ঢাকা ১১:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মন্ত্রীকে না জানিয়ে খাদ্যগুদাম পরিদর্শন, দায়িত্ব হারালেন এপিএস নিজের সন্তান নয়, তবু মৃত শাবককে বুকে আগলে ঘুরছে হাতি সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু নয়, আমরা সবাই বাংলাদেশি: প্রতিমন্ত্রী টুকু ডেঙ্গু প্রতিরোধে সপ্তাহে দুই দিন আধা ঘণ্টা সময় দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ১০০ ফুট সড়কের ৯০ ফুটই বেদখল, চলাচলে চরম ভোগান্তি প্রথম ধাপে ৮০০ ইউপিতে ভোট, পেশিশক্তি দেখালেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা কওমি মাদ্রাসায় ছেলেশিশু যৌন নির্যাতন: বারবার ঘটছে, থামানো যাচ্ছে না কেন? ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত পোপ লিও, অস্ত্রোপচারে বাদ দেওয়া হলো একাংশ সৌদির আরামকো তেল শোধনাগারে হামলার দাবি, ক্ষয়ক্ষতি কতটা? জয়পুরহাটে চালককে গলা কেটে হত্যা করে অটো ছিনতাই

নিজের সন্তান নয়, তবু মৃত শাবককে বুকে আগলে ঘুরছে হাতি

বাংলা টাইমস ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৪০:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নিজের সন্তান হারানোর ক্ষত বুকে নিয়েই কি অন্যের শাবকের মধ্যে খুঁজছিল মাতৃত্বের ছোঁয়া? নামিবিয়ার শুষ্ক নদীখাতে মৃত এক হাতিশাবককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বহন করা মাদি হাতির আচরণ নাড়া দিয়েছে বন্যপ্রাণী গবেষক ও আলোকচিত্রীদের।

নামিবিয়ার রুক্ষ মরুভূমি। চারদিকে শুষ্ক নদীখাত, ধুলোমাখা পথ আর পানির খোঁজে ছুটে চলা হাতির পাল। এমনই এক পথে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যামেরা হাতে এগিয়ে চলছিলেন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ফেদেরিকো ভেরোনেসি। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে এক দৃশ্য, যা মুহূর্তেই থমকে দেয় তাঁকে।

একটি মাদি হাতি শুঁড়ে জড়িয়ে বহন করছে ছোট্ট একটি মৃত শাবককে। শাবকটির নিথর দেহ বাতাসে ঝুলছে, ছোট্ট পা দুটি আটকে আছে হাতিটির শুঁড়ে। দেহটি তখনো নরম, একেবারেই সদ্যোজাত বলে মনে হচ্ছিল। জীবনের পৃথিবীতে যার পথচলা শুরু হওয়ার কথা ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, সেই ছোট্ট প্রাণটি এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে।

দৃশ্যটি দেখে প্রথমেই মনে হয়েছিল, সন্তান হারানোর শোকে কাতর কোনো মা হয়তো তার মৃত সন্তানকে ছাড়তে পারছে না। কিন্তু পরে জানা গেল, এই হাতি শাবকটির মা নয়। বরং নিজের সন্তান হারানোর অভিজ্ঞতা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা এই মাদি হাতি এর আগেও অন্য হাতির মৃত শাবক বহন করেছে।

ঘটনাটি শুধু একটি বন্যপ্রাণীর মর্মান্তিক মুহূর্ত নয়; এটি হাতিদের আবেগ, শোক, স্মৃতি ও পারস্পরিক সম্পর্কের জটিল জগৎ সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।

যে শাবক তার নয়, তাকেও ছাড়তে পারেনি

ফেদেরিকো ভেরোনেসি বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে হাতির পালটিকে অনুসরণ করেন। এ সময় তিনি দেখেন, মাদি হাতিটি মৃত শাবকটিকে কখনো নিচে নামাচ্ছে, কখনো আবার তুলে নিচ্ছে। কখনো যেন খাওয়ানোর চেষ্টা করছে, কখনো পানি পান করানোর ভঙ্গিতে শাবকটির কাছে যাচ্ছে। এরপর আবার মৃতদেহটি শুঁড়ে নিয়ে হুয়াব নদীর পথ ধরে এগিয়ে চলেছে।

ভেরোনেসির কাছে দৃশ্যটি ছিল একই সঙ্গে বেদনাদায়ক ও বিস্ময়কর। তাঁর ভাষায়, মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত অন্তরঙ্গ, প্রায় আধ্যাত্মিক।

