ঢাকা ১১:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে, ৫৫ হাজার কোটি বিদেশি ঋণের খোঁজে সরকার

চট্টগ্রাম ব্যুরো
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:২৫:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমদানি–রপ্তানি করিডোর ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ককে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারবিশিষ্ট ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

২৩২ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৮০ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ এবং বাকি ১৬ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে যান চলাচল আরও দ্রুত, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য প্রবাহেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিদেশি অর্থায়নের পথে অগ্রগতি
পিডিপিপিতে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ সামাল দেওয়া এবং সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়ককে উপযুক্ত সক্ষমতায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সওজ বিদ্যমান চার লেনের মহাসড়ককে উভয় পাশে সার্ভিস লেনসহ ছয় লেনের নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারবিশিষ্ট মহাসড়কে উন্নীত করার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ নকশা সম্পন্ন করেছে।

সওজ কর্মকর্তারা জানান, পরিকল্পনা কমিশনের নীতিগত অনুমোদনের পর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে অর্থায়নের প্রস্তাব পাঠানো হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সওজের এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক উন্নয়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়নে আগ্রহী। তবে প্রকল্পটির আকার বড় হওয়ায় এডিবির নেতৃত্বে সহ-অর্থায়নের মডেল বিবেচনায় আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) অথবা জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাকে সহ-অর্থায়নকারী হিসেবে যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ।

কেমন হবে নতুন এক্সপ্রেসওয়ে
প্রস্তুতকৃত নকশা অনুযায়ী, স্থানীয় ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য মূল লেনের দুই পাশে পৃথক সার্ভিস লেন থাকবে। পার্শ্ববর্তী সড়কগুলো এসব সার্ভিস লেনের সঙ্গে যুক্ত হবে। চালকেরা কেবল নির্ধারিত এন্ট্রি ও এক্সিট পয়েন্ট ব্যবহার করে সার্ভিস লেন থেকে মূল এক্সপ্রেসওয়েতে প্রবেশ বা বের হতে পারবেন।

মহাসড়কজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচল নিশ্চিত করতে বিদ্যমান সব ইন্টারসেকশন বা মোড়কে সার্ভিস ইন্টারচেঞ্জ, সিস্টেম ইন্টারচেঞ্জ অথবা উপযুক্ত গ্রেড-সেপারেটেড কাঠামো, যেমন ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাসে রূপান্তর করা হবে। যানজট এড়াতে মহাসড়কের আওতাধীন সব শহরাঞ্চলে মূল অ্যাক্সেস-কন্ট্রোলড হাইওয়েটি এলিভেটেড আকারে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সওজ সূত্র জানায়, যাত্রাবাড়ী থেকে মদনপুর পর্যন্ত প্রায় ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর থেকে সাগরিকা পর্যন্ত আট কিলোমিটার এলিভেটেড সড়ক নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, শিমরাইল ও মদনপুর এবং চট্টগ্রামের বারইয়ারহাট, আবুতোরাব বাজার ও সলিমপুরে ছয়টি ফ্লাইওভার নির্মাণের বিষয়টি বিশদ নকশায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পুরো মহাসড়ক ছয় লেন হলেও শহরাঞ্চলে সার্ভিস লেনসহ ১০ লেনের নকশা করা হয়েছে।

টোল দিয়ে ব্যবহার করতে হবে মূল সড়ক
সওজ কর্মকর্তারা জানান, টোল আদায়ের ব্যবস্থা রেখেই নতুন নকশা তৈরি করা হয়েছে। কোনো যানবাহন ইচ্ছামতো মূল সড়ক ও সার্ভিস লেনের মধ্যে চলাচল করতে পারবে না। এর ফলে যানজট কমবে, ভ্রমণ সময় হ্রাস পাবে এবং যাত্রীদের যাতায়াত আরও দ্রুত, আরামদায়ক ও নিরাপদ হবে। একই সঙ্গে বাসসেবা আরও সময়নিষ্ঠ ও আধুনিক হয়ে উঠতে পারে।

সওজের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাসড়কে স্বয়ংক্রিয় টোল আদায়ের জন্য চারটি প্রধান এবং ১০০টি স্যাটেলাইট টোল প্লাজাসহ মোট ১০৪টি টোল প্লাজা নির্মাণ করা হবে। পুরো মহাসড়ক পরিচালনায় আধুনিক ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (আইটিএস) এবং ওএফসি-ভিত্তিক টোল কালেকশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

সওজের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ও বন্দরনগরীর মধ্যে যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে এবং দেশের প্রধান বাণিজ্য করিডোরে বিশ্বমানের যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। চট্টগ্রাম বন্দরভিত্তিক পণ্য পরিবহন দ্রুততর হওয়ায় সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে, পরিবহন ব্যয় কমতে পারে এবং শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি মহাসড়ককে ঘিরে নতুন শিল্পাঞ্চল, গুদাম ও লজিস্টিক হাব গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও বাড়বে।

