অবহেলা-দখলে সৌন্দর্য হারাচ্ছে পতেঙ্গা
সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রে ভোগান্তির ছায়া

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৩:১০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রাম নগরবাসীর অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত। প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার মানুষ এখানে আসেন সমুদ্রের গর্জন, ঢেউ আর সূর্যাস্ত উপভোগ করতে। ছুটির দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কিন্তু পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত দোকানপাট ও নিরাপত্তাহীনতায় সৌন্দর্য হারাচ্ছে দেশের অন্যতম পরিচিত এই সৈকত।
কর্ণফুলী টানেল, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, নেভাল একাডেমি, আউটার রিং রোড ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় অবকাঠামো গড়ে উঠলেও পতেঙ্গা সৈকতের পর্যটন সুবিধার উন্নয়ন হয়নি আশানুরূপ। ফলে দর্শনার্থীদের জন্য আনন্দের জায়গাটি অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠছে ভোগান্তির কারণ।
দর্শনার্থীদের জায়গা দখলে দোকান
সরেজমিনে দেখা গেছে, সৈকতের মূল সৌন্দর্য উপভোগের জায়গাগুলো দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অস্থায়ী দোকান। বাঁশ, ত্রিপল ও টিন দিয়ে তৈরি এসব দোকান অনেক জায়গায় কয়েক স্তরে বসানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের হাঁটার পথ সংকুচিত হয়ে গেছে চেয়ার-টেবিল ও দোকানের কারণে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্মিত রেলিংয়ের পাশেও বসানো হয়েছে খাবারের দোকান, ছাতা ও বসার ব্যবস্থা। ফলে সমুদ্র দেখার জন্য নির্ধারিত স্থানও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক দখলে চলে গেছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, পরিবার নিয়ে সৈকতে ঘুরতে আসা মানুষ অনেক সময় দোকানিদের হয়রানির শিকার হন। খাবারের দোকানে নেই নির্ধারিত মূল্যতালিকা, নেই মান নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা।
ময়লা-আবর্জনায় নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ
সৈকতের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেটসহ নানা ধরনের বর্জ্য। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।
পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে বর্জ্য জমতে থাকলে শুধু সৈকতের সৌন্দর্য নয়, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
রাত নামলেই বাড়ে অনিরাপত্তা
দিনের বেলায় মানুষের ভিড় থাকলেও সন্ধ্যার পর বদলে যায় পতেঙ্গার চিত্র। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় অনেক স্থান অন্ধকারে ডুবে থাকে। বিভিন্ন স্থানে লাইট পোস্ট থাকলেও অনেক বাতি নষ্ট, সৌরবিদ্যুতের প্যানেলও অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত বাড়লে ছিনতাই, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ে। ২০২৫ সালের মার্চে মাদকসেবনে বাধা দেওয়ায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছিল বলে জানা গেছে।
নেই পর্যটনবান্ধব সুযোগ-সুবিধা
পতেঙ্গায় এখনও পর্যটকদের জন্য উন্নতমানের আবাসিক হোটেল, আধুনিক কিডস জোন, নিরাপদ রাইড, পর্যাপ্ত শৌচাগার, পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা কিংবা সুপেয় পানির পর্যাপ্ত সুবিধা নেই।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক পর্যটক সন্ধ্যার পর বাধ্য হয়ে ফিরে যান। পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়।
নাটোর থেকে আসা এক পর্যটক বলেন, “জায়গাটি খুব সুন্দর, কিন্তু ভালো খাবার, টয়লেট, নিরাপত্তা ও পর্যটন সুবিধার অভাবে ভোগান্তি হয়। প্রশাসনের আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন।”
দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
সৈকত এলাকায় অবৈধ দোকানপাট ও বিভিন্ন ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দখল বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলেও তারা তা অস্বীকার করেছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, পার্কিং, ফটোগ্রাফি, চার চাকার মোটরবাইক ও বিভিন্ন ভাসমান ব্যবসা নিয়েও অনিয়ম রয়েছে।
রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত সরকার
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চট্টগ্রাম হোটেল সৈকতের ব্যবস্থাপক আবুল হাসনাত মোহাম্মদ হাবীবুল বারী বলেন, পতেঙ্গা সৈকত থেকে তারা এখন পর্যন্ত কোনো রাজস্ব পাননি। তার মতে, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও বিনিয়োগ করা গেলে এখান থেকে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় সম্ভব।
পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক ওয়াটারফ্রন্ট, ফাইভ-স্টার হোটেল, রিসোর্ট, থিম পার্ক, ফুড কোর্ট, মেরিনা ও ওয়াটার স্পোর্টস জোন গড়ে তোলা গেলে পতেঙ্গা আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
তিন সংস্থার সমন্বয়হীনতা
পতেঙ্গা সৈকতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও সিডিএর মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে টানাপোড়েন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তিন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাঝেও সৈকত রয়ে গেছে অপরিকল্পিত।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, পতেঙ্গা সিটি করপোরেশনের আওতাধীন নয়। এটি জেলা প্রশাসন ও সিডিএ পরিচালনা করছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শরীফ উদ্দিন জানান, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়ে দ্রুত বৈঠক করে সৈকতের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, সৈকতকে বিদেশের মতো পর্যটনবান্ধব করতে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পতেঙ্গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভৌগোলিক অবস্থান এটিকে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। তবে দখল, অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে সেই সম্ভাবনা অধরাই থেকে যাবে।
