তিনি বুঝতে পারছিলেন, ক্যামেরায় ধরা পড়ছে এমন এক আচরণ, যা সাধারণত মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। তাই কষ্টের দৃশ্য হলেও তিনি ছবি তোলা বন্ধ করেননি। তাঁর বিশ্বাস, হাতির অনুভূতি ও জীবনসংগ্রাম বুঝতে মানুষকে এমন মুহূর্তের মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন।

পরবর্তী সময়ে জানা যায়, হাতিটি বর্তমানে ১৪ বছর বয়সী। প্রায় দুই বছর আগে সে নিজের শাবক হারিয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকে তাকে অন্তত চারবার অন্য হাতির মৃত শাবক বহন করতে দেখা গেছে।

নামিবিয়ার মরু হাতি সংরক্ষণে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা এলিফ্যান্ট হিউম্যান রিলেশনস এইডের (ইএইচআরএ) সংরক্ষণ কর্মসূচির পরিচালক ক্রিস্টিন উইন্টার জানান, হাতিটির এই আচরণ স্থানীয় এলাকায় প্রথমবারের মতো নথিভুক্ত করা হয়েছে।

তবে কেন সে বারবার অন্যের মৃত শাবক বহন করছে, তার নিশ্চিত উত্তর এখনো নেই।

নিজের হারানো সন্তানকে কি খুঁজে ফেরে সে?

একটি মৃত শাবককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বহন করে নিয়ে যাওয়ার পেছনে কী কাজ করে—মাতৃত্বের প্রবৃত্তি, শোক, স্মৃতি, নাকি অন্য কোনো আচরণগত কারণ? গবেষকদের কাছে এটি এখনো অনুসন্ধানের বিষয়।

ক্রিস্টিন উইন্টারের ধারণা, এটি হাতিটির শোক সামলে ওঠার একটি প্রক্রিয়া হতে পারে। নিজের সন্তান হারানোর পর সেই অভিজ্ঞতা তার আচরণে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখছেন গবেষকেরা।

হয়তো অন্য কোনো শাবকের মৃত্যু তার পুরোনো ক্ষতকে আবার সামনে নিয়ে আসে। আবার মৃতদেহটি শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা করার প্রবৃত্তিও কাজ করতে পারে।

এসব ব্যাখ্যার কোনোটিই এখনো নিশ্চিত নয়। তবে হাতিটির আচরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—প্রাণীদের আবেগ কি শুধু তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি অতীতের বেদনাও তাদের আচরণকে দীর্ঘদিন প্রভাবিত করে?

ভেরোনেসির তোলা ছবিগুলো সেই প্রশ্নকেই মানুষের সামনে তুলে ধরেছে। ছবিগুলোর একটি লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আয়োজিত ২০২৬ সালের ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় প্রধান পুরস্কার জিতেছে।

ছবিটির গুরুত্ব শুধু এর দৃশ্যগত সৌন্দর্যে নয়। এর মধ্যে ধরা পড়েছে এমন এক প্রাণীর আচরণ, যার অনুভূতির গভীরতা আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।

শোক কি শুধু মানুষের অনুভূতি?

দীর্ঘদিন ধরে প্রাণীদের আবেগ নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ছিল। কিন্তু হাতিদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে গবেষকেরা এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন, যা শোক ও পারিবারিক বন্ধনের ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

হাতিদের পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলে জীবিত হাতিদের মৃতদেহের কাছে যেতে, শুঁড় দিয়ে স্পর্শ করতে, হাড়ের কাছে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে কিংবা মৃতদেহের আশপাশে সমবেত হতে দেখা গেছে। কখনো পরিচিত হাতির পাশাপাশি অপরিচিত হাতিরাও এমন আচরণ করে।

আফ্রিকান সাভানা হাতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ এবং সংরক্ষণ সংস্থা এলিফ্যান্ট ভয়েসেসের প্রতিষ্ঠাতা জয়েস পুলও ভেরোনেসির ছবিগুলোকে মর্মান্তিক বলে বর্ণনা করেছেন।

কেনিয়ায় নিজের পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, এক মা হাতিকে তার মৃত শাবক তোলার চেষ্টা করতে দেখেছিলেন। হাতিটি শাবকটিকে বহন করতে পারেনি, কিন্তু দুই দিন ধরে তার পাশে দাঁড়িয়ে সেটিকে তোলার চেষ্টা করেছিল।

এ ধরনের ঘটনা থেকে প্রাণীদের অনুভূতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া গেলেও, নির্দিষ্ট আচরণের পেছনে ঠিক কী আবেগ কাজ করছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবু এসব পর্যবেক্ষণ মনে করিয়ে দেয়, প্রাণীদের জীবন কেবল খাদ্য সংগ্রহ, বংশবিস্তার আর টিকে থাকার হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়।

মরুভূমিতে টিকে থাকার কঠিন লড়াই

নামিবিয়ার মরু হাতির জীবন এমনিতেই কঠিন। নামিব মরুভূমির পাঁচটি নদীখাতকে কেন্দ্র করে বসবাস করা এই হাতিরা খাদ্য ও পানির সন্ধানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। আনা গাছের বীজকোষ ও প্লাবনভূমির ঘাস তাদের খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

এরা হাতির আলাদা কোনো প্রজাতি নয়; বরং শুষ্ক পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া হাতির একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী। দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত আচরণ ও পরিবেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তারা মরুভূমিতে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছে।

ইএইচআরএর সংরক্ষণ কর্মসূচির পরিচালক উইন্টারের মতে, এই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানই তাদের বিশেষ করে তুলেছে। একই সঙ্গে এটি তাদের ঝুঁকির মুখেও ফেলেছে। কারণ, এই জনগোষ্ঠী হারিয়ে গেলে তাদের অর্জিত জীবনধারণের জ্ঞানও হারিয়ে যেতে পারে।

গত দুই দশকে মরু হাতির সংখ্যা কমেছে বলে জানিয়েছেন উইন্টার। দীর্ঘস্থায়ী খরা ও পরিবেশগত চাপের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সংঘাতও এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।

এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে পানি। হাতিরা খামারে ঢুকে পানির ট্যাংক উল্টে দিতে পারে, পাইপ ছিঁড়ে ফেলতে পারে কিংবা পানির পাম্প ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও পানির সরবরাহ ব্যাহত হয়। ফলে হাতির উপস্থিতির প্রতি মানুষের সহনশীলতা কমে যায়।

একদিকে মরুভূমিতে বেঁচে থাকার তাগিদ, অন্যদিকে মানুষের সঙ্গে সংঘাত—দুইয়ের মাঝখানে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে হাতিদের নিরাপদে চলাচলের সুযোগ।

জন্মের পরই নিভে যাচ্ছে অনেক শাবকের জীবন

মরু হাতিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ নবজাতক শাবকের উচ্চ মৃত্যুহার।

উইন্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পর্যবেক্ষণ করা ১৬টি শাবকের মধ্যে মাত্র দুটি বেঁচে ছিল। অর্থাৎ, ওই পর্যবেক্ষণে অধিকাংশ শাবকই জন্মের পর টিকে থাকতে পারেনি।

সাধারণত একটি সুস্থ নবজাতক হাতির ওজন প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কেজি হয়। কিন্তু ইএইচআরএর দল যেসব মৃত শাবক খুঁজে পেয়েছে, সেগুলোর ওজন ছিল প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ কেজি।

গবেষকদের ধারণা, কিছু শাবক অপরিণত অবস্থায় জন্ম নিতে পারে। মায়ের শারীরিক অবস্থা, পরিবেশগত চাপ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের সঙ্গে এ ধরনের মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে কোনো একটি কারণকে এখনো নিশ্চিতভাবে দায়ী করা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে ইএইচআরএ কাজ করছে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের হাতি বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ড্যানিয়েলা চুসিডের সঙ্গে।

২০২৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে এমন একটি গবেষণা প্রকল্পে হাতির মলের নমুনা সংগ্রহ করে ভারী ধাতু ও পিএফএএসের মতো স্থায়ী রাসায়নিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি থাইরয়েড ও কর্টিসল হরমোন বিশ্লেষণ করে তাদের শারীরবৃত্তীয় অবস্থা ও মানসিক চাপের সম্ভাব্য প্রভাব বোঝার চেষ্টা চলছে।

গবেষকেরা আরও জানতে চান, অন্য হাতির জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই হাতিদের মধ্যে অন্তঃপ্রজননের মাত্রা কেমন এবং বেঁচে থাকা ও মারা যাওয়া শাবকদের বংশগত বৈশিষ্ট্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না।

