ঢাকা ০৭:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ছয়জনের বিরুদ্ধে পিবিআইয়ের অভিযোগপত্র

সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদাবাজি, ১০ লাখ টাকা ভাগাভাগি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৪৬:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় ব্যবহার করে সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফরের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে ১০ লাখ টাকা আদায় এবং তা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন প্রধান দুই আসামি।

পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই রাতে শাম্মী আহমেদ গুলশানের বাসায় আছেন—এমন খবর পেয়ে কয়েকজন নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে গুলশান-২ গোলচত্বরে জড়ো হন। পরে আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ ও জানে আলম অপু গুলশান থানায় গিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য বাসায় অভিযান চালানোর ব্যবস্থা করতে বলেন।

১৭ জুলাই ভোরে গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরমান আলীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তাঁদের সঙ্গে নিয়ে ওই বাসায় যায়। বাসার বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি চালিয়েও শাম্মী আহমেদকে পাওয়া যায়নি। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তল্লাশির তালিকা তৈরি করে পুলিশ ও তাঁদের সঙ্গে যাওয়া ব্যক্তিরা বাসা থেকে বেরিয়ে যান।

তদন্তে পাওয়া ভিডিও ফুটেজের বরাতে পিবিআই জানিয়েছে, পুলিশ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর রিয়াদ ও অপু আবার ওই বাসায় যান। এবার তাঁদের সঙ্গে পুলিশ ছিল না। বাসার মালিক সিদ্দিক আবু জাফরকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তার ও মামলার ভয় দেখান তাঁরা। এসব থেকে রেহাই পেতে তাঁর কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ভয়ে সিদ্দিক আবু জাফর তাৎক্ষণিকভাবে ১০ লাখ টাকা দিতে রাজি হন। বাকি ৪০ লাখ টাকা প্রস্তুত রাখতে বলে চলে যান অভিযুক্তরা।

পিবিআইয়ের নথিতে বলা হয়েছে, টাকা নেওয়ার দৃশ্যের ভিডিও ফুটেজও তদন্তকারীরা পেয়েছেন। পরে ১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের জন্য আবার ওই বাসায় যান রিয়াদ ও অপু। দরজা না খোলায় তাঁরা ফিরে যান। কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনা করেও ওই সময়ে তাঁদের ঘটনাস্থলে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২৬ জুলাই বিকেলে বাকি টাকা আদায়ের জন্য আবার সিদ্দিক আবু জাফরের বাসায় যান অভিযুক্তরা। সে সময় তিনি বাসায় ছিলেন না। নিরাপত্তাকর্মী মো. হান্নান ফোন করে তাঁকে বিষয়টি জানান। পরে তিনি গুলশান থানায় খবর দেন। পুলিশ গিয়ে আবদুর রাজ্জাক, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন ও কিশোর আমিনুল ইসলামকে আটক করে। জানে আলম অপু পালিয়ে গেলেও পরে ডিবির সহায়তায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

‘টাকার লোভ সামলাতে পারিনি’, জবানবন্দিতে রিয়াদ

গ্রেপ্তারের পর ছয় আসামির মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। দুজনের জবানবন্দিতেই ১০ লাখ টাকা নেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

রিয়াদ জবানবন্দিতে জানান, তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিবাদী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শাম্মী আহমেদের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে না পেয়ে ফেরার সময় অপু একটি ইয়ারপড নিয়ে আসেন। সেটিতে ‘শাম্মি ইয়ারপড’ লেখা ছিল। সেটি ফেরত দিতে তাঁরা সকাল ১০টার দিকে আবার ওই বাসায় যান। এ সময় অপু পানি খাওয়ার অজুহাতে বাসার ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে সিদ্দিক আবু জাফরকে বলা হয়, তাঁরা বুঝতে পারছেন তাঁর স্ত্রী বাসায় আছেন এবং তাঁকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে।

রিয়াদ জানান, তখন টাকা দেওয়ার প্রস্তাব এলে তাঁরা প্রথমে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। সিদ্দিক আবু জাফর ১০ লাখ টাকা দিতে রাজি হলে তাঁরা তা গ্রহণ করেন। পরে বাড্ডায় রিয়াদের বাসায় গিয়ে নিজেদের মধ্যে সমান ভাগ করে নেন।

বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের চেষ্টা সম্পর্কে রিয়াদ বলেন, ২৬ জুলাই বিকেল ৫টার দিকে তিনি ইব্রাহিম হোসেন, সাকাদাউন সিয়াম ও সাদমান সাদাবকে ওই বাসায় পাঠান। তাঁর দাবি, পুলিশ তাঁকে ফাঁদে ফেলার জন্য বাসায় যেতে বলে। পুলিশের কথা বিশ্বাস করে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর সিদ্দিক আবু জাফর থানায় খবর দেন। পরে পুলিশ এসে তাঁদের আটক করে।

জবানবন্দির শেষ দিকে নিজের অপরাধ স্বীকার করে রিয়াদ বলেন, ‘আমি গরিবের ছেলে। আমি টাকার লোভ সামলাতে পারিনি। আমি ক্ষমা চাই।’

টাকা দিয়ে মোটরসাইকেল কেনেন অপু

অন্য আসামি জানে আলম অপুও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলে দাবি করেন। যদিও পিবিআইয়ের তদন্তে ওই সময় তাঁর ঘটনাস্থলে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপু জানান, ১৭ জুলাই রাতে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে গুলশানে সাবেক এক নারী সংসদ সদস্যের অবস্থানের খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান। পরে পুলিশের সঙ্গে ওই বাসায় অভিযান চালানো হয়। শাম্মী আহমেদকে না পেয়ে তাঁরা ফিরে আসেন।

পরে রিয়াদ তাঁকে আবার ওই বাসায় নিয়ে যান। সেখানে সিদ্দিক আবু জাফরের কাছে টাকা চাওয়া হলে তিনি প্রথমে পাঁচ লাখ টাকা দিতে রাজি হন। কিন্তু রিয়াদ এক কোটি টাকা দাবি করেন। দীর্ঘ আলোচনার পর ৫০ লাখ টাকায় বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। তখন ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়।

অপুর ভাষ্য অনুযায়ী, রিয়াদের বাড্ডার বাসায় গিয়ে তাঁরা পাঁচ লাখ টাকা করে ভাগ করে নেন। নিজের ভাগের টাকা থেকে ৩ লাখ ৭ হাজার টাকা দিয়ে তিনি একটি ইয়ামাহা এফজেড-এক্স মোটরসাইকেল কেনেন। কিছু টাকা দিয়ে ধারদেনা পরিশোধ করেন। আরও ৫০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে গিয়ে ভুল নম্বরে চলে যায় বলে দাবি করেন তিনি। পরে তাঁর কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

অপু জবানবন্দিতে আরও বলেন, বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের জন্য রিয়াদ ফোন করলে তিনি যেতে অস্বীকৃতি জানান। পরে রিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।

টাকা, মুঠোফোন ও মোটরসাইকেল জব্দ

আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থান থেকে নগদ টাকা, মুঠোফোন ও মোটরসাইকেল জব্দ করেছে পিবিআই। আবদুর রাজ্জাকের দেখানো তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব বাড্ডার বৈঠাকালী এলাকার একটি বাসা থেকে ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ও একটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়।

অন্যদিকে জানে আলম অপুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরের নবীনগর এলাকার একটি বাসার গ্যারেজ থেকে ইয়ামাহা এফজেড-এক্স মোটরসাইকেল, একটি আইফোন ১১ এবং নগদ ১৭ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসামিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন। এই পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে তাঁরা নিয়মিত থানায় যাতায়াত করতেন। বিভিন্ন মামলার আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট আসামিদের গ্রেপ্তার এবং তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার কথা বলে পুলিশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, পরে তাঁরা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের দোসর, সহযোগী বা সমর্থক আখ্যা দিয়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি ও আদায় করতেন। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র, শুনানি ১০ নভেম্বর

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই ফিরোজ আহমেদ মুন্সী অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন, তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ এবং জানে আলম অপুর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩৮৫ ও ৩৮৬ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও ইব্রাহিম হোসেনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮ ও ৩৮৫ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

