ভুল ক্যানুলা, ভুল অপারেশন, ভুল তথ্য
শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি, হাতে গ্যাংগ্রিন, শেষে নবজাতকের মৃত্যু
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৪:৫৯:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হওয়া এক নবজাতককে সুস্থ হয়ে ওঠার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকদের ভাষ্য ছিল, তাকে এনআইসিইউ থেকে কেবিনে স্থানান্তরের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু সেই আশ্বাসের এক দিনের মাথায় শিশুটির বাম হাতের তালু ও আঙুল কালো হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে গ্যাংগ্রিন ও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকার দুটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় হাসপাতালটির পরিচালক ও সাত চিকিৎসকসহ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
রোববার (২১ জুন) চট্টগ্রামের তৃতীয় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আলমগীর হোসেন এ আদেশ দেন। এর আগে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভুক্তভোগী শিশুর মা আমাতুল মাকনুন আদালতে অভিযোগটি দায়ের করেন।
আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ, প্রয়োজনীয় আলামত জব্দ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত সংগ্রহ করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। তদন্ত সিআইডির এমন একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে করতে হবে, যিনি পরিদর্শক পদমর্যাদার নিচে নন। একই সঙ্গে তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল গঠন করে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে মতামত দিতে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ জুলাই।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
অভিযোগে সাজিনাস হাসপাতালের পরিচালক হাসান মাহমুদ চৌধুরীকে অষ্টম আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন সহযোগী কনসালটেন্ট (এনআইসিইউ) ডা. আনোয়ার হোসেন, সিনিয়র কনসালটেন্ট (পেডিয়াট্রিক ও এনআইসিইউ) ডা. ফয়সাল আহমেদ, পেডিয়াট্রিক সার্জন ডা. আদনান ওয়ালিদ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওথোরাসিক ও ভাস্কুলার সার্জন ডা. মো. মিনহাজুল হাসান, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হাবিবুর রহমান, কার্ডিওথোরাসিক ও ভাস্কুলার সার্জন ডা. মো. ফজলে মারুফ এবং চট্টগ্রাম মা ও শিশু মেডিকেল কলেজের নিওনেটাল, পেডিয়াট্রিক, এডোলেসেন্ট ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন ডা. মো. তামিম সাফায়েত চৌধুরী। এছাড়া এনআইসিইউতে দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন অজ্ঞাতনামা চিকিৎসক ও নার্সকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।
জন্মের পর শুরু চিকিৎসা
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৫ মে পাঁচলাইশের সার্জিস্কোপ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন আমাতুল মাকনুন। জন্মের পর শিশুটির অক্সিজেনস্বল্পতাজনিত শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে এনআইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সার্জিস্কোপ হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকায় শিশুটিকে বায়েজিদ লিংক রোডের সাজিনাস হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ভর্তি করার সময় শ্বাসকষ্ট ছাড়া শিশুটির অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা ছিল না। ডা. ফয়সাল আহমেদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হয়। পরে ঈদুল আজহার ছুটিতে তিনি ঢাকায় গেলে ডা. আনোয়ার হোসেন চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করেন।
শিশুটির মা অভিযোগ করেন, এনআইসিইউতে প্রবেশের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ছিল। প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে মাত্র এক থেকে দুই মিনিট শিশুটিকে দেখার সুযোগ পেতেন তিনি। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্টেও কোনো বিশেষ শারীরিক জটিলতা ধরা পড়েনি।
সুস্থ হওয়ার আশ্বাস থেকে বিপর্যয়
অভিযোগে বলা হয়, ভর্তি হওয়ার পঞ্চম দিন ৩০ মে এক ডিউটি চিকিৎসক শিশুটির শারীরিক অবস্থার উন্নতির কথা জানিয়ে তাকে এনআইসিইউ থেকে কেবিনে স্থানান্তরের প্রস্তুতির কথা বলেন। ওই দিন দীর্ঘ অনুরোধের পর প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট সন্তানের পাশে থাকার সুযোগ পান মা।
