কাজের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পাড়ি, বাড়ছে প্রতারণা ও মানব পাচার

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:০৭:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
বিদেশে চাকরির আশায় বাংলাদেশি কর্মীদের ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ গন্তব্যে যাত্রা থামছে না। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চাকরির প্রলোভনে প্রতারণার শিকার হওয়ার পাশাপাশি রাশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশেও গিয়ে অনেক কর্মী বিপদে পড়ছেন। প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরে কেউ মানব পাচারের মামলা করছেন, আবার বিদেশে নিহত প্রবাসীর পরিবারও আইনের আশ্রয় নিচ্ছে। ফলে প্রতিবছর বাড়ছে মানব পাচারের মামলা।
বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। অদক্ষ শ্রমিকদের বড় অংশ সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গেলেও আরব আমিরাত, ওমান, মালয়েশিয়া ও বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে কর্মী যাওয়া কমে গেছে বা বন্ধ রয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোতেও কাঙ্ক্ষিত হারে কর্মী যেতে পারছেন না। ফলে অনেকে রাশিয়া, কম্বোডিয়াসহ তুলনামূলক অনিরাপদ গন্তব্যের দিকে ঝুঁকছেন।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন ১২ হাজার ২৬৩ জন বাংলাদেশি। ওই বছর বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারে দেশটির অবস্থান ছিল অষ্টম। রাশিয়ান ফেডারেশনে গেছেন ৪ হাজার ৭২৭ জন, অবস্থান ছিল ১৩তম। অথচ রাশিয়া কখনোই বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার ছিল না।
এদিকে সামগ্রিকভাবে বিদেশে কর্মী যাওয়া কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ কর্মী বিদেশ যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ছাড়পত্র কমেছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার।
রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরীর মতে, আরব আমিরাত ও কাতারের শ্রমবাজার সংকুচিত এবং মালয়েশিয়ার বাজার বন্ধ। দেশের ভেতরেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকে যেকোনো উপায়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আর এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে প্রতারক ও মানব পাচারকারীরা।
পাঁচ দেশের ওপরই নির্ভরতা
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানো শুরু হয় ১৯৭৬ সালে। নব্বইয়ের দশক থেকে এ প্রবাহ দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ১০ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ১৩ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে পাড়ি জমান।
তবে এত বড় সংখ্যার কর্মী গেলেও শ্রমবাজার এখনো গুটিকয়েক দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ বছরে ২০৩টি দেশে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো হয়েছে। এ সময়ে বিদেশে যাওয়া ১ কোটি ১০ লাখের বেশি কর্মীর প্রায় ৭৯ শতাংশই গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। আর প্রায় ৯৪ শতাংশ কর্মী গেছেন ১০টি দেশে।
শীর্ষ শ্রমবাজারগুলোর তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইন ও মালদ্বীপ। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিদেশগামী কর্মীদের প্রধান গন্তব্য প্রায় পুরোপুরিই এশিয়াকেন্দ্রিক। অথচ ১৫ বছরে ৯৮টি দেশে ১০০ জন করেও কর্মী পাঠানো সম্ভব হয়নি।
বন্ধ হচ্ছে বড় শ্রমবাজার
মালয়েশিয়ায় ২০২৩ সালে সাড়ে তিন লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী গিয়েছিলেন। অনিয়মের অভিযোগে ২০২৪ সালের জুনে দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। ওমানে ২০২৩ সালে সোয়া লাখের বেশি কর্মী গেলেও ২০২৪ সাল থেকে বাজারটি কার্যত বন্ধ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতেও কর্মী যাওয়া দ্রুত কমেছে। ২০২৩ সালে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি সেখানে গেলেও ২০২৪ সালে সংখ্যা নেমে আসে ৪৭ হাজারে। ২০২৫ সালে গেছে মাত্র ১৩ হাজার ৭৫০ জন। বাহরাইনেও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ সীমিত।
এর বিপরীতে কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের গন্তব্য। ২০২৪ সালে সোয়া ছয় লাখের বেশি বাংলাদেশি সেখানে গেলেও ২০২৫ সালে সংখ্যা বেড়ে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ছাড়ায়। তবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গেছেন প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার। অর্থাৎ এখানেও কর্মী যাওয়ার গতি কমছে।
রাশিয়া-কম্বোডিয়ায় নতুন ঝুঁকি
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের একটি অংশকে চাকরির কথা বলে নিয়ে গিয়ে স্ক্যাম সেন্টারে কাজে বাধ্য করা হচ্ছে। রাশিয়ায় যাওয়ার পর কেউ কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে পড়ছেন। কেউ পালিয়ে দেশে ফিরতে পারলেও অনেকে সেখানে প্রাণ হারাচ্ছেন। আবার অনেকে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে পরিবারের কাছে বার্তা পাঠাচ্ছেন।
ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। উন্নত জীবনের আশায় বিভিন্ন দেশ ঘুরে বাংলাদেশিরা লিবিয়ায় যাচ্ছেন। সেখানে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মুক্তিপণ দিতে হচ্ছে অনেককে। এরপর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন, আবার কেউ ইতালিতে পৌঁছাতে পারছেন।
২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছেছেন বিভিন্ন দেশের ৬৬ হাজার ৩১৬ জন। এ পথে নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১২৬ জন। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত একই পথে ইতালিতে গেছেন ১৪ হাজার ১৯৪ জন। তাঁদের মধ্যে ৩২ শতাংশই বাংলাদেশি—সংখ্যায় ৩ হাজার ৬৯১ জন।
মামলার সংখ্যা বাড়লেও শাস্তি কম
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানব পাচারবিরোধী ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৫৩৬টি মামলায় ১ হাজার ৬৫৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৩৫৩ জনকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য আরও উদ্বেগজনক। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে করা ৪ হাজার ৪২৭টি মামলায় ৯৪ থেকে ৯৫ শতাংশ আসামি খালাস পেয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাচারকারীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
এজেন্সি বাড়ছে, নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
অভিবাসন খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে ১৯২টি, পাকিস্তানে ৪৬৪টি, নেপালে ৪১৬টি এবং শ্রীলঙ্কায় ২৪৮টি। বাংলাদেশে একসময় এজেন্সির সংখ্যা ৮৫০ থেকে ৯০০টির মধ্যে থাকলেও বর্তমানে লাইসেন্সধারী এজেন্সির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪৬টিতে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক এজেন্সির ওপর কার্যকর নজরদারি কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই নিয়মতান্ত্রিকভাবে এ সংখ্যা কমিয়ে আনার পাশাপাশি প্রতিটি নিয়োগপত্র ও বিদেশি নিয়োগদাতার তথ্য কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
গত জুলাইয়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনিয়ম ও দুর্নীতির মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে সরকার।
ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর পাশাপাশি প্রতারণা ও ভোগান্তি কমানো এবং দক্ষ কর্মীদের আন্তর্জাতিক সনদ পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক জানিয়েছেন, পুরোনো শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নতুন বাজার খোঁজার কাজ চলছে। ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো সংকুচিত বাজারগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে আলোচনা চলছে।
তবে অভিবাসন খাত বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের প্রশ্ন, যেসব দেশের নিয়োগপত্র ঠিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে কেন। তাঁর মতে, রাশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্যে কর্মী পাঠানোর আগে সরকারের কঠোর যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। গত পাঁচ অর্থবছরে বাংলাদেশিরা বছরে গড়ে ২ হাজার ৬৪৯ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়েছেন। তাই শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

























