চরবাসীর দাবি হাসপাতাল ও নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা
চরে স্বাস্থ্যসেবার করুণ চিত্র, ওষুধ ও চিকিৎসক সংকট
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৪:৪৫:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ৩৬ বার পড়া হয়েছে
যমুনার বুকে ভেসে থাকা চরগুলোতে জীবন মানেই যেন এক অনবরত লড়াই—বেঁচে থাকার লড়াই, আর সবচেয়ে বেশি লড়াই চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর সঙ্গে। পাবনার বেড়া উপজেলার যমুনা তীরবর্তী এই চরাঞ্চলে প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস, কিন্তু এই বিশাল জনপদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা যেন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
নদীঘেরা এই ২৫টি চরের মানুষদের কাছে চিকিৎসা এখনো এক বিলাসী শব্দ। এখানে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। যে পাঁচটি কমিউনিটি ক্লিনিক ছিল, তার দু’টি ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। বাকি যেগুলো আছে, সেগুলোও যেন নামমাত্র সেবা কেন্দ্র—নিয়মিত চিকিৎসক নেই, নেই পর্যাপ্ত ওষুধ। ফলে অসুস্থ হলে মানুষের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় ফার্মেসি, কিংবা অভিজ্ঞতাহীন হাতুড়ে চিকিৎসক।
চরের মানুষদের জীবন নদীর স্রোতের মতোই অনিশ্চিত। কখনো জেলে নৌকার ভরসায়, কখনো কাদামাটি ভেঙে চলার পথেই কাটে তাদের দিন। কিন্তু অসুখ এলে সেই পথও বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে রাতের বেলায় কোনো রোগীকে নদী পার করে হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় সেই অসহায় যাত্রার মাঝপথেই নিভে যায় জীবনপ্রদীপ।
চরনাগদহ গ্রামের ফজল মাঝি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “চল্লিশ বছর ধরে এখানে আছি। ক্লিনিক আছে, কিন্তু খোলে না। গুরুতর অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ই পাই না।”
একই কষ্টের কথা জানান বিবি কুলসুম। গভীর রাতের প্রসব বেদনার কথা মনে করে তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিনি বলেন, “নদী পার হওয়া সম্ভব ছিল না। বাধ্য হয়ে ঘরেই সন্তান হয়েছে। তখন শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা ছিল।”
এই চরগুলোতে গর্ভবতী নারী, শিশু আর বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। নিরাপদ প্রসবের সুযোগ না থাকায় অনেক নারী ঘরেই সন্তান জন্ম দিচ্ছেন, যা মা ও নবজাতক—দু’জনের জীবনকেই ঝুঁকিতে ফেলছে। শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া আর জ্বর যেন নিত্যদিনের সঙ্গী।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই সংকটের কথা স্বীকার করছেন। তাদের মতে, ক্লিনিকগুলো হারিয়ে যাওয়া বা অচল হয়ে পড়া, ওষুধ সংকট এবং চিকিৎসক না থাকায় পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
এক সময় চরাঞ্চলের জরুরি চিকিৎসার জন্য একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি আজও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে রোগী পরিবহন এখনো নদীর অনিশ্চিত স্রোত আর নৌকার ওপরই নির্ভরশীল।
চরবাসীর দাবি খুব সাধারণ—একটি কার্যকর হাসপাতাল, নিয়মিত চিকিৎসক, পর্যাপ্ত ওষুধ আর জরুরি সময়ে নৌ-অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু এই সাধারণ দাবিগুলোই তাদের কাছে এখনো স্বপ্নের মতো দূরের।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ভাষায়, “চরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো সত্যিই কঠিন।” কিন্তু সেই কঠিন বাস্তবতার ভেতরেই প্রতিদিন আরও কিছু জীবন হারিয়ে যাচ্ছে—নীরবে, বিনা চিকিৎসায়।
পাবনার বেড়া উপজেলার চরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা সংকট নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
পুরান ভারেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বালাম জানান, ইউনিয়নের পাঁচটি ওয়ার্ডে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করলেও একমাত্র ভরসা চরকল্যাণপুর কমিউনিটি ক্লিনিক। কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা ও ওষুধের ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ বলেন, নদীভাঙনে আগের ক্লিনিকটি হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ, স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর দাবি জানান।
এ বিষয়ে বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাহমিনা সুলতানা নীলা বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি সত্যিই কঠিন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং সমাধানের চেষ্টা করা হবে।





















