ঢাকা ০৫:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আবাসন খাতের পতন রুখতে না পারলে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে জাতীয় অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:৫২:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ ৬৬ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা অতিব জরুরি। এজন্য স্থবির হয়ে পড়া আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা অত্যাবশ্যক বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা। জিডিপিতে প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান রাখা এই খাতের বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। একটি ফ্ল্যাট বা বাড়ির পেছনে হওয়া বিনিয়োগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রড, সিমেন্ট, টাইলস, সিরামিকসহ ২৬৯টি লিংকেজ শিল্পের সাথে জড়িত। ফলে এই খাতের সংকট পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিকেই বড় ধরনের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আবাসন খাত যেকোনো দেশের অর্থনীতির ‘রিয়েল সেক্টর’ বা প্রকৃত উৎপাদনশীল খাত। বর্তমানে দেশে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নীতিগত অস্থিরতার কারণে ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় অর্ধেকে (৭০ শতাংশ পর্যন্ত) নেমে এসেছে। আগে যেখানে মাসে গড়ে ১,০০০টি ফ্ল্যাট বিক্রি হতো, তা এখন ৫০০-তে ঠেকেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার।

বিক্রি কমার পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নির্মাণ সামগ্রীর লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধি। রড, সিমেন্ট, ইট, বালু ও পাথরের দাম বাড়ায় নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। উচ্চ সুদহার: ব্যাংকঋণের সুদহার ৯-১০ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন ১৫-১৬ শতাংশে ঠেকেছে। নিবন্ধন ব্যয়: এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে আবাসন খাতের নিবন্ধন ব্যয় সর্বোচ্চ (১৩ শতাংশের ওপর)।

বাজেটের বাড়তি চাপ: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রড উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ভ্যাট এবং স্ক্র্যাপের ওপর শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব এই খাতকে আরও কোণঠাসা করেছে। এফএআর (FAR) হ্রাস: ফ্লোর এরিয়া রেশিও কমে যাওয়ায় বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ সীমিত হয়েছে, যার ফলে জমির মালিকরাও আগ্রহ হারাচ্ছেন।

বিশাল কর্মসংস্থান ও রাজস্বের উৎস আবাসন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম এক শক্তিশালী স্তম্ভ। এই খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ১,৪০০টির বেশি কোম্পানি এখানে যুক্ত। এটি বার্ষিক প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব জোগান দেয় এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে। নির্মাণ সামগ্রীর বাজার মন্দা হওয়ায় বাংলামোটরসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা এখন পুঁজি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

উত্তরণের উপায়: বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী আবাসন খাত জিডিপির একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে (যেমন: চীনে ২৩-২৮% এবং উন্নত দেশগুলোতে ১৫-২০%)। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আবাসন খাতের প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগ অর্থনীতিতে ২.৫ টাকার বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এই মন্দা কাটাতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেছেন:
১. নিবন্ধন ব্যয় হ্রাস: রিহ্যাবের প্রস্তাব অনুযায়ী নিবন্ধন ব্যয় ১৩% থেকে কমিয়ে ৭% করা।
২. স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ: মধ্যবিত্তদের জন্য সহজ শর্তে গৃহঋণের ব্যবস্থা করা।
৩. করনীতিতে নমনীয়তা: আবাসন চাঙ্গা করতে সাময়িক করমুক্ত সুবিধা দেওয়া, যা সচল হলে লিংকেজ শিল্প থেকে আরও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।

৪. একীভূত নীতি ও প্রযুক্তি: একটি স্বচ্ছ, পেশাদার এবং প্রযুক্তিনির্ভর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা, যা প্রকৌশলী, স্থপতি ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে।

সময়মতো সঠিক সরকারি নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা না দিলে আবাসন খাতের এই পতন দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই বাজেট-পরবর্তী আলোচনায় এই খাতের দাবিগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা এখনই উপযুক্ত সময়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

আবাসন খাতের পতন রুখতে না পারলে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে জাতীয় অর্থনীতি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:৫২:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা অতিব জরুরি। এজন্য স্থবির হয়ে পড়া আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা অত্যাবশ্যক বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা। জিডিপিতে প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান রাখা এই খাতের বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। একটি ফ্ল্যাট বা বাড়ির পেছনে হওয়া বিনিয়োগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রড, সিমেন্ট, টাইলস, সিরামিকসহ ২৬৯টি লিংকেজ শিল্পের সাথে জড়িত। ফলে এই খাতের সংকট পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিকেই বড় ধরনের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আবাসন খাত যেকোনো দেশের অর্থনীতির ‘রিয়েল সেক্টর’ বা প্রকৃত উৎপাদনশীল খাত। বর্তমানে দেশে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নীতিগত অস্থিরতার কারণে ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় অর্ধেকে (৭০ শতাংশ পর্যন্ত) নেমে এসেছে। আগে যেখানে মাসে গড়ে ১,০০০টি ফ্ল্যাট বিক্রি হতো, তা এখন ৫০০-তে ঠেকেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার।

বিক্রি কমার পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নির্মাণ সামগ্রীর লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধি। রড, সিমেন্ট, ইট, বালু ও পাথরের দাম বাড়ায় নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। উচ্চ সুদহার: ব্যাংকঋণের সুদহার ৯-১০ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন ১৫-১৬ শতাংশে ঠেকেছে। নিবন্ধন ব্যয়: এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে আবাসন খাতের নিবন্ধন ব্যয় সর্বোচ্চ (১৩ শতাংশের ওপর)।

বাজেটের বাড়তি চাপ: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রড উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ভ্যাট এবং স্ক্র্যাপের ওপর শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব এই খাতকে আরও কোণঠাসা করেছে। এফএআর (FAR) হ্রাস: ফ্লোর এরিয়া রেশিও কমে যাওয়ায় বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ সীমিত হয়েছে, যার ফলে জমির মালিকরাও আগ্রহ হারাচ্ছেন।

বিশাল কর্মসংস্থান ও রাজস্বের উৎস আবাসন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম এক শক্তিশালী স্তম্ভ। এই খাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ১,৪০০টির বেশি কোম্পানি এখানে যুক্ত। এটি বার্ষিক প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব জোগান দেয় এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে। নির্মাণ সামগ্রীর বাজার মন্দা হওয়ায় বাংলামোটরসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা এখন পুঁজি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

উত্তরণের উপায়: বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী আবাসন খাত জিডিপির একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে (যেমন: চীনে ২৩-২৮% এবং উন্নত দেশগুলোতে ১৫-২০%)। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আবাসন খাতের প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগ অর্থনীতিতে ২.৫ টাকার বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এই মন্দা কাটাতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেছেন:
১. নিবন্ধন ব্যয় হ্রাস: রিহ্যাবের প্রস্তাব অনুযায়ী নিবন্ধন ব্যয় ১৩% থেকে কমিয়ে ৭% করা।
২. স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ: মধ্যবিত্তদের জন্য সহজ শর্তে গৃহঋণের ব্যবস্থা করা।
৩. করনীতিতে নমনীয়তা: আবাসন চাঙ্গা করতে সাময়িক করমুক্ত সুবিধা দেওয়া, যা সচল হলে লিংকেজ শিল্প থেকে আরও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।

৪. একীভূত নীতি ও প্রযুক্তি: একটি স্বচ্ছ, পেশাদার এবং প্রযুক্তিনির্ভর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা, যা প্রকৌশলী, স্থপতি ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে।

সময়মতো সঠিক সরকারি নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা না দিলে আবাসন খাতের এই পতন দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই বাজেট-পরবর্তী আলোচনায় এই খাতের দাবিগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা এখনই উপযুক্ত সময়।