এ সময় তিনি লক্ষ্য করেন, শিশুটির বাম হাতে ব্যান্ডেজ করা। বিষয়টি জানতে চাইলে ডিউটি চিকিৎসক ‘কিছুই না’ বলে এড়িয়ে যান। পরদিন ডা. ফয়সাল আহমেদ ঢাকায় থেকে ফিরে শিশুটিকে দেখার সুযোগ দিলে মা দেখতে পান, বাম হাতের তালু, তর্জনী ও অনামিকা কালো হয়ে গেছে এবং পুরো হাতের রং পরিবর্তিত হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, এ অবস্থার কারণ জানতে চাইলেও চিকিৎসকেরা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। বরং বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করেন। শিশুটির শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লেও প্রয়োজনীয় কার্যকর চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকায় নেওয়ার আগে অপারেশন
মামলায় বলা হয়, পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেয়। তবে একপর্যায়ে হাসপাতাল পরিচালক হাসান মাহমুদ চৌধুরীর উদ্যোগে ডা. মিনহাজুল হাসানকে এনে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সাময়িক উন্নতির কথা বলে পরিবারকে আশ্বস্ত করা হয়। সেই আশ্বাসে পরিবার আরও এক দিন হাসপাতালে অবস্থান করে।
কিন্তু ১ জুন শিশুটির অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাম হাতের আঙুল ও তালুতে গ্যাংগ্রিন দেখা দেয় এবং সংক্রমণ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ প্রকাশ পায়। ঢাকায় নেওয়ার আগে শিশুটির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে একটি ছোট অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন বলে জানানো হলে পরিবার সম্মতি দেয়। পরে ডা. আদনান ওয়ালিদের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করা হয়।
ইবনে সিনা ও এভারকেয়ারের চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ
অভিযোগে বলা হয়, প্রায় তিন লাখ টাকা চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধ করে ১ জুন রাতে শিশুটিকে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ব্যান্ডেজ খুলে চিকিৎসকেরা দেখতে পান, বাম হাত ফুলে গেছে, লাল হয়ে গেছে, রক্ত জমাট বেঁধেছে এবং রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে টিস্যু নষ্ট হয়ে গ্যাংগ্রিন তৈরি হয়েছে। সংক্রমণ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়েছে বলে তারা জানান।
পরে ২ জুন দিবাগত রাতে শিশুটিকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা জীবন বাঁচাতে সংক্রমিত বাম হাতের অংশ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু হাত অপসারণের পরও সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ৪ জুন দিবাগত রাত ১টা ১২ মিনিটে শিশুটি মারা যায়।
মামলার অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ভুল স্থানে আইভি ক্যানুলা প্রয়োগ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, অস্ত্রোপচারে ভুলভাবে রক্তনালী কেটে ফেলা এবং পরবর্তী চিকিৎসাগত অবহেলার কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে দায় এড়াতে ডিসচার্জ সার্টিফিকেট ও কেস সামারিতে ইচ্ছাকৃতভাবে অসত্য তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগও আনা হয়েছে।
মায়ের অভিযোগ
শিশুটির মা আমাতুল মাকনুন এর আগে অভিযোগ করেন, সন্তানের হাতে জটিলতা দেখা দেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। শেষ দুই দিনে দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন চিকিৎসক শিশুটিকে দেখতে পর্যন্ত আসেননি। ঢাকার ইবনে সিনা ও এভারকেয়ার হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাকে বলেছেন, ভুল চিকিৎসা ও অনভিজ্ঞতার কারণে শিশুটির এই পরিণতি হয়েছে।
হাসপাতালের বক্তব্য
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সাজিনাস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিশুটি সার্জিস্কোপ হাসপাতাল থেকেই ক্যানুলা-সংক্রান্ত সংক্রমণ নিয়ে এসেছিল। বিষয়টি শনাক্ত করার পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং দুই দিন উন্নতিও দেখা যায়। পরে অবস্থার অবনতি হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, গ্যাংগ্রিন হওয়ার পর চট্টগ্রামে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় শিশুটিকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিবার প্রথমে ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়ায় প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। এ কারণে চিকিৎসা শুরুতে দেরি হয়।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্যকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন আমাতুল মাকনুন। তার ভাষ্য, হাসপাতাল শুরু থেকেই শিশুটির হাতের কোনো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করায়নি। অস্ত্রোপচারেও ভুল হয়েছে এবং পুরো বিষয়টি পরিবারকে গোপন রাখা হয়েছে।
আইনজীবীর বক্তব্য
বাদীপক্ষের আইনজীবী শুভাশীষ শর্মা বলেন, নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আদালতে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আদালত বিষয়টি তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত সংগ্রহের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।



