এসব গবেষণার ফল মরু হাতিদের প্রজনন, শাবকের বেঁচে থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

শোকের গল্পের আড়ালে বেঁচে থাকার আকুতি

জয়েস পুলের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি নামিবিয়া সরকারের দেওয়া শিকারের অনুমতিও মরু হাতিদের জন্য উদ্বেগের কারণ। তাঁর বক্তব্য, এই প্রাণীদের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব কমাতে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ভেরোনেসির কাছে মৃত শাবক বহন করা মাদি হাতিটির আচরণ ছিল প্রায় মানবিক। তবে এই দৃশ্যকে কেবল মানুষের আবেগের সঙ্গে তুলনা করে দেখাই তাঁর ছবির একমাত্র বার্তা নয়। বরং প্রতিটি হাতির নিজস্ব জীবন, অভিজ্ঞতা ও কল্যাণের গুরুত্ব তুলে ধরাই তাঁর উদ্দেশ্য।

একটি মাদি হাতি কেন নিজের সন্তান নয়, এমন একটি মৃত শাবককে বারবার বহন করে—তার উত্তর হয়তো এখনই পাওয়া যাবে না। এটি শোকের বহিঃপ্রকাশ, হারানো সন্তানের স্মৃতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক, নাকি অন্য কোনো স্বাভাবিক আচরণ—তা জানতে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: মরুভূমির এই হাতিদের জীবন শুধু প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প নয়। তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সামাজিক বন্ধন, শেখা অভিজ্ঞতা এবং এমন কিছু আচরণ, যার অর্থ বুঝতে মানুষ এখনো চেষ্টা করছে।

যে মাদি হাতিটি নিজের শাবক হারানোর দুই বছর পরও অন্যের মৃত শাবক বহন করছে, তার আচরণ তাই গবেষকদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ রহস্য। আর সেই রহস্যের মধ্যেই উঠে এসেছে আরও বড় বাস্তবতা—পরিবেশগত সংকট, শাবকের মৃত্যু এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাতের কারণে বিপন্ন হয়ে পড়ছে মরুভূমির এই অনন্য হাতিরা।

ভেরোনেসির প্রত্যাশা, তাঁর ছবিগুলো মানুষকে হাতিদের অনুভূতি ও জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করবে। শুধু একটি প্রজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করাই নয়, প্রতিটি হাতির নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করাও যে সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সেই বার্তাই পৌঁছে দিতে চান তিনি।

কারণ, মরুভূমির ধুলোমাখা পথে মৃত শাবক বয়ে চলা হাতিটির ছবিতে শুধু মৃত্যুর বেদনা নেই; আছে প্রাণীদের অজানা অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা এবং তাদের বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষার তাগিদ।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

নিজের সন্তান নয়, তবু মৃত শাবককে বুকে আগলে ঘুরছে হাতি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৪০:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

নিজের সন্তান হারানোর ক্ষত বুকে নিয়েই কি অন্যের শাবকের মধ্যে খুঁজছিল মাতৃত্বের ছোঁয়া? নামিবিয়ার শুষ্ক নদীখাতে মৃত এক হাতিশাবককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বহন করা মাদি হাতির আচরণ নাড়া দিয়েছে বন্যপ্রাণী গবেষক ও আলোকচিত্রীদের।

নামিবিয়ার রুক্ষ মরুভূমি। চারদিকে শুষ্ক নদীখাত, ধুলোমাখা পথ আর পানির খোঁজে ছুটে চলা হাতির পাল। এমনই এক পথে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যামেরা হাতে এগিয়ে চলছিলেন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ফেদেরিকো ভেরোনেসি। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে এক দৃশ্য, যা মুহূর্তেই থমকে দেয় তাঁকে।

একটি মাদি হাতি শুঁড়ে জড়িয়ে বহন করছে ছোট্ট একটি মৃত শাবককে। শাবকটির নিথর দেহ বাতাসে ঝুলছে, ছোট্ট পা দুটি আটকে আছে হাতিটির শুঁড়ে। দেহটি তখনো নরম, একেবারেই সদ্যোজাত বলে মনে হচ্ছিল। জীবনের পৃথিবীতে যার পথচলা শুরু হওয়ার কথা ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, সেই ছোট্ট প্রাণটি এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে।

