং অপরাধের বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
নির্যাতনের চক্র ভাঙা যাচ্ছে না কেন?
কওমি মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থী ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা, অভিভাবকদের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে আবাসিক ব্যবস্থায় শিশুদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দুর্বলতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অভিযোগ গোপন রাখা এবং কার্যকর নজরদারির অভাব।
আবাসিক ব্যবস্থায় নজরদারির ঘাটতি
কওমি মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থী সালাউদ্দীন জাহাঙ্গীরের মতে, আবাসিক কাঠামো এবং শিশুদের সঙ্গে শিক্ষক ও বয়স্ক শিক্ষার্থীদের ক্ষমতার সম্পর্কের কারণে নির্যাতনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, বিশেষ করে হেফজখানার অপেক্ষাকৃত ছোট শিক্ষার্থীরা নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
এ ধরনের পরিবেশে শিশুরা অনেক সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির চেয়ে বয়সে ছোট, শারীরিকভাবে দুর্বল এবং মানসিকভাবে নির্ভরশীল থাকে। ফলে ভয় দেখানো, শাস্তির হুমকি কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহার করে তাদের নীরব রাখা সহজ হতে পারে।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো শিশু একসময় নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর বড় হয়ে অন্য শিশুর ওপর একই ধরনের আচরণ করতে পারে। তবে সব ভুক্তভোগী ভবিষ্যতে নিপীড়ক হয়ে ওঠেন—এমন ধারণা সঠিক নয়। নির্যাতন প্রতিরোধে প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ এবং যথাযথ ব্যবস্থা।
অভিযোগ জানালেও প্রতিকার না পাওয়ার ভয়
শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনায় অনেক সময় অভিযোগকারীর মুখ বন্ধ রাখতে ভয় দেখানো হয় বলে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের বক্তব্যে উঠে এসেছে। কোথাও অভিযুক্তকে শুধু প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়া বা নামমাত্র শাস্তি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সালাউদ্দীন জাহাঙ্গীরের মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা, অনুদান কমে যাওয়া কিংবা শিক্ষার্থী ভর্তি কমে যাওয়ার ভয়ে কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে দিতে চায় না।
এ ধরনের আশঙ্কা থেকে ঘটনা গোপন রাখা হলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেওয়া হলে সেখানেও শিশুদের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু অভ্যন্তরীণ শাস্তি নয়, আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।
নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয় না, সামনে আসে কম
সাম্প্রতিক সময়ে কওমি মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য তুলে ধরতে ‘আওয়াজডটবিডি’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন সাবেক দুই শিক্ষার্থী। এর অন্যতম উদ্যোক্তা সালাউদ্দীন জাহাঙ্গীর।
ওয়েবসাইটটির উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করার লক্ষ্য। পরিচয় প্রকাশ না করেও সেখানে অভিজ্ঞতা জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে এ ধরনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা দিয়ে দেশজুড়ে নির্যাতনের প্রকৃত হার নির্ধারণ করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, অভিযোগের ধরন ও নিষ্পত্তির হিসাব এবং স্বাধীন গবেষণা।
নজরদারির দায়িত্ব কার?
কওমি মাদ্রাসায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তদারকি ও জবাবদিহির কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
প্রথমত, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও শিক্ষাব্যবস্থাপনা সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো একক কাঠামোয় পরিচালিত হয় না। দ্বিতীয়ত, কওমি মাদ্রাসাগুলো বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় তদারকির দায়িত্ব একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত। তৃতীয়ত, বোর্ডগুলোর প্রধান কাজ সাধারণত শিক্ষা কার্যক্রম, পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা পরিচালনা। শিশু সুরক্ষা, যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা ও কার্যকর ব্যবস্থার প্রশ্ন রয়েছে।
তবে প্রশাসনিক কাঠামোর পার্থক্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে শিশুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে পারে না। যৌন নির্যাতন একটি অপরাধ; অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো এবং আইন অনুযায়ী তদন্তের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
কওমি মাদ্রাসার বড় বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহসভাপতি মুসলেহ উদ্দীন রাজু বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা তাঁদের কাছে এলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে বোর্ডের কাছে অভিযোগ পৌঁছানোর আগেই মাদ্রাসা কমিটি বা স্থানীয় লোকজন ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।
তবে অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে হয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ভুক্তভোগী শিশুদের সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ও নিয়মিত তথ্য প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে।
নতুন নির্দেশনা কতটা কার্যকর হবে?
