ঢাকা ০৫:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশেষ লেখা

আবাসন খাত করমুক্ত হলে ৩৬০০ শিল্প চাঙ্গা হবে, বাড়বে রাজস্ব

মানোয়ার হোসেন
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:৫১:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ ৫৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আমি এবারের বাজেটকে ‘ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত’ বাংলাদেশের ভিত্তি তৈরির রূপরেখা হিসেবে দেখছি। এটি প্রচলিত সংখ্যা বা অঙ্কের হিসাবের বাইরে গিয়ে তৈরি করা একটি ব্যতিক্রমী বাজেট।

গত কয়েক বছরের গতানুগতিক বাজেটের পর এটিকে একটি গতি ফিরিয়ে আনার (ক্যাচ-আপ) বাজেট বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জোর দিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। বৈশ্বিক যোগাযোগের এই যুগে একটি ‘তৃতীয় ভাষা’ চালুর পরিকল্পনাটি চমৎকার, যা তরুণদের জন্য নতুন সুযোগের দুয়ার খুলে দেবে। অনেকে বাজেটকে বড় বললেও আমি দ্বিমত পোষণ করি, অর্থনীতির চাকা যদি পূর্ণ শক্তিতে দ্রুত ঘোরে, তবে এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব নয়।

আবাসন খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও কর নীতি : আমি সব সময়ই আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাতকে সম্পূর্ণ করমুক্ত করার পক্ষে।

আবাসন কেবল মানুষের মৌলিক চাহিদাই নয়, এই একটি খাত চাঙ্গা হলে এর সঙ্গে যুক্ত তিন হাজার ৬০০টি সেবা ও উৎপাদনমুখী শিল্প খাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। আবাসন খাত থেকে কর ছাড় দিলে সরকার যে রাজস্ব হারাবে, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজস্ব উঠে আসবে এর সঙ্গে যুক্ত লিংকেজ শিল্পগুলোর প্রবৃদ্ধি থেকে। যেমন আমাদের সিমেন্টশিল্প এখন ক্ষমতার মাত্র ৫৫ শতাংশ উৎপাদনে রয়েছে। এটিকে যদি ৮০ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তবে এই এক খাত থেকেই বছরে অতিরিক্ত দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় সম্ভব। একইভাবে ইস্পাত, সিরামিকস, রং, কেবল, ফিটিংস, লজিস্টিকস ও ব্যাংকিং খাতে যে বিশাল বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে, তা অর্থনীতিকে অনেক দূর এগিয়ে নেবে।

ঋণনির্ভরতা বনাম বৈশ্বিক ইক্যুইটি পুঁজি: তবে বাজেটের একটি দুর্বলতা হলো—এর অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা। শুধু ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যায় না। বাংলাদেশকে এখন ধারের বাইরে এসে অবকাঠামো খাতে বিদেশি ইক্যুইটি পুঁজি বা অংশীদারির মূলধন আকর্ষণে জোরালোভাবে মনোযোগ দিতে হবে।

বিশ্ববাজারে বর্তমানে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দেশ। আমাদের মেগা অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে আমরা কেন সেই তহবিল থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সরাসরি বিনিয়োগ আনতে পারব না? আমাদের এখন ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদেশি অংশীদারি পুঁজি আনার কৌশলগত নীতি গ্রহণ করতে হবে। তবে পিভিসি রেজিনের আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি দেখে আমি বেশ বিস্মিত হয়েছি। বাংলাদেশের জন্য পিভিসিভিত্তিক পণ্যগুলো সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মূল্য সংযোজিত রপ্তানি খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। সঠিকভাবে সহায়তা করা গেলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে এই খাতটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিশিল্পে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

নতুনভাবে বাড়ানো আমদানি শুল্ক শুধু এই রপ্তানি সম্ভাবনাকেই বাধাগ্রস্ত করবে না, বরং দেশের ছোট শহরগুলোতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে যে শিল্পটির প্রসার শুরু হয়েছিল, তাকেও নিরুৎসাহ করবে। তা ছাড়া এনবিআর কর্তৃক নির্ধারিত অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু বৃদ্ধি বাস্তব তথ্যভিত্তিক নয়। বরং এটি প্রশংসনীয় বাজেটের ওপর একটি কালো দাগ। আমি এটিকে একটি অনিচ্ছাকৃত ওভারসাইট হিসেবে বিবেচনা করে অবিলম্বে সংশোধনের অনুরোধ জানাচ্ছি।

