ঢাকা ১১:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শূকরের কিডনিতে ৯ মাস বাঁচলেন বৃদ্ধ, এরপর মানব-কিডনি

বাংলা টাইমস ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:১৩:৫১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

মানব শরীরে শূকরের কিডনি- ছবি: এআই

বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কিডনি বিকল হয়ে ডায়ালিসিসের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন ৬৬ বছর বয়সী টিম অ্যান্ড্রুজ। উপযুক্ত মানব-কিডনির অপেক্ষায় থাকা এই মার্কিন নাগরিকের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল জিন-পরিবর্তিত শূকরের কিডনি। অবিশ্বাস্যভাবে সেই কিডনি তাঁকে ২৭১ দিন ডায়ালিসিস ছাড়াই বাঁচিয়ে রাখে। পরে শূকরের কিডনি সরিয়ে তাঁর শরীরে সফলভাবে মানব-কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল ও গবেষকদের এই চিকিৎসার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ। গবেষকদের মতে, ঘটনাটি শুধু দীর্ঘ সময় শূকরের কিডনি কাজ করার কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং এটি দেখিয়েছে, ভবিষ্যতে মানব-কিডনির অপেক্ষায় থাকা রোগীদের জন্য জিন-পরিবর্তিত শূকরের কিডনি একটি ‘সেতু’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

কীভাবে শুরু হয়েছিল চিকিৎসা?

এন্ড-স্টেজ কিডনি ডিজিজে আক্রান্ত অ্যান্ড্রুজের কিডনির কার্যক্ষমতা প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। উপযুক্ত মানবদাতা না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর নিয়মিত ডায়ালিসিস প্রয়োজন ছিল।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে জিন-পরিবর্তিত ইউকাটান মিনিয়েচার পিগের কিডনি প্রতিস্থাপন করেন। পরীক্ষামূলক এই চিকিৎসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) ‘এক্সপ্যান্ডেড অ্যাক্সেস ইনভেস্টিগেশনাল নিউ ড্রাগ’ ব্যবস্থার আওতায়।

অস্ত্রোপচারের পর শূকরের কিডনিটি দ্রুত কাজ শুরু করে। ফলে প্রায় নয় মাস তাঁকে ডায়ালিসিস নিতে হয়নি।

তবে ২৭১ দিন পর কিডনিটির কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করে। পরীক্ষায় অঙ্গটির রক্তনালিতে ক্ষত ও প্রদাহের লক্ষণ পাওয়া যায়। এর আগে সংক্রমণের কারণে তাঁর ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধের মাত্রাও কমিয়ে দিতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত শূকরের কিডনিটি অপসারণ করে তাঁকে আবার ডায়ালিসিসে ফিরতে হয়।

এরপর শরীরে বসানো হলো মানব-কিডনি

চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব আসে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। মৃতদাতার একটি মানব-কিডনি অ্যান্ড্রুজের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। নতুন কিডনিটি অস্ত্রোপচারের পরপরই কাজ শুরু করে।

গবেষকদের জন্য আশাব্যঞ্জক বিষয় ছিল, আগের শূকরের কিডনি তাঁর শরীরে এমন কোনো প্রতিরোধ তৈরি করেনি, যা নতুন মানব-কিডনি প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে শূকর থেকে মানুষের শরীরে কোনো ক্ষতিকর জীবাণু সংক্রমণের প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

সাধারণ শূকরের কিডনি নয়

এখানে ‘শূকরের কিডনি’ বলতে সাধারণ শূকরের অঙ্গ বোঝালে ভুল হবে। মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের উপযোগী করতে কিডনিটি বহনকারী শূকরের জিনে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শূকরের অঙ্গকে বিদেশি বস্তু হিসেবে শনাক্ত করে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এই সমস্যা কমাতেই বিজ্ঞানীরা জিনগত পরিবর্তন করেন।

অ্যান্ড্রুজের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কিডনিতে ৬৯টি জিনগত পরিবর্তন করা হয়েছিল। মানুষের শরীরে তীব্র প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে—এমন তিন ধরনের অ্যান্টিজেন সরিয়ে দেওয়া হয়। মানবদেহের সঙ্গে অঙ্গটির সামঞ্জস্য বাড়াতে সাতটি মানব জিন যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি শূকর থেকে মানুষের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা কমাতে কিছু ভাইরাস-সম্পর্কিত জিন নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল।

কেন ২৭১ দিন এত গুরুত্বপূর্ণ?

