রাড্ডা ক্লিনিকে হামলার নেপথ্যে নারী এমপি? উঠছে নানা প্রশ্ন

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৩৭:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩১ বার পড়া হয়েছে
মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিক—দীর্ঘদিন ধরে অস্বচ্ছল মানুষের চিকিৎসার একটি আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। সেই ক্লিনিকেই বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাতে কয়েক শ মুখোশধারী দুর্বৃত্তের হামলার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা হামলায় ভবন ভাঙচুরের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি লুটের অভিযোগও রয়েছে।
ঘটনার দুই দিন পরও ক্লিনিকের সামনে ঝুলছে ‘সমবায় দোকানদার সমিতি’-এর নামে একটি ব্যানার। হামলার ধরন এবং জায়গা দখলের পূর্বের চেষ্টা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিছক ভাঙচুর, নাকি এর পেছনে রয়েছে জমি বা স্থাপনা দখলের কোনো পরিকল্পনা—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, হামলার খবর পাওয়ার পরও ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা পুলিশ কেন তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি?
তিন ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর, কোথায় ছিল পুলিশ?
ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, মুখোশধারীরা দলবদ্ধভাবে ক্লিনিকে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলা দীর্ঘ সময় ধরে চললেও পুলিশ কার্যকরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়নি।
ঘটনাস্থল শাহ আলী থানার আওতাধীন। ক্লিনিকটি থানার কাছাকাছি হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
শনিবার বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, থানার এক কিলোমিটারের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটায় পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে।
অভিযোগের তীর নারী এমপির দিকে
হামলার পেছনে স্থানীয় সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য জান্নাত ফেরদৌস মিষ্টির মদদ থাকার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।
তাদের দাবি, ‘সমবায় দোকানদার সমিতি’র নাম ব্যবহার করে এর আগেও জায়গাটি দখলের চেষ্টা করা হয়েছিল। এবারও একই ধরনের ব্যানার ঘটনাস্থলে দেখা যাওয়ায় হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
তবে নারী এমপির বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘দলের নাম ব্যবহার করে কেউ ছাড় পাবে না’
ঘটনাটিকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শাহ আলী থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন মশু বলেন, এ ঘটনায় বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
অর্থাৎ হামলাকারীরা কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে থাকলে, সেই পরিচয়ই এখন তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্ষতি প্রায় দুই কোটি টাকা
ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলায় প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হয়েছে।
রাড্ডা ক্লিনিকের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আক্তার বলেন, তারা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কাজ করেন এবং ঘটনার পর তারা হতবাক। কারও বিষয়ে যথাযথভাবে না জেনে মন্তব্য করতেও তিনি সতর্ক থাকার কথা বলেন।
তার বক্তব্যে ফুটে উঠেছে হামলার পর ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের অসহায় পরিস্থিতির চিত্র।
চারজন গ্রেপ্তার, আরও যারা?
ঘটনায় ইতোমধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ডিএমপি কমিশনার জানিয়েছেন, মামলায় যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি যে রাজনৈতিক পরিচয়েরই হোক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এখন তদন্তের বড় প্রশ্ন—গ্রেপ্তার চারজনের সঙ্গে হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের কোনো যোগসূত্র আছে কি না এবং এত বড় একটি দল কীভাবে কয়েক ঘণ্টা ধরে একটি ক্লিনিকে হামলা চালানোর সুযোগ পেল?
অর্ধশতাব্দীর বেশি সেবা, এখন ধ্বংসস্তূপ
রাড্ডা ক্লিনিকটি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে মানুষের সেবা দিয়ে আসছে। অস্বচ্ছল মানুষের চিকিৎসার সুযোগ করে দেওয়া প্রতিষ্ঠানটির ওপর এমন হামলা শুধু একটি ভবনের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চিকিৎসাসেবা পাওয়া মানুষের স্বার্থও।
তবু হামলার পরও সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। শনিবার ক্লিনিকের পক্ষ থেকে অস্থায়ী ক্যাম্প বসিয়ে টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়েছে।
তদন্তেই মিলবে আসল উত্তর
রাড্ডা ক্লিনিকের ঘটনায় এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে—হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল? ‘সমবায় দোকানদার সমিতি’র ব্যানার সেখানে কেন? আগেও কি জায়গাটি দখলের চেষ্টা হয়েছিল? হামলার খবর পাওয়ার পর পুলিশ কেন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেনি? পুলিশের গাফিলতি থাকলে দায় কার? গ্রেপ্তার চারজনের পেছনে আর কারা রয়েছে? আর নারী এমপির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে হামলার কোনো বাস্তব যোগসূত্র আছে কি না?























