ঢাকা ১২:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির খতিয়ান তলব, দুই আমলের অনিয়ম খুঁজছে সংসদীয় কমিটি ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প, বদলাতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি পর্তুগালের জার্সিতে রোনাল্ডোর পাঁচ রেকর্ড, ভাঙা কি অসম্ভব? রাতে দাঁতে তীব্র ব্যথা? চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে যা করবেন একাদশে ভর্তি শিক্ষার্থীদের অনলাইন নিবন্ধন শুরু ১২ নভেম্বর ভুটানকে হারিয়ে সাফ মিশন শুরু বাংলাদেশের ৭ নভেম্বর ছুটি পেলেন পোশাক শ্রমিকরা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবার পাবে ৫ লাখ টাকা, যেভাবে আবেদন করবেন শিশু-কিশোরদের মেধা-প্রতিভায় গড়ে উঠবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন, জামায়াতের সঙ্গে জোট ও বিস্তর অভিযোগ

গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা

৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প, বদলাতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি

জয়নাল আবেদিন
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:২৫:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মোংলা বন্দরকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বন্দরটির অবকাঠামো আধুনিকায়নে প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও জেটি নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুটি আধুনিক জেটি, প্রশস্ত কনটেইনার ইয়ার্ড, বিপজ্জনক পণ্য সংরক্ষণের পৃথক এলাকা এবং ৪৯টি ভারী ও আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি মোংলা থেকে উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোরে গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) মোংলা বন্দরের ৯ নম্বর জেটিতে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোংলা থেকে দেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত করিডোরভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে বন্দর, ইকোনমিক জোন, ইপিজেড ও শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়নের দীর্ঘদিনের একটি সীমাবদ্ধতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকলে শিল্পকারখানার উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের প্রত্যাশিত সম্প্রসারণ কঠিন। ফলে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কত দ্রুত সম্ভব হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক সুফল।

৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগে বদলাবে বন্দরের অবকাঠামো

চার বছর মেয়াদি প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক মানের কনটেইনারবাহী জাহাজ ভেড়ানোর উপযোগী দুটি আধুনিক জেটি নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি তৈরি হবে প্রশস্ত কনটেইনার ইয়ার্ড, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি পণ্যবাহী কনটেইনার সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা যাবে।

বিপজ্জনক ও রাসায়নিক পণ্য নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য পৃথক সুরক্ষিত জোন তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। কনটেইনার ওঠানো-নামানোর গতি বাড়াতে ক্রেনসহ মোট ৪৯টি ভারী ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ কর্তৃপক্ষ ও চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) চেয়ারম্যানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ অংশীদারত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও নির্মাণ-অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

তবে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ ও চুক্তি স্বাক্ষরই শেষ কথা নয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণের মান বজায় রাখা এবং প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। চার বছরের প্রকল্পে এসব বিষয় কতটা কঠোরভাবে তদারক করা হবে, তা বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার জন্য নির্ধারক হয়ে উঠবে।

কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বাড়বে সক্ষমতা

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের পরিচালন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। আধুনিক ক্রেন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি যুক্ত হলে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৩০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। বছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে ৪ লাখ টিইইউতে।

বর্তমানে বন্দর ব্যবহারে আমদানি-রপ্তানিকারকদের জন্য পণ্য খালাস, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। কনটেইনার ব্যবস্থাপনার গতি বাড়লে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানো এবং পণ্য পরিবহনের প্রক্রিয়া সহজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কমার পাশাপাশি বন্দরের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বাড়তে পারে।

তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন শুধু ক্রেন বা জেটির ওপর নির্ভর করবে না। পর্যাপ্ত জাহাজ চলাচল, নৌপথের নাব্যতা, দক্ষ জনবল, কাস্টমস কার্যক্রম এবং সড়ক-রেল যোগাযোগের সমন্বয়ও প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে সমান্তরাল উন্নয়ন না হলে নতুন অবকাঠামোর পুরো সক্ষমতা কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।

জ্বালানি সংকট কাটলেই কি শিল্পায়নের গতি বাড়বে?

মোংলা বন্দর ও আশপাশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা আলোচনায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, মোংলা অঞ্চলের শিল্পকারখানায় দ্রুত গ্যাস সংযোগ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মাঠপর্যায়ের অবকাঠামোগত কাজের নকশা চূড়ান্ত করেছে।

এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভারী শিল্প, হিমায়িত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে, যা নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘোষণা বাস্তবে কতটা দ্রুত কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কোন শিল্পাঞ্চলে কখন সংযোগ দেওয়া হবে, সরবরাহের সক্ষমতা কতটুকু এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে কী ধরনের অবকাঠামো তৈরি হবে—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীরা শুধু বন্দরের দূরত্ব নয়, জ্বালানি, যোগাযোগ, জমি ও সেবা অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতাও বিবেচনা করেন।

পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সংযোগ

মোংলা বন্দরের একটি বড় সম্ভাবনা হলো পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি পণ্য পরিবহনের সুযোগ। বন্দর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের জন্য বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি হতে পারে।

এতে শুধু মোংলা নয়, খুলনা ও বাগেরহাটসহ আশপাশের অঞ্চলের পরিবহন, গুদামজাতকরণ, শিপিং, সিএন্ডএফ এজেন্ট এবং অন্যান্য সেবামূলক খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের সময়, ব্যয় ও সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা, সঙ্গে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

বন্দর আধুনিকায়ন ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। শিপিং, পণ্য পরিবহন, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, গুদামজাতকরণ, সিএন্ডএফ কার্যক্রম, আবাসন ও স্থানীয় বাণিজ্যিক খাত এতে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম কতটা সম্প্রসারিত হয় তার ওপর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নকে বিচ্ছিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না। বন্দর, শিল্পাঞ্চল, জ্বালানি সরবরাহ, সড়ক যোগাযোগ এবং দক্ষ জনবল—সবকিছুকে একই অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