মানুষের শরীরে জিন-পরিবর্তিত শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের গবেষণা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল প্রথম জীবিত মানুষের শরীরে এমন কিডনি প্রতিস্থাপন করেছিল। ওই রোগী ৫২ দিন বেঁচেছিলেন এবং মৃত্যুর সময়ও শূকরের কিডনিটি কাজ করছিল।

সেই তুলনায় অ্যান্ড্রুজের ক্ষেত্রে ২৭১ দিন ডায়ালিসিস ছাড়া থাকা বড় ধরনের অগ্রগতি।

তবে এর অর্থ এই নয় যে শূকরের কিডনি এখনই মানব-কিডনির বিকল্প হয়ে গেছে। বরং এই ঘটনা গবেষকদের সামনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে—কীভাবে কিডনিটির কার্যক্ষমতা আরও দীর্ঘ করা যাবে, কতটা ইমিউনোসাপ্রেশন প্রয়োজন হবে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কীভাবে আরও কমানো সম্ভব।

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন আরও বড় গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল।

তবু অ্যান্ড্রুজের ঘটনা কিডনি প্রতিস্থাপনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। মানব-কিডনির অপেক্ষায় থাকা রোগীর জন্য জিন-পরিবর্তিত শূকরের কিডনি হয়তো শেষ সমাধান নয়, তবে প্রয়োজনের সময়টুকু পার করে দেওয়ার একটি ‘সেতু’ হয়ে উঠতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

শূকরের কিডনিতে ৯ মাস বাঁচলেন বৃদ্ধ, এরপর মানব-কিডনি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:১৩:৫১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কিডনি বিকল হয়ে ডায়ালিসিসের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন ৬৬ বছর বয়সী টিম অ্যান্ড্রুজ। উপযুক্ত মানব-কিডনির অপেক্ষায় থাকা এই মার্কিন নাগরিকের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল জিন-পরিবর্তিত শূকরের কিডনি। অবিশ্বাস্যভাবে সেই কিডনি তাঁকে ২৭১ দিন ডায়ালিসিস ছাড়াই বাঁচিয়ে রাখে। পরে শূকরের কিডনি সরিয়ে তাঁর শরীরে সফলভাবে মানব-কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল ও গবেষকদের এই চিকিৎসার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ। গবেষকদের মতে, ঘটনাটি শুধু দীর্ঘ সময় শূকরের কিডনি কাজ করার কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং এটি দেখিয়েছে, ভবিষ্যতে মানব-কিডনির অপেক্ষায় থাকা রোগীদের জন্য জিন-পরিবর্তিত শূকরের কিডনি একটি ‘সেতু’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

কীভাবে শুরু হয়েছিল চিকিৎসা?

এন্ড-স্টেজ কিডনি ডিজিজে আক্রান্ত অ্যান্ড্রুজের কিডনির কার্যক্ষমতা প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। উপযুক্ত মানবদাতা না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর নিয়মিত ডায়ালিসিস প্রয়োজন ছিল।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে জিন-পরিবর্তিত ইউকাটান মিনিয়েচার পিগের কিডনি প্রতিস্থাপন করেন। পরীক্ষামূলক এই চিকিৎসার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) ‘এক্সপ্যান্ডেড অ্যাক্সেস ইনভেস্টিগেশনাল নিউ ড্রাগ’ ব্যবস্থার আওতায়।

