জন্মের পরই মিলবে একক পরিচয়পত্র, ২০২৬-৩১ মেয়াদে ‘এক-আইডি’ প্রকল্প
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:২০:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৯ বার পড়া হয়েছে
দেশের সব নাগরিককে জন্মের পর থেকেই একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা ‘এক-আইডি’ নামের এই পরিচয়পত্র দিয়েই ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা থেকে শুরু করে সরকারি বিভিন্ন সেবা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স (ডি-স্টার)’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। অনুমোদনের প্রক্রিয়ার জন্য প্রকল্প প্রস্তাব ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
জন্মনিবন্ধনের পরই নতুন পরিচয়
বর্তমানে জন্মের পর শিশুদের জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হয়। ১৮ বছর বয়সে তারা জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পায়। প্রস্তাবিত ‘এক-আইডি’ ব্যবস্থায় জন্মের পরই প্রত্যেক নাগরিককে একটি পরিচয়পত্র দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, দেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের পরিচয়পত্র থাকলেও সেগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। কারও একাধিক জন্মনিবন্ধন বা পাসপোর্ট থাকার মতো ঘটনাও ঘটে।
তিনি বলেন, নতুন পরিচয়পত্রটি হবে একক ও স্থায়ী। এর মাধ্যমে নাগরিককে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে একই তথ্য বারবার দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
এনআইডি, ফ্যামিলি কার্ডের সেবাও এক কার্ডে?
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ বলছে, এক-আইডি চালু হলে ধীরে ধীরে বিদ্যমান বিভিন্ন কার্ডের কার্যকারিতা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এনআইডি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো কার্ডের সেবাগুলো নতুন পরিচয়পত্রের মাধ্যমে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
তবে কোন কার্ডের কোন সেবা কীভাবে এক-আইডির আওতায় আসবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ নতুন ব্যবস্থার ধারণাকে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ একজন নাগরিকের একটি ডিজিটাল পরিচয় থাকবে, যার মাধ্যমে পরিচয় যাচাইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধাও দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০ কোটি কার্ড তৈরির পরিকল্পনা
প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে দেশের ১৮ কোটি নাগরিকের জন্য পরিচয়পত্র তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে উৎপাদন ও মুদ্রণের জন্য কার্ড ধরা হয়েছে ২০ কোটি।
প্রতিটি পলিকার্বোনেট চিপ কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ ডলার বা প্রায় ২৪৬ টাকা। এর সঙ্গে বিতরণ ও সরবরাহ ব্যয় ১ ডলার বা প্রায় ১২৩ টাকা। সব মিলিয়ে একটি কার্ডে খরচ হবে প্রায় ৩৬৯ টাকা।
প্রকল্প ব্যয় ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা
‘ডি-স্টার’ প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে আসার কথা রয়েছে।
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয় হবে কার্ড উৎপাদন, মুদ্রণ, বায়োমেট্রিক তথ্য—বিশেষ করে আঙুলের ছাপ—সংগ্রহ এবং কার্ড বিতরণে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
একাধিক তথ্যভান্ডারের সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন
দেশে বর্তমানে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও টিআইএনসহ বিভিন্ন পরিচয়পত্র ও নম্বর চালু রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রকল্পের আগে এসব বিদ্যমান তথ্যভান্ডারের মধ্যে কার্যকর আন্তসংযোগ তৈরি করা গেলে একই নাগরিকের তথ্য বারবার সংগ্রহের প্রয়োজন কমানো সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রকেই একক পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ১৮ বছরের কম বয়সীদেরও এর আওতায় আনা সম্ভব। নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
ব্যয়ের চাপ নিয়ে প্রশ্ন
সরকারের আর্থিক চাপের মধ্যে ‘এক-আইডি’ প্রকল্পের বড় অঙ্কের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের বিভিন্ন কার্ড চালুর উদ্যোগের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড তৈরিতে ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা এবং কৃষক কার্ডে ৬৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, ‘এক-আইডি’ প্রকল্পটি পাঁচ বছর ধরে বাস্তবায়িত হবে। ফলে পুরো সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, নাগরিকের পরিচয় ও সরকারি সেবার তথ্যকে একটি অভিন্ন ব্যবস্থায় আনার লক্ষ্যেই প্রস্তাবিত ‘এক-আইডি’ প্রকল্প। তবে এর বাস্তবায়ন কাঠামো, বিদ্যমান কার্ডগুলোর ভবিষ্যৎ এবং নাগরিকের তথ্যের নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো বাকি।




