দৃশ্যটি দেখে প্রথমেই মনে হয়েছিল, সন্তান হারানোর শোকে কাতর কোনো মা হয়তো তার মৃত সন্তানকে ছাড়তে পারছে না। কিন্তু পরে জানা গেল, এই হাতি শাবকটির মা নয়। বরং নিজের সন্তান হারানোর অভিজ্ঞতা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা এই মাদি হাতি এর আগেও অন্য হাতির মৃত শাবক বহন করেছে।

ঘটনাটি শুধু একটি বন্যপ্রাণীর মর্মান্তিক মুহূর্ত নয়; এটি হাতিদের আবেগ, শোক, স্মৃতি ও পারস্পরিক সম্পর্কের জটিল জগৎ সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।

যে শাবক তার নয়, তাকেও ছাড়তে পারেনি

ফেদেরিকো ভেরোনেসি বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে হাতির পালটিকে অনুসরণ করেন। এ সময় তিনি দেখেন, মাদি হাতিটি মৃত শাবকটিকে কখনো নিচে নামাচ্ছে, কখনো আবার তুলে নিচ্ছে। কখনো যেন খাওয়ানোর চেষ্টা করছে, কখনো পানি পান করানোর ভঙ্গিতে শাবকটির কাছে যাচ্ছে। এরপর আবার মৃতদেহটি শুঁড়ে নিয়ে হুয়াব নদীর পথ ধরে এগিয়ে চলেছে।

ভেরোনেসির কাছে দৃশ্যটি ছিল একই সঙ্গে বেদনাদায়ক ও বিস্ময়কর। তাঁর ভাষায়, মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত অন্তরঙ্গ, প্রায় আধ্যাত্মিক।

তিনি বুঝতে পারছিলেন, ক্যামেরায় ধরা পড়ছে এমন এক আচরণ, যা সাধারণত মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। তাই কষ্টের দৃশ্য হলেও তিনি ছবি তোলা বন্ধ করেননি। তাঁর বিশ্বাস, হাতির অনুভূতি ও জীবনসংগ্রাম বুঝতে মানুষকে এমন মুহূর্তের মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন।

পরবর্তী সময়ে জানা যায়, হাতিটি বর্তমানে ১৪ বছর বয়সী। প্রায় দুই বছর আগে সে নিজের শাবক হারিয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকে তাকে অন্তত চারবার অন্য হাতির মৃত শাবক বহন করতে দেখা গেছে।

নামিবিয়ার মরু হাতি সংরক্ষণে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা এলিফ্যান্ট হিউম্যান রিলেশনস এইডের (ইএইচআরএ) সংরক্ষণ কর্মসূচির পরিচালক ক্রিস্টিন উইন্টার জানান, হাতিটির এই আচরণ স্থানীয় এলাকায় প্রথমবারের মতো নথিভুক্ত করা হয়েছে।

তবে কেন সে বারবার অন্যের মৃত শাবক বহন করছে, তার নিশ্চিত উত্তর এখনো নেই।

নিজের হারানো সন্তানকে কি খুঁজে ফেরে সে?

একটি মৃত শাবককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বহন করে নিয়ে যাওয়ার পেছনে কী কাজ করে—মাতৃত্বের প্রবৃত্তি, শোক, স্মৃতি, নাকি অন্য কোনো আচরণগত কারণ? গবেষকদের কাছে এটি এখনো অনুসন্ধানের বিষয়।

ক্রিস্টিন উইন্টারের ধারণা, এটি হাতিটির শোক সামলে ওঠার একটি প্রক্রিয়া হতে পারে। নিজের সন্তান হারানোর পর সেই অভিজ্ঞতা তার আচরণে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখছেন গবেষকেরা।

হয়তো অন্য কোনো শাবকের মৃত্যু তার পুরোনো ক্ষতকে আবার সামনে নিয়ে আসে। আবার মৃতদেহটি শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা করার প্রবৃত্তিও কাজ করতে পারে।

এসব ব্যাখ্যার কোনোটিই এখনো নিশ্চিত নয়। তবে হাতিটির আচরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—প্রাণীদের আবেগ কি শুধু তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি অতীতের বেদনাও তাদের আচরণকে দীর্ঘদিন প্রভাবিত করে?