২০২৫ সালের ২৭ জুলাই গুলশান থানায় মামলাটি করেন ৭৫ বছর বয়সী সিদ্দিক আবু জাফর। মামলার নথি অনুযায়ী, তাঁর স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদ। প্রথমে গুলশান থানার এসআই মোখলেছুর রহমান মামলাটি তদন্ত করেন। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। সংস্থাটির এসআই ফিরোজ আহমেদ মুন্সী তদন্ত শেষে গত ১৫ অক্টোবর ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসামিদের একজন শিশু হওয়ায় তাঁর বিচার হবে শিশু আদালতে। আগামী ১০ নভেম্বর মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য রয়েছে। ওই দিন অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানি হওয়ার কথা। মামলার ছয় আসামিই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

মামলার প্রধান আসামি আবদুর রাজ্জাক রিয়াদের আইনজীবী আকরাম হোসাইন বলেছেন, তাঁরা এখনো অভিযোগপত্র দেখেননি। রিয়াদের পক্ষে আদালতে পিটিশন করবেন। অভিযোগপত্রের বিষয়ে রিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যবহৃত ফোন নম্বরটি এখন তাঁর বড় ভাই রেজাউল করিম ব্যবহার করছেন। মামলার বিষয়ে রিয়াদ আপাতত কথা বলতে চান না বলে জানান তাঁর ভাই।

অন্যদিকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত কৌঁসুলি মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী পরিচয় দেওয়া আবদুর রাজ্জাক রিয়াদ এই চাঁদাবাজির হোতা। তাঁকে ওই সময়ে আদালত একাধিকবার রিমান্ডে পাঠিয়েছিলেন। চাঁদাবাজির মামলায় প্রত্যেক আসামিকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী বিচার হলে তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি।

বাদী সিদ্দিক আবু জাফরের আইনজীবী জহুরুল আলম বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়ায় তাঁরা সন্তুষ্ট। তাঁরা ন্যায়বিচার চান।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ছয়জনের বিরুদ্ধে পিবিআইয়ের অভিযোগপত্র

সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদাবাজি, ১০ লাখ টাকা ভাগাভাগি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৪৬:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় ব্যবহার করে সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফরের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে ১০ লাখ টাকা আদায় এবং তা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন প্রধান দুই আসামি।

পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই রাতে শাম্মী আহমেদ গুলশানের বাসায় আছেন—এমন খবর পেয়ে কয়েকজন নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে গুলশান-২ গোলচত্বরে জড়ো হন। পরে আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ ও জানে আলম অপু গুলশান থানায় গিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য বাসায় অভিযান চালানোর ব্যবস্থা করতে বলেন।

১৭ জুলাই ভোরে গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরমান আলীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তাঁদের সঙ্গে নিয়ে ওই বাসায় যায়। বাসার বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি চালিয়েও শাম্মী আহমেদকে পাওয়া যায়নি। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তল্লাশির তালিকা তৈরি করে পুলিশ ও তাঁদের সঙ্গে যাওয়া ব্যক্তিরা বাসা থেকে বেরিয়ে যান।

তদন্তে পাওয়া ভিডিও ফুটেজের বরাতে পিবিআই জানিয়েছে, পুলিশ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর রিয়াদ ও অপু আবার ওই বাসায় যান। এবার তাঁদের সঙ্গে পুলিশ ছিল না। বাসার মালিক সিদ্দিক আবু জাফরকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তার ও মামলার ভয় দেখান তাঁরা। এসব থেকে রেহাই পেতে তাঁর কাছে ৫০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ভয়ে সিদ্দিক আবু জাফর তাৎক্ষণিকভাবে ১০ লাখ টাকা দিতে রাজি হন। বাকি ৪০ লাখ টাকা প্রস্তুত রাখতে বলে চলে যান অভিযুক্তরা।

