রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ৫ দফা প্রস্তাব, জাতিসংঘে তারেক রহমানের জোরালো আহ্বান

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:২৯:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে এবার একটি নির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য আন্তর্জাতিক রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর প্রস্তাবের কেন্দ্রে রয়েছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই সংকটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
পাঁচ দফায় যে প্রস্তাব
প্রধানমন্ত্রীর প্রথম প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সমন্বয়ে দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, নিজভূমিতে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না হলে প্রত্যাবাসনের প্রতি আস্থা ফিরবে না।
তৃতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
চতুর্থ প্রস্তাবে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলেছেন তিনি। গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
পঞ্চম প্রস্তাবে মাদক, মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসন, অবৈধ অস্ত্র ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
‘সংকটের শুরু মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানে’
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই দায়িত্ব অনির্দিষ্টকাল বাংলাদেশের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে শিবিরগুলোতে নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার পাশাপাশি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
তবে শিবিরগুলো দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সমাধান নয় বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, বছরের পর বছর এই পরিস্থিতি চলতে থাকায় বাংলাদেশ এবং কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে।
মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়েও উদ্বেগ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংকট দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে প্রয়োজন বাড়লেও সহায়তার পরিমাণ কমছে। ফলে শুধু ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ছে।
মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সংকটের রাজনৈতিক সমাধানে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে ছিল—মানবিক সহায়তা দিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা জরুরি, কিন্তু সেটি যেন স্থায়ী সমাধানের পথে রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার কারণ না হয়।
রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা সেখানে নির্বিচার আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম, জোরপূর্বক নিয়োগসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে রয়েছে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
সবশেষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর আহ্বান ছিল, রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল মানবিক সহায়তার বিষয় হিসেবে না দেখে এর মূল কারণ ও রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তাঁর ভাষায়, এখন প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে যাওয়ার সময়।





