অস্ত্রোপচারের পর শূকরের কিডনিটি দ্রুত কাজ শুরু করে। ফলে প্রায় নয় মাস তাঁকে ডায়ালিসিস নিতে হয়নি।

তবে ২৭১ দিন পর কিডনিটির কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করে। পরীক্ষায় অঙ্গটির রক্তনালিতে ক্ষত ও প্রদাহের লক্ষণ পাওয়া যায়। এর আগে সংক্রমণের কারণে তাঁর ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধের মাত্রাও কমিয়ে দিতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত শূকরের কিডনিটি অপসারণ করে তাঁকে আবার ডায়ালিসিসে ফিরতে হয়।

এরপর শরীরে বসানো হলো মানব-কিডনি

চিকিৎসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব আসে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। মৃতদাতার একটি মানব-কিডনি অ্যান্ড্রুজের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। নতুন কিডনিটি অস্ত্রোপচারের পরপরই কাজ শুরু করে।

গবেষকদের জন্য আশাব্যঞ্জক বিষয় ছিল, আগের শূকরের কিডনি তাঁর শরীরে এমন কোনো প্রতিরোধ তৈরি করেনি, যা নতুন মানব-কিডনি প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে শূকর থেকে মানুষের শরীরে কোনো ক্ষতিকর জীবাণু সংক্রমণের প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

সাধারণ শূকরের কিডনি নয়

এখানে ‘শূকরের কিডনি’ বলতে সাধারণ শূকরের অঙ্গ বোঝালে ভুল হবে। মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের উপযোগী করতে কিডনিটি বহনকারী শূকরের জিনে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শূকরের অঙ্গকে বিদেশি বস্তু হিসেবে শনাক্ত করে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এই সমস্যা কমাতেই বিজ্ঞানীরা জিনগত পরিবর্তন করেন।

অ্যান্ড্রুজের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কিডনিতে ৬৯টি জিনগত পরিবর্তন করা হয়েছিল। মানুষের শরীরে তীব্র প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে—এমন তিন ধরনের অ্যান্টিজেন সরিয়ে দেওয়া হয়। মানবদেহের সঙ্গে অঙ্গটির সামঞ্জস্য বাড়াতে সাতটি মানব জিন যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি শূকর থেকে মানুষের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা কমাতে কিছু ভাইরাস-সম্পর্কিত জিন নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল।

কেন ২৭১ দিন এত গুরুত্বপূর্ণ?

মানুষের শরীরে জিন-পরিবর্তিত শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের গবেষণা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল প্রথম জীবিত মানুষের শরীরে এমন কিডনি প্রতিস্থাপন করেছিল। ওই রোগী ৫২ দিন বেঁচেছিলেন এবং মৃত্যুর সময়ও শূকরের কিডনিটি কাজ করছিল।

সেই তুলনায় অ্যান্ড্রুজের ক্ষেত্রে ২৭১ দিন ডায়ালিসিস ছাড়া থাকা বড় ধরনের অগ্রগতি।

তবে এর অর্থ এই নয় যে শূকরের কিডনি এখনই মানব-কিডনির বিকল্প হয়ে গেছে। বরং এই ঘটনা গবেষকদের সামনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে—কীভাবে কিডনিটির কার্যক্ষমতা আরও দীর্ঘ করা যাবে, কতটা ইমিউনোসাপ্রেশন প্রয়োজন হবে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কীভাবে আরও কমানো সম্ভব।

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন আরও বড় গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল।

তবু অ্যান্ড্রুজের ঘটনা কিডনি প্রতিস্থাপনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। মানব-কিডনির অপেক্ষায় থাকা রোগীর জন্য জিন-পরিবর্তিত শূকরের কিডনি হয়তো শেষ সমাধান নয়, তবে প্রয়োজনের সময়টুকু পার করে দেওয়ার একটি ‘সেতু’ হয়ে উঠতে পারে।