শিক্ষার্থীদের মারধর করে শাস্তি দেওয়া নিষিদ্ধ করে এবং প্রতিটি মাদ্রাসায় ছাত্র সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠনের পরামর্শ দিয়ে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ সম্প্রতি একটি নির্দেশনা জারি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থীদের প্রতি যথাযথ আচরণ নিশ্চিত করা এবং অনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু নির্দেশনা জারি করলেই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। কমিটিগুলো বাস্তবে কতটা সক্রিয়, অভিযোগ পেলে কী ব্যবস্থা নেয় এবং কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত কে করবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থায় অন্তত কয়েকটি বিষয় থাকা প্রয়োজন:
- স্বাধীন অভিযোগব্যবস্থা: শিশু ও অভিভাবক যেন ভয় ছাড়াই অভিযোগ জানাতে পারেন।
- দ্রুত তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা: গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা শুধু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নিষ্পত্তি না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
- আবাসিক পরিবেশে নজরদারি: রাতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আচরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ।
- গোপনীয়তা ও মানসিক সহায়তা: ভুক্তভোগীর পরিচয় সুরক্ষিত রাখা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া।
- নিয়মিত পরিদর্শন ও জবাবদিহি: শিশু সুরক্ষা কমিটি কার্যকর আছে কি না, অভিযোগ কীভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে এবং কোনো অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা।
আইনে অপরাধ, কিন্তু অভিযোগ সামনে আসে কতটা?
বাংলাদেশে ছেলেশিশুর যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ছেলেশিশুর বলাৎকারের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে আইন থাকা আর বাস্তবে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। সামাজিক লজ্জা, ভয়, ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ কিংবা বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে কোনো কোনো পরিবার অভিযোগ জানাতে দ্বিধা করতে পারে। আবার শিশুরা অনেক সময় বুঝতে পারে না কী ঘটেছে, কাকে জানাতে হবে কিংবা অভিযোগ করলে তাদের ওপর আরও চাপ আসবে কি না।
এ কারণে শিশুদের বয়স উপযোগী ভাষায় নিরাপত্তা সম্পর্কে শেখানো, বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে অভিযোগ জানানোর সুযোগ তৈরি করা এবং অভিভাবকদের সতর্ক থাকা জরুরি। কোনো শিশু নির্যাতনের কথা জানালে তাকে দোষারোপ করা বা চুপ থাকতে বলা নয়—তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
কওমি মাদ্রাসায় ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতন নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষামন্ত্রী বা শিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে; তবে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সমাধান শুধু বদনাম ঠেকানো নয়, শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া
ধর্মীয় শিক্ষা, আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠানের সুনাম—কোনোটিই শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় হতে পারে না। কোনো প্রতিষ্ঠানে অপরাধের অভিযোগ উঠলে সেটিকে পুরো ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযোগে পরিণত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রতিষ্ঠানের সুনামের অজুহাতে অভিযোগ গোপন রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়।
মূল প্রশ্ন হলো, একটি শিশু নির্যাতনের শিকার হলে সে কোথায় নিরাপদে অভিযোগ জানাবে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত কে করবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে কীভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।
শিশুদের সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি, স্বাধীন অভিযোগব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা না থাকলে শুধু নির্দেশনা দিয়ে নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা প্রতিষ্ঠানই অভিযোগের ঊর্ধ্বে থাকবে না এবং শিশুর নিরাপত্তাই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
























