এবার ‘মডেল খাল’ ভাবনা, পানির সঙ্গে বদলাবে গ্রামীণ জীবিকা
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:০০:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
শুধু পানি নিষ্কাশন নয়, খাল হবে জীবিকা ও কর্মসংস্থানের নতুন উৎস—এমন লক্ষ্য নিয়ে দেশে শুরু হতে যাচ্ছে ‘মডেল খাল’ কর্মসূচি। পুনঃখনন করা সরকারি খালগুলোকে পরিবেশ রক্ষা, সামাজিক বনায়ন, মৎস্য ও কৃষিকাজ এবং দরিদ্র মানুষের আয়মুখী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
প্রাথমিকভাবে দেশের ৮টি বিভাগের ২০টি সরকারি খালকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘মডেল খাল’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ১৯ নভেম্বর লালমনিরহাটে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ঠিক রেখে এর দুই পাড়ে সামাজিক বনায়ন, মৌসুমি সবজি চাষ, হাঁস পালন, মাছ চাষ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে।
খাল হবে আয়-রোজগারের নতুন ঠিকানা
সরকারের লক্ষ্য, খাল পুনঃখননের পর যেন আবার দখল, ময়লা-আবর্জনা বা পলি জমে নষ্ট না হয়। এজন্য স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে খাল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
মন্ত্রণালয়ের ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, খালের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় মানুষ যখন এখান থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, তখন তারাই খাল রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় খালগুলোকে কয়েকটি ব্যবহারের অঞ্চলে ভাগ করা হবে। কোথাও থাকবে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত অংশ, কোথাও মাছ ও হাঁস পালনের উৎপাদন অঞ্চল, আবার কোথাও নৌচলাচলের ব্যবস্থা।
খালের পাড়ে জলসহিষ্ণু ও ফলজ গাছ লাগানোর পাশাপাশি ঢালু অংশে মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষের সুযোগও রাখা হবে।
৮ বিভাগে ২০ খালে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম
প্রথম ধাপে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে তিনটি করে এবং রংপুর, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে দুটি করে খাল নির্বাচন করা হবে।
প্রায় ৬০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এসব খালে পