মশা মারতে হাজার কোটি টাকা, তবু ডেঙ্গুর দাপট—ব্যর্থতার দায় কার?
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:৫৭:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
৯ বছরে ঢাকার দুই সিটির ব্যয় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। গাপ্পি মাছ, হাঁস, ব্যাঙাচি থেকে ড্রোন—মশা নিধনে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। কিন্তু বছর ঘুরতেই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কেন অধরা?
মশা মারতে কখনো ড্রেনে ছাড়া হয়েছে গাপ্পি মাছ, জলাশয়ে হাঁস ও ব্যাঙাচি। কখনো মশার ওষুধ ছিটাতে ব্যবহার করা হয়েছে ড্রোন। এর বাইরে নিয়মিত ফগিং, লার্ভিসাইড প্রয়োগ, বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত তো রয়েছেই। তবু ঢাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমছে না প্রত্যাশিত মাত্রায়।
গত নয় বছরে মশক নিধনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ব্যয় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। অথচ এই বিপুল ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, মশা মারার নানা উদ্যোগ থাকলেও এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর করা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়ে গেছে।
প্রশ্ন উঠছে, বছরের পর বছর অর্থ ব্যয় করেও কেন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী অগ্রগতি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? কোন উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়েছে, তার মূল্যায়নই বা হচ্ছে কীভাবে?
গাপ্পি মাছ থেকে ড্রোন—একেক বছর একেক উদ্যোগ
মশক নিধনে ব্যতিক্রমী উদ্যোগের শুরু ২০১৭ সালে। সে সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার ড্রেন ও নর্দমায় গাপ্পি মাছ ছাড়ার ঘোষণা দেন। উদ্দেশ্য ছিল, মাছের মাধ্যমে মশার লার্ভা ধ্বংস করা।
এরপর ২০২০ সালে মশার লার্ভা কমাতে বিভিন্ন জলাশয়ে পাঁচ শতাধিক হাঁস, পাঁচ মণ তেলাপিয়া মাছের পোনা এবং প্রায় ১০ হাজার ব্যাঙাচি ছাড়েন তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।
পরের বছর মশার ওষুধ ছিটাতে ড্রোন ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করতে বাসাবাড়ির ছাদে ড্রোন ওড়ানোর কৌশলও নেওয়া হয় তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলামের সময়ে।
এসব উদ্যোগের পাশাপাশি চলেছে ফগিং, লার্ভিসাইড প্রয়োগ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত।
কিন্তু এত আয়োজনের পরও মূল প্রশ্নটি অমীমাংসিত—এসব উদ্যোগের কোনটি কতটা কার্যকর হয়েছে? কোন পদ্ধতিতে মশার ঘনত্ব কমেছে, কত দিন সেই প্রভাব স্থায়ী হয়েছে এবং কোন উদ্যোগে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তার ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন কতটা হয়েছে?
৯ বছরে ব্যয় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মশক নিধনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ব্যয় প্রায় ৯৯৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যয় ৬৩৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ৩৬১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
অর্থাৎ, মশা নিয়ন্ত্রণে দুই সংস্থার ব্যয় কয়েক বছর ধরে বড় অঙ্কে পৌঁছেছে। কিন্তু ব্যয়ের সঙ্গে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ফলাফল মিলিয়ে দেখলে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে—অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে কী ধরনের জবাবদিহি রয়েছে?