পিবিআইয়ের নথিতে বলা হয়েছে, টাকা নেওয়ার দৃশ্যের ভিডিও ফুটেজও তদন্তকারীরা পেয়েছেন। পরে ১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের জন্য আবার ওই বাসায় যান রিয়াদ ও অপু। দরজা না খোলায় তাঁরা ফিরে যান। কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনা করেও ওই সময়ে তাঁদের ঘটনাস্থলে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২৬ জুলাই বিকেলে বাকি টাকা আদায়ের জন্য আবার সিদ্দিক আবু জাফরের বাসায় যান অভিযুক্তরা। সে সময় তিনি বাসায় ছিলেন না। নিরাপত্তাকর্মী মো. হান্নান ফোন করে তাঁকে বিষয়টি জানান। পরে তিনি গুলশান থানায় খবর দেন। পুলিশ গিয়ে আবদুর রাজ্জাক, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন ও কিশোর আমিনুল ইসলামকে আটক করে। জানে আলম অপু পালিয়ে গেলেও পরে ডিবির সহায়তায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

‘টাকার লোভ সামলাতে পারিনি’, জবানবন্দিতে রিয়াদ

গ্রেপ্তারের পর ছয় আসামির মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। দুজনের জবানবন্দিতেই ১০ লাখ টাকা নেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

রিয়াদ জবানবন্দিতে জানান, তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিবাদী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শাম্মী আহমেদের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে না পেয়ে ফেরার সময় অপু একটি ইয়ারপড নিয়ে আসেন। সেটিতে ‘শাম্মি ইয়ারপড’ লেখা ছিল। সেটি ফেরত দিতে তাঁরা সকাল ১০টার দিকে আবার ওই বাসায় যান। এ সময় অপু পানি খাওয়ার অজুহাতে বাসার ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে সিদ্দিক আবু জাফরকে বলা হয়, তাঁরা বুঝতে পারছেন তাঁর স্ত্রী বাসায় আছেন এবং তাঁকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে।

রিয়াদ জানান, তখন টাকা দেওয়ার প্রস্তাব এলে তাঁরা প্রথমে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। সিদ্দিক আবু জাফর ১০ লাখ টাকা দিতে রাজি হলে তাঁরা তা গ্রহণ করেন। পরে বাড্ডায় রিয়াদের বাসায় গিয়ে নিজেদের মধ্যে সমান ভাগ করে নেন।

বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের চেষ্টা সম্পর্কে রিয়াদ বলেন, ২৬ জুলাই বিকেল ৫টার দিকে তিনি ইব্রাহিম হোসেন, সাকাদাউন সিয়াম ও সাদমান সাদাবকে ওই বাসায় পাঠান। তাঁর দাবি, পুলিশ তাঁকে ফাঁদে ফেলার জন্য বাসায় যেতে বলে। পুলিশের কথা বিশ্বাস করে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর সিদ্দিক আবু জাফর থানায় খবর দেন। পরে পুলিশ এসে তাঁদের আটক করে।

জবানবন্দির শেষ দিকে নিজের অপরাধ স্বীকার করে রিয়াদ বলেন, ‘আমি গরিবের ছেলে। আমি টাকার লোভ সামলাতে পারিনি। আমি ক্ষমা চাই।’

টাকা দিয়ে মোটরসাইকেল কেনেন অপু

অন্য আসামি জানে আলম অপুও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলে দাবি করেন। যদিও পিবিআইয়ের তদন্তে ওই সময় তাঁর ঘটনাস্থলে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপু জানান, ১৭ জুলাই রাতে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে গুলশানে সাবেক এক নারী সংসদ সদস্যের অবস্থানের খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান। পরে পুলিশের সঙ্গে ওই বাসায় অভিযান চালানো হয়। শাম্মী আহমেদকে না পেয়ে তাঁরা ফিরে আসেন।

পরে রিয়াদ তাঁকে আবার ওই বাসায় নিয়ে যান। সেখানে সিদ্দিক আবু জাফরের কাছে টাকা চাওয়া হলে তিনি প্রথমে পাঁচ লাখ টাকা দিতে রাজি হন। কিন্তু রিয়াদ এক কোটি টাকা দাবি করেন। দীর্ঘ আলোচনার পর ৫০ লাখ টাকায় বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। তখন ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়।