পিপিপি মডেল নিয়ে আলোচনা
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নীতিগত অনুমোদনের অংশ হিসেবে শিগগিরই একটি পর্যালোচনা সভা হবে। সেখানে প্রকল্পটি প্রথমে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে বাস্তবায়নের সুযোগ আছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হবে। কারণ, বিশ্বে এ ধরনের বড় অবকাঠামো প্রকল্প সাধারণত পিপিপি মডেলেই বাস্তবায়িত হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, দেশে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে সেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ প্রায়ই নিশ্চিত করা যায় না। তাঁর মতে, পিপিপি মডেলে সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ বছরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি থাকে। ফলে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নিজস্ব স্বার্থেই সড়কের মান বজায় রাখে এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করে।

ড. শামসুল হক বলেন, উন্নত দেশগুলোতে সড়ক অবকাঠামো উন্নত ও কার্যকর হওয়ার অন্যতম কারণ দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা। সরকারি জনবল দিয়ে নিবিড় ও ধারাবাহিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা কঠিন হওয়ায় পিপিপি মডেল কার্যকর সমাধান হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, বহুপক্ষীয় ব্যাংকঋণের তুলনায় পিপিপি মডেলে অর্থায়ন অধিক কার্যকর, কারণ বিনিয়োগকারী শুধু নির্মাণ নয়, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও নেয়। ফলে সেবার মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাদের সরাসরি স্বার্থ জড়িত থাকে।

কোথায় কত খরচ

সওজের প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, ২৩২ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার মহাসড়কে মূল সড়ক নির্মাণকাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। সেতু, কালভার্ট, ফ্লাইওভার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা।

প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩৫৮ দশমিক ৪০ একর জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা।

প্রকল্প এলাকায় কাজের উপযোগী পরিবেশ, সাইট ব্যবস্থাপনা ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩১৬ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা। প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক টোল সংগ্রহ ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হবে ১ হাজার ২৯ কোটি টাকা।

দেশের অর্থনীতির প্রধান করিডোর
সওজ কর্মকর্তারা জানান, দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৯৬ শতাংশ এই মহাসড়ক ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দরে যাতায়াত করে। এটি ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে একমাত্র প্রধান সড়ক এবং নেপাল, ভুটান ও ভারতের জন্য সমুদ্রবন্দরে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

বর্তমানে চার লেনের এই মহাসড়কে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার যানবাহন চলাচল করে, যার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পণ্যবাহী ট্রাক। ধীর ও দ্রুতগতির যানবাহনের একসঙ্গে চলাচল, অসংখ্য ফিডার সড়কের সংযোগ এবং শিল্পাঞ্চলে ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকার কারণে নিয়মিত তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব সমস্যা নিরসনেই মহাসড়কটিকে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারবিশিষ্ট ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে, ৫৫ হাজার কোটি বিদেশি ঋণের খোঁজে সরকার

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:২৫:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমদানি–রপ্তানি করিডোর ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ককে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারবিশিষ্ট ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

২৩২ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৮০ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ এবং বাকি ১৬ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে যান চলাচল আরও দ্রুত, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য প্রবাহেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিদেশি অর্থায়নের পথে অগ্রগতি
পিডিপিপিতে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ সামাল দেওয়া এবং সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়ককে উপযুক্ত সক্ষমতায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সওজ বিদ্যমান চার লেনের মহাসড়ককে উভয় পাশে সার্ভিস লেনসহ ছয় লেনের নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারবিশিষ্ট মহাসড়কে উন্নীত করার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ নকশা সম্পন্ন করেছে।

সওজ কর্মকর্তারা জানান, পরিকল্পনা কমিশনের নীতিগত অনুমোদনের পর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মাধ্যমে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে অর্থায়নের প্রস্তাব পাঠানো হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সওজের এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক উন্নয়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়নে আগ্রহী। তবে প্রকল্পটির আকার বড় হওয়ায় এডিবির নেতৃত্বে সহ-অর্থায়নের মডেল বিবেচনায় আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) অথবা জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাকে সহ-অর্থায়নকারী হিসেবে যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ।

কেমন হবে নতুন এক্সপ্রেসওয়ে
প্রস্তুতকৃত নকশা অনুযায়ী, স্থানীয় ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য মূল লেনের দুই পাশে পৃথক সার্ভিস লেন থাকবে। পার্শ্ববর্তী সড়কগুলো এসব সার্ভিস লেনের সঙ্গে যুক্ত হবে। চালকেরা কেবল নির্ধারিত এন্ট্রি ও এক্সিট পয়েন্ট ব্যবহার করে সার্ভিস লেন থেকে মূল এক্সপ্রেসওয়েতে প্রবেশ বা বের হতে পারবেন।

মহাসড়কজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচল নিশ্চিত করতে বিদ্যমান সব ইন্টারসেকশন বা মোড়কে সার্ভিস ইন্টারচেঞ্জ, সিস্টেম ইন্টারচেঞ্জ অথবা উপযুক্ত গ্রেড-সেপারেটেড কাঠামো, যেমন ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাসে রূপান্তর করা হবে। যানজট এড়াতে মহাসড়কের আওতাধীন সব শহরাঞ্চলে মূল অ্যাক্সেস-কন্ট্রোলড হাইওয়েটি এলিভেটেড আকারে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সওজ সূত্র জানায়, যাত্রাবাড়ী থেকে মদনপুর পর্যন্ত প্রায় ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর থেকে সাগরিকা পর্যন্ত আট কিলোমিটার এলিভেটেড সড়ক নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, শিমরাইল ও মদনপুর এবং চট্টগ্রামের বারইয়ারহাট, আবুতোরাব বাজার ও সলিমপুরে ছয়টি ফ্লাইওভার নির্মাণের বিষয়টি বিশদ নকশায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পুরো মহাসড়ক ছয় লেন হলেও শহরাঞ্চলে সার্ভিস লেনসহ ১০ লেনের নকশা করা হয়েছে।

টোল দিয়ে ব্যবহার করতে হবে মূল সড়ক
সওজ কর্মকর্তারা জানান, টোল আদায়ের ব্যবস্থা রেখেই নতুন নকশা তৈরি করা হয়েছে। কোনো যানবাহন ইচ্ছামতো মূল সড়ক ও সার্ভিস লেনের মধ্যে চলাচল করতে পারবে না। এর ফলে যানজট কমবে, ভ্রমণ সময় হ্রাস পাবে এবং যাত্রীদের যাতায়াত আরও দ্রুত, আরামদায়ক ও নিরাপদ হবে। একই সঙ্গে বাসসেবা আরও সময়নিষ্ঠ ও আধুনিক হয়ে উঠতে পারে।

সওজের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাসড়কে স্বয়ংক্রিয় টোল আদায়ের জন্য চারটি প্রধান এবং ১০০টি স্যাটেলাইট টোল প্লাজাসহ মোট ১০৪টি টোল প্লাজা নির্মাণ করা হবে। পুরো মহাসড়ক পরিচালনায় আধুনিক ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (আইটিএস) এবং ওএফসি-ভিত্তিক টোল কালেকশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

সওজের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ও বন্দরনগরীর মধ্যে যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে এবং দেশের প্রধান বাণিজ্য করিডোরে বিশ্বমানের যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। চট্টগ্রাম বন্দরভিত্তিক পণ্য পরিবহন দ্রুততর হওয়ায় সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে, পরিবহন ব্যয় কমতে পারে এবং শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি মহাসড়ককে ঘিরে নতুন শিল্পাঞ্চল, গুদাম ও লজিস্টিক হাব গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও বাড়বে।

পিপিপি মডেল নিয়ে আলোচনা
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নীতিগত অনুমোদনের অংশ হিসেবে শিগগিরই একটি পর্যালোচনা সভা হবে। সেখানে প্রকল্পটি প্রথমে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে বাস্তবায়নের সুযোগ আছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হবে। কারণ, বিশ্বে এ ধরনের বড় অবকাঠামো প্রকল্প সাধারণত পিপিপি মডেলেই বাস্তবায়িত হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, দেশে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে সেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ প্রায়ই নিশ্চিত করা যায় না। তাঁর মতে, পিপিপি মডেলে সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ বছরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি থাকে। ফলে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নিজস্ব স্বার্থেই সড়কের মান বজায় রাখে এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করে।

ড. শামসুল হক বলেন, উন্নত দেশগুলোতে সড়ক অবকাঠামো উন্নত ও কার্যকর হওয়ার অন্যতম কারণ দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা। সরকারি জনবল দিয়ে নিবিড় ও ধারাবাহিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা কঠিন হওয়ায় পিপিপি মডেল কার্যকর সমাধান হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, বহুপক্ষীয় ব্যাংকঋণের তুলনায় পিপিপি মডেলে অর্থায়ন অধিক কার্যকর, কারণ বিনিয়োগকারী শুধু নির্মাণ নয়, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও নেয়। ফলে সেবার মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাদের সরাসরি স্বার্থ জড়িত থাকে।

কোথায় কত খরচ

সওজের প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, ২৩২ দশমিক ৭৬ কিলোমিটার মহাসড়কে মূল সড়ক নির্মাণকাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। সেতু, কালভার্ট, ফ্লাইওভার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা।

প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩৫৮ দশমিক ৪০ একর জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা।

প্রকল্প এলাকায় কাজের উপযোগী পরিবেশ, সাইট ব্যবস্থাপনা ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩১৬ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা। প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক টোল সংগ্রহ ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হবে ১ হাজার ২৯ কোটি টাকা।

দেশের অর্থনীতির প্রধান করিডোর
সওজ কর্মকর্তারা জানান, দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৯৬ শতাংশ এই মহাসড়ক ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দরে যাতায়াত করে। এটি ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে একমাত্র প্রধান সড়ক এবং নেপাল, ভুটান ও ভারতের জন্য সমুদ্রবন্দরে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

বর্তমানে চার লেনের এই মহাসড়কে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার যানবাহন চলাচল করে, যার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পণ্যবাহী ট্রাক। ধীর ও দ্রুতগতির যানবাহনের একসঙ্গে চলাচল, অসংখ্য ফিডার সড়কের সংযোগ এবং শিল্পাঞ্চলে ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকার কারণে নিয়মিত তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব সমস্যা নিরসনেই মহাসড়কটিকে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারবিশিষ্ট ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।