বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস: সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব কোথায়?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৪:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাস পার করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে প্রথম দিনেই সরকার তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছিল—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা।
১৮০ দিন পর প্রশ্ন উঠছে, সেই অগ্রাধিকারগুলোতে কতটা এগোতে পেরেছে সরকার?
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বড় অংশই বাস্তবায়নের পথে। তবে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি—এই কয়েকটি খাতে মানুষের অসন্তোষ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
মানুষের নজরে ইতিবাচক কী?
সরকারের প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার উদ্যোগ হিসেবে এগুলোকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কয়েকটি সিদ্ধান্ত প্রশংসা পেয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ট্যাক্সমুক্ত গাড়ির সুবিধা না নেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় খরচ কমানোর মতো পদক্ষেপকে এর উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।
তবে এসব উদ্যোগের সুফল কতটা বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আইনশৃঙ্খলায় স্বস্তি আসেনি
সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে আছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই মব ভায়োলেন্স, রাজনৈতিক সংঘাত ও বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৯টি। কারাগারে বন্দি বা বিচারাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ৫৫ জনের এবং ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ৩৬৫টি। একই সময়ে মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১২০ জন।
অন্যদিকে এইচআরএসএসের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ছিল ৮৩০টি, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫২৯টি।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত জায়গায় না পৌঁছানো সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
অর্থনীতিতে পুরোনো সংকটই বড় বোঝা
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ইতোমধ্যে নানা চাপের মধ্যে ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের ধীরগতি ও সরকারি ঋণের চাপ—সব মিলিয়ে অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। ফলে ছয় মাসে বাজার পরিস্থিতিতে বড় ধরনের স্বস্তি না আসায় সরকারের ওপর চাপও বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ছয় মাসে দীর্ঘদিনের সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা কঠিন। তবে এই সময়ে সরকারের নেওয়া নীতিগুলোর দিকনির্দেশনা এবং বাস্তবায়নের গতি থেকে ভবিষ্যৎ ফলাফল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বিদ্যুৎ-গ্যাসে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি
সরকারের জন্য গত ছয় মাসের সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যাগুলোর একটি ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং, শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সংকট এবং অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্যাসের সংকট। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বাসাবাড়ির পাশাপাশি শিল্পকারখানাতেও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাই সরকারের প্রথম দিনের অগ্রাধিকারের একটি ছিল। ফলে ছয় মাস পর এই খাতের সমস্যাই সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে বড় পার্থক্য হিসেবে সামনে আসছে।
রাজনীতিতে নতুন চাপ
সরকারের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা রাজনৈতিক সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলে তা ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
এদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সম্প্রতি সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে কর্মসূচি দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী জোটের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের নতুন মাত্রাও দেখা গেছে।
কূটনীতিতে কিছু অর্জন
অন্যদিকে পররাষ্ট্রনীতিতে সরকারের প্রথম ছয় মাসকে তুলনামূলক ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়াকে সরকারের বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
এ ছাড়া জুনে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনাও হয়েছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডর এবং তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
ছয় মাসের সারাংশ কী?
সব মিলিয়ে তারেক রহমান সরকারের প্রথম ছয় মাসকে একেবারে ব্যর্থ বা পুরোপুরি সফল—কোনোটিই বলার সুযোগ নেই।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর কিছু উদ্যোগ এবং কূটনীতিতে কয়েকটি অর্জন সরকারের ইতিবাচক দিক হিসেবে সামনে এসেছে। বিপরীতে আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারের ঘোষিত তিন অগ্রাধিকারের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিস্থিতিতে এখনো দৃশ্যমান স্বস্তি আসেনি। ফলে আগামী ছয় মাসে এসব খাতে সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, সেটিই বিএনপি সরকারের জনপ্রিয়তা ও কার্যকারিতার বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।



