লেখক : চেয়ারম্যান, আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

বিশেষ লেখা

আবাসন খাত করমুক্ত হলে ৩৬০০ শিল্প চাঙ্গা হবে, বাড়বে রাজস্ব

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:৫১:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

আমি এবারের বাজেটকে ‘ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত’ বাংলাদেশের ভিত্তি তৈরির রূপরেখা হিসেবে দেখছি। এটি প্রচলিত সংখ্যা বা অঙ্কের হিসাবের বাইরে গিয়ে তৈরি করা একটি ব্যতিক্রমী বাজেট।

গত কয়েক বছরের গতানুগতিক বাজেটের পর এটিকে একটি গতি ফিরিয়ে আনার (ক্যাচ-আপ) বাজেট বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জোর দিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। বৈশ্বিক যোগাযোগের এই যুগে একটি ‘তৃতীয় ভাষা’ চালুর পরিকল্পনাটি চমৎকার, যা তরুণদের জন্য নতুন সুযোগের দুয়ার খুলে দেবে। অনেকে বাজেটকে বড় বললেও আমি দ্বিমত পোষণ করি, অর্থনীতির চাকা যদি পূর্ণ শক্তিতে দ্রুত ঘোরে, তবে এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব নয়।

আবাসন খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও কর নীতি : আমি সব সময়ই আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাতকে সম্পূর্ণ করমুক্ত করার পক্ষে।

আবাসন কেবল মানুষের মৌলিক চাহিদাই নয়, এই একটি খাত চাঙ্গা হলে এর সঙ্গে যুক্ত তিন হাজার ৬০০টি সেবা ও উৎপাদনমুখী শিল্প খাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। আবাসন খাত থেকে কর ছাড় দিলে সরকার যে রাজস্ব হারাবে, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজস্ব উঠে আসবে এর সঙ্গে যুক্ত লিংকেজ শিল্পগুলোর প্রবৃদ্ধি থেকে। যেমন আমাদের সিমেন্টশিল্প এখন ক্ষমতার মাত্র ৫৫ শতাংশ উৎপাদনে রয়েছে। এটিকে যদি ৮০ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তবে এই এক খাত থেকেই বছরে অতিরিক্ত দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় সম্ভব। একইভাবে ইস্পাত, সিরামিকস, রং, কেবল, ফিটিংস, লজিস্টিকস ও ব্যাংকিং খাতে যে বিশাল বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে, তা অর্থনীতিকে অনেক দূর এগিয়ে নেবে।

ঋণনির্ভরতা বনাম বৈশ্বিক ইক্যুইটি পুঁজি: তবে বাজেটের একটি দুর্বলতা হলো—এর অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা। শুধু ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যায় না। বাংলাদেশকে এখন ধারের বাইরে এসে অবকাঠামো খাতে বিদেশি ইক্যুইটি পুঁজি বা অংশীদারির মূলধন আকর্ষণে জোরালোভাবে মনোযোগ দিতে হবে।

বিশ্ববাজারে বর্তমানে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দেশ। আমাদের মেগা অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে আমরা কেন সেই তহবিল থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সরাসরি বিনিয়োগ আনতে পারব না? আমাদের এখন ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদেশি অংশীদারি পুঁজি আনার কৌশলগত নীতি গ্রহণ করতে হবে। তবে পিভিসি রেজিনের আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি দেখে আমি বেশ বিস্মিত হয়েছি। বাংলাদেশের জন্য পিভিসিভিত্তিক পণ্যগুলো সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মূল্য সংযোজিত রপ্তানি খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। সঠিকভাবে সহায়তা করা গেলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে এই খাতটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিশিল্পে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

নতুনভাবে বাড়ানো আমদানি শুল্ক শুধু এই রপ্তানি সম্ভাবনাকেই বাধাগ্রস্ত করবে না, বরং দেশের ছোট শহরগুলোতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে যে শিল্পটির প্রসার শুরু হয়েছিল, তাকেও নিরুৎসাহ করবে। তা ছাড়া এনবিআর কর্তৃক নির্ধারিত অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু বৃদ্ধি বাস্তব তথ্যভিত্তিক নয়। বরং এটি প্রশংসনীয় বাজেটের ওপর একটি কালো দাগ। আমি এটিকে একটি অনিচ্ছাকৃত ওভারসাইট হিসেবে বিবেচনা করে অবিলম্বে সংশোধনের অনুরোধ জানাচ্ছি।

লেখক : চেয়ারম্যান, আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