ভেরোনেসির তোলা ছবিগুলো সেই প্রশ্নকেই মানুষের সামনে তুলে ধরেছে। ছবিগুলোর একটি লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আয়োজিত ২০২৬ সালের ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় প্রধান পুরস্কার জিতেছে।

ছবিটির গুরুত্ব শুধু এর দৃশ্যগত সৌন্দর্যে নয়। এর মধ্যে ধরা পড়েছে এমন এক প্রাণীর আচরণ, যার অনুভূতির গভীরতা আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।

শোক কি শুধু মানুষের অনুভূতি?

দীর্ঘদিন ধরে প্রাণীদের আবেগ নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ছিল। কিন্তু হাতিদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে গবেষকেরা এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন, যা শোক ও পারিবারিক বন্ধনের ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

হাতিদের পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলে জীবিত হাতিদের মৃতদেহের কাছে যেতে, শুঁড় দিয়ে স্পর্শ করতে, হাড়ের কাছে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে কিংবা মৃতদেহের আশপাশে সমবেত হতে দেখা গেছে। কখনো পরিচিত হাতির পাশাপাশি অপরিচিত হাতিরাও এমন আচরণ করে।

আফ্রিকান সাভানা হাতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ এবং সংরক্ষণ সংস্থা এলিফ্যান্ট ভয়েসেসের প্রতিষ্ঠাতা জয়েস পুলও ভেরোনেসির ছবিগুলোকে মর্মান্তিক বলে বর্ণনা করেছেন।

কেনিয়ায় নিজের পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, এক মা হাতিকে তার মৃত শাবক তোলার চেষ্টা করতে দেখেছিলেন। হাতিটি শাবকটিকে বহন করতে পারেনি, কিন্তু দুই দিন ধরে তার পাশে দাঁড়িয়ে সেটিকে তোলার চেষ্টা করেছিল।

এ ধরনের ঘটনা থেকে প্রাণীদের অনুভূতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া গেলেও, নির্দিষ্ট আচরণের পেছনে ঠিক কী আবেগ কাজ করছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবু এসব পর্যবেক্ষণ মনে করিয়ে দেয়, প্রাণীদের জীবন কেবল খাদ্য সংগ্রহ, বংশবিস্তার আর টিকে থাকার হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়।

মরুভূমিতে টিকে থাকার কঠিন লড়াই

নামিবিয়ার মরু হাতির জীবন এমনিতেই কঠিন। নামিব মরুভূমির পাঁচটি নদীখাতকে কেন্দ্র করে বসবাস করা এই হাতিরা খাদ্য ও পানির সন্ধানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। আনা গাছের বীজকোষ ও প্লাবনভূমির ঘাস তাদের খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

এরা হাতির আলাদা কোনো প্রজাতি নয়; বরং শুষ্ক পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া হাতির একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী। দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত আচরণ ও পরিবেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তারা মরুভূমিতে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছে।

ইএইচআরএর সংরক্ষণ কর্মসূচির পরিচালক উইন্টারের মতে, এই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানই তাদের বিশেষ করে তুলেছে। একই সঙ্গে এটি তাদের ঝুঁকির মুখেও ফেলেছে। কারণ, এই জনগোষ্ঠী হারিয়ে গেলে তাদের অর্জিত জীবনধারণের জ্ঞানও হারিয়ে যেতে পারে।

গত দুই দশকে মরু হাতির সংখ্যা কমেছে বলে জানিয়েছেন উইন্টার। দীর্ঘস্থায়ী খরা ও পরিবেশগত চাপের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সংঘাতও এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।

এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে পানি। হাতিরা খামারে ঢুকে পানির ট্যাংক উল্টে দিতে পারে, পাইপ ছিঁড়ে ফেলতে পারে কিংবা পানির পাম্প ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও পানির সরবরাহ ব্যাহত হয়। ফলে হাতির উপস্থিতির প্রতি মানুষের সহনশীলতা কমে যায়।

একদিকে মরুভূমিতে বেঁচে থাকার তাগিদ, অন্যদিকে মানুষের সঙ্গে সংঘাত—দুইয়ের মাঝখানে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে হাতিদের নিরাপদে চলাচলের সুযোগ।

জন্মের পরই নিভে যাচ্ছে অনেক শাবকের জীবন

মরু হাতিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ নবজাতক শাবকের উচ্চ মৃত্যুহার।

উইন্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পর্যবেক্ষণ করা ১৬টি শাবকের মধ্যে মাত্র দুটি বেঁচে ছিল। অর্থাৎ, ওই পর্যবেক্ষণে অধিকাংশ শাবকই জন্মের পর টিকে থাকতে পারেনি।

সাধারণত একটি সুস্থ নবজাতক হাতির ওজন প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কেজি হয়। কিন্তু ইএইচআরএর দল যেসব মৃত শাবক খুঁজে পেয়েছে, সেগুলোর ওজন ছিল প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ কেজি।

গবেষকদের ধারণা, কিছু শাবক অপরিণত অবস্থায় জন্ম নিতে পারে। মায়ের শারীরিক অবস্থা, পরিবেশগত চাপ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের সঙ্গে এ ধরনের মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে কোনো একটি কারণকে এখনো নিশ্চিতভাবে দায়ী করা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে ইএইচআরএ কাজ করছে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের হাতি বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ড্যানিয়েলা চুসিডের সঙ্গে।

২০২৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে এমন একটি গবেষণা প্রকল্পে হাতির মলের নমুনা সংগ্রহ করে ভারী ধাতু ও পিএফএএসের মতো স্থায়ী রাসায়নিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি থাইরয়েড ও কর্টিসল হরমোন বিশ্লেষণ করে তাদের শারীরবৃত্তীয় অবস্থা ও মানসিক চাপের সম্ভাব্য প্রভাব বোঝার চেষ্টা চলছে।

গবেষকেরা আরও জানতে চান, অন্য হাতির জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই হাতিদের মধ্যে অন্তঃপ্রজননের মাত্রা কেমন এবং বেঁচে থাকা ও মারা যাওয়া শাবকদের বংশগত বৈশিষ্ট্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না।

এসব গবেষণার ফল মরু হাতিদের প্রজনন, শাবকের বেঁচে থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

শোকের গল্পের আড়ালে বেঁচে থাকার আকুতি

জয়েস পুলের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি নামিবিয়া সরকারের দেওয়া শিকারের অনুমতিও মরু হাতিদের জন্য উদ্বেগের কারণ। তাঁর বক্তব্য, এই প্রাণীদের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাব কমাতে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ভেরোনেসির কাছে মৃত শাবক বহন করা মাদি হাতিটির আচরণ ছিল প্রায় মানবিক। তবে এই দৃশ্যকে কেবল মানুষের আবেগের সঙ্গে তুলনা করে দেখাই তাঁর ছবির একমাত্র বার্তা নয়। বরং প্রতিটি হাতির নিজস্ব জীবন, অভিজ্ঞতা ও কল্যাণের গুরুত্ব তুলে ধরাই তাঁর উদ্দেশ্য।

একটি মাদি হাতি কেন নিজের সন্তান নয়, এমন একটি মৃত শাবককে বারবার বহন করে—তার উত্তর হয়তো এখনই পাওয়া যাবে না। এটি শোকের বহিঃপ্রকাশ, হারানো সন্তানের স্মৃতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক, নাকি অন্য কোনো স্বাভাবিক আচরণ—তা জানতে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: মরুভূমির এই হাতিদের জীবন শুধু প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প নয়। তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সামাজিক বন্ধন, শেখা অভিজ্ঞতা এবং এমন কিছু আচরণ, যার অর্থ বুঝতে মানুষ এখনো চেষ্টা করছে।

যে মাদি হাতিটি নিজের শাবক হারানোর দুই বছর পরও অন্যের মৃত শাবক বহন করছে, তার আচরণ তাই গবেষকদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ রহস্য। আর সেই রহস্যের মধ্যেই উঠে এসেছে আরও বড় বাস্তবতা—পরিবেশগত সংকট, শাবকের মৃত্যু এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাতের কারণে বিপন্ন হয়ে পড়ছে মরুভূমির এই অনন্য হাতিরা।

ভেরোনেসির প্রত্যাশা, তাঁর ছবিগুলো মানুষকে হাতিদের অনুভূতি ও জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করবে। শুধু একটি প্রজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করাই নয়, প্রতিটি হাতির নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করাও যে সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সেই বার্তাই পৌঁছে দিতে চান তিনি।

কারণ, মরুভূমির ধুলোমাখা পথে মৃত শাবক বয়ে চলা হাতিটির ছবিতে শুধু মৃত্যুর বেদনা নেই; আছে প্রাণীদের অজানা অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা এবং তাদের বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষার তাগিদ।