সব মিলিয়ে, প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্পটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করেছে। তবে প্রকল্পের সাফল্য শুধু দুটি জেটি নির্মাণ বা কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমাতে পারলেই মোংলা বন্দরকে ঘিরে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে। অন্যথায় বড় বিনিয়োগের পরও অবকাঠামোর পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা

৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প, বদলাতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:২৫:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

মোংলা বন্দরকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বন্দরটির অবকাঠামো আধুনিকায়নে প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও জেটি নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুটি আধুনিক জেটি, প্রশস্ত কনটেইনার ইয়ার্ড, বিপজ্জনক পণ্য সংরক্ষণের পৃথক এলাকা এবং ৪৯টি ভারী ও আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি মোংলা থেকে উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোরে গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) মোংলা বন্দরের ৯ নম্বর জেটিতে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোংলা থেকে দেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত করিডোরভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে বন্দর, ইকোনমিক জোন, ইপিজেড ও শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়নের দীর্ঘদিনের একটি সীমাবদ্ধতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকলে শিল্পকারখানার উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের প্রত্যাশিত সম্প্রসারণ কঠিন। ফলে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কত দ্রুত সম্ভব হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক সুফল।

৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগে বদলাবে বন্দরের অবকাঠামো

চার বছর মেয়াদি প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক মানের কনটেইনারবাহী জাহাজ ভেড়ানোর উপযোগী দুটি আধুনিক জেটি নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি তৈরি হবে প্রশস্ত কনটেইনার ইয়ার্ড, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি পণ্যবাহী কনটেইনার সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা যাবে।

বিপজ্জনক ও রাসায়নিক পণ্য নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য পৃথক সুরক্ষিত জোন তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। কনটেইনার ওঠানো-নামানোর গতি বাড়াতে ক্রেনসহ মোট ৪৯টি ভারী ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ কর্তৃপক্ষ ও চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) চেয়ারম্যানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ অংশীদারত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও নির্মাণ-অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

তবে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ ও চুক্তি স্বাক্ষরই শেষ কথা নয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণের মান বজায় রাখা এবং প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। চার বছরের প্রকল্পে এসব বিষয় কতটা কঠোরভাবে তদারক করা হবে, তা বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার জন্য নির্ধারক হয়ে উঠবে।

কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বাড়বে সক্ষমতা

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের পরিচালন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। আধুনিক ক্রেন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি যুক্ত হলে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৩০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। বছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে ৪ লাখ টিইইউতে।

বর্তমানে বন্দর ব্যবহারে আমদানি-রপ্তানিকারকদের জন্য পণ্য খালাস, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। কনটেইনার ব্যবস্থাপনার গতি বাড়লে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানো এবং পণ্য পরিবহনের প্রক্রিয়া সহজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কমার পাশাপাশি বন্দরের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বাড়তে পারে।

তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন শুধু ক্রেন বা জেটির ওপর নির্ভর করবে না। পর্যাপ্ত জাহাজ চলাচল, নৌপথের নাব্যতা, দক্ষ জনবল, কাস্টমস কার্যক্রম এবং সড়ক-রেল যোগাযোগের সমন্বয়ও প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে সমান্তরাল উন্নয়ন না হলে নতুন অবকাঠামোর পুরো সক্ষমতা কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।

জ্বালানি সংকট কাটলেই কি শিল্পায়নের গতি বাড়বে?

মোংলা বন্দর ও আশপাশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা আলোচনায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, মোংলা অঞ্চলের শিল্পকারখানায় দ্রুত গ্যাস সংযোগ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মাঠপর্যায়ের অবকাঠামোগত কাজের নকশা চূড়ান্ত করেছে।

এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভারী শিল্প, হিমায়িত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে, যা নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘোষণা বাস্তবে কতটা দ্রুত কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কোন শিল্পাঞ্চলে কখন সংযোগ দেওয়া হবে, সরবরাহের সক্ষমতা কতটুকু এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে কী ধরনের অবকাঠামো তৈরি হবে—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীরা শুধু বন্দরের দূরত্ব নয়, জ্বালানি, যোগাযোগ, জমি ও সেবা অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতাও বিবেচনা করেন।

পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সংযোগ

মোংলা বন্দরের একটি বড় সম্ভাবনা হলো পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি পণ্য পরিবহনের সুযোগ। বন্দর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে আমদানি-রপ্তানিকারকদের জন্য বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি হতে পারে।

এতে শুধু মোংলা নয়, খুলনা ও বাগেরহাটসহ আশপাশের অঞ্চলের পরিবহন, গুদামজাতকরণ, শিপিং, সিএন্ডএফ এজেন্ট এবং অন্যান্য সেবামূলক খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের সময়, ব্যয় ও সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা, সঙ্গে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

বন্দর আধুনিকায়ন ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। শিপিং, পণ্য পরিবহন, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, গুদামজাতকরণ, সিএন্ডএফ কার্যক্রম, আবাসন ও স্থানীয় বাণিজ্যিক খাত এতে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম কতটা সম্প্রসারিত হয় তার ওপর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নকে বিচ্ছিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না। বন্দর, শিল্পাঞ্চল, জ্বালানি সরবরাহ, সড়ক যোগাযোগ এবং দক্ষ জনবল—সবকিছুকে একই অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

সব মিলিয়ে, প্রায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্পটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করেছে। তবে প্রকল্পের সাফল্য শুধু দুটি জেটি নির্মাণ বা কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমাতে পারলেই মোংলা বন্দরকে ঘিরে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে। অন্যথায় বড় বিনিয়োগের পরও অবকাঠামোর পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।