অপুর ভাষ্য অনুযায়ী, রিয়াদের বাড্ডার বাসায় গিয়ে তাঁরা পাঁচ লাখ টাকা করে ভাগ করে নেন। নিজের ভাগের টাকা থেকে ৩ লাখ ৭ হাজার টাকা দিয়ে তিনি একটি ইয়ামাহা এফজেড-এক্স মোটরসাইকেল কেনেন। কিছু টাকা দিয়ে ধারদেনা পরিশোধ করেন। আরও ৫০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে গিয়ে ভুল নম্বরে চলে যায় বলে দাবি করেন তিনি। পরে তাঁর কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

অপু জবানবন্দিতে আরও বলেন, বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের জন্য রিয়াদ ফোন করলে তিনি যেতে অস্বীকৃতি জানান। পরে রিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।

টাকা, মুঠোফোন ও মোটরসাইকেল জব্দ

আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থান থেকে নগদ টাকা, মুঠোফোন ও মোটরসাইকেল জব্দ করেছে পিবিআই। আবদুর রাজ্জাকের দেখানো তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব বাড্ডার বৈঠাকালী এলাকার একটি বাসা থেকে ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ও একটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়।

অন্যদিকে জানে আলম অপুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরের নবীনগর এলাকার একটি বাসার গ্যারেজ থেকে ইয়ামাহা এফজেড-এক্স মোটরসাইকেল, একটি আইফোন ১১ এবং নগদ ১৭ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসামিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন। এই পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে তাঁরা নিয়মিত থানায় যাতায়াত করতেন। বিভিন্ন মামলার আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট আসামিদের গ্রেপ্তার এবং তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার কথা বলে পুলিশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, পরে তাঁরা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের দোসর, সহযোগী বা সমর্থক আখ্যা দিয়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি ও আদায় করতেন। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র, শুনানি ১০ নভেম্বর

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই ফিরোজ আহমেদ মুন্সী অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন, তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ এবং জানে আলম অপুর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩৮৫ ও ৩৮৬ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও ইব্রাহিম হোসেনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮ ও ৩৮৫ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

২০২৫ সালের ২৭ জুলাই গুলশান থানায় মামলাটি করেন ৭৫ বছর বয়সী সিদ্দিক আবু জাফর। মামলার নথি অনুযায়ী, তাঁর স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদ। প্রথমে গুলশান থানার এসআই মোখলেছুর রহমান মামলাটি তদন্ত করেন। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। সংস্থাটির এসআই ফিরোজ আহমেদ মুন্সী তদন্ত শেষে গত ১৫ অক্টোবর ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসামিদের একজন শিশু হওয়ায় তাঁর বিচার হবে শিশু আদালতে। আগামী ১০ নভেম্বর মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য রয়েছে। ওই দিন অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানি হওয়ার কথা। মামলার ছয় আসামিই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

মামলার প্রধান আসামি আবদুর রাজ্জাক রিয়াদের আইনজীবী আকরাম হোসাইন বলেছেন, তাঁরা এখনো অভিযোগপত্র দেখেননি। রিয়াদের পক্ষে আদালতে পিটিশন করবেন। অভিযোগপত্রের বিষয়ে রিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যবহৃত ফোন নম্বরটি এখন তাঁর বড় ভাই রেজাউল করিম ব্যবহার করছেন। মামলার বিষয়ে রিয়াদ আপাতত কথা বলতে চান না বলে জানান তাঁর ভাই।

অন্যদিকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত কৌঁসুলি মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী পরিচয় দেওয়া আবদুর রাজ্জাক রিয়াদ এই চাঁদাবাজির হোতা। তাঁকে ওই সময়ে আদালত একাধিকবার রিমান্ডে পাঠিয়েছিলেন। চাঁদাবাজির মামলায় প্রত্যেক আসামিকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী বিচার হলে তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি।

বাদী সিদ্দিক আবু জাফরের আইনজীবী জহুরুল আলম বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়ায় তাঁরা সন্তুষ্ট। তাঁরা ন্যায়বিচার চান।