নগর পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ, মশক নিধনে অর্থ ব্যয় হলেও সমস্যার মূল কারণ মোকাবিলায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, মশা মারার ওষুধ কেনা কিংবা নতুন ওষুধ আনার উদ্যোগের বাইরে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, নগর পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর কার্যকর সম্পৃক্ততা জরুরি। তাঁর মতে, শুধু ফগিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মশক নিধনের সামগ্রিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের দাবি, কিন্তু প্রশ্নও রয়েছে
দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের অবশ্য দাবি, এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগের তুলনায় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, আক্রান্তদের একটি বড় অংশ রাজধানীর বাইরের।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, গত দশ বছরের তুলনায় বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা সর্বনিম্ন বলে তাঁরা মনে করছেন। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসের সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর ঢাকা দুই সিটিতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ২১ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মারা গেছেন ১১৫ জন।
প্রশাসকদের বক্তব্যের পাশাপাশি তাই প্রয়োজন আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রবণতা, মশার ঘনত্ব এবং ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে সমন্বিত তথ্য বিশ্লেষণ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তা নির্ধারণে শুধু মোট রোগীর সংখ্যা নয়, সময় ও এলাকাভিত্তিক পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজধানীর বাইরে বাড়ছে উদ্বেগ
ডেঙ্গুর বিস্তার এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। কীটতত্ত্ববিদদের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে।
প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ৯৪ হাজার ছাড়িয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ২৯৪ জনের। শুধু সেপ্টেম্বরেই আক্রান্ত হয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন এবং মারা গেছেন ১৪৮ জন।
ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে খুলনা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে।
খুলনা বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। মারা গেছেন ৫৯ জন। অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালের মেঝেতেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানিয়েছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির পাশাপাশি সচেতনতামূলক প্রচারণা চলছে।
বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার জানান, এ বছর বিভাগটিতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মারা গেছেন ২৫ জন। পিরোজপুরে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। এরপর রয়েছে ঝালকাঠি ও বরগুনা।
চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের। রাজশাহী বিভাগে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৪৫৮ জন। সবচেয়ে কম রোগী শনাক্ত হয়েছে সিলেট বিভাগে।
এই চিত্র দেখাচ্ছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু ঢাকা শহরের মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করলেই চলবে না। জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়েও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রজননস্থল ধ্বংসে ঘাটতি কোথায়?
কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা মারার ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। জমে থাকা পানি, ছাদ ও বারান্দার পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন এবং অন্যান্য সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিয়মিত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এখানেই নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিচ্ছন্নতা অভিযান হচ্ছে, ওষুধ ছিটানো হচ্ছে—কিন্তু এসব কার্যক্রমের আওতায় কতটি প্রজননস্থল শনাক্ত হলো, কতটি ধ্বংস করা হলো এবং পুনরায় সেখানে লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে কি না, তার ধারাবাহিক মূল্যায়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ফল নিশ্চিত করা কঠিন।
ব্যয়ের হিসাব আছে, ফলাফলের জবাবদিহি কতটা?
মশক নিধনে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর এখন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি।
প্রথমত, কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং সেই ব্যয়ের বিপরীতে কী ফল পাওয়া গেছে? দ্বিতীয়ত, ফগিং ও লার্ভিসাইডের কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে কি না। তৃতীয়ত, এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের কাজে কতটা অগ্রগতি হয়েছে। চতুর্থত, নগর পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যাগুলো সমাধানে দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে কতটা সমন্বয় রয়েছে।
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু বাজেটের আকার দেখে মশক নিধন কার্যক্রমের সাফল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
একদিকে দুই সিটির দাবি, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সময়ে রাজধানীর বাইরে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধিও নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি শুধু কত টাকা খরচ হয়েছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, এই অর্থ ব্যয়ে মশার প্রজনন কতটা কমেছে, মানুষের সংক্রমণের ঝুঁকি কতটা হ্রাস পেয়েছে এবং সেই ফলাফল যাচাইয়ের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
মশা নিধনের উদ্যোগ যদি বছর বছর নতুন কৌশল আর ওষুধ কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ব্যয়ের অঙ্ক বাড়লেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে যাবে। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি উদ্যোগের ফলাফল পরিমাপ করা হবে, ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে কার্যকারিতার হিসাবও প্রকাশ করা হবে এবং ব্যর্থতা চিহ্নিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত মশক নিধনের সাফল্য নির্ধারিত হবে কত টাকা খরচ হলো তা দিয়ে নয়—কতটা কমল মশার বিস্তার, সংক্রমণ ও মানুষের মৃত্যু, তা দিয়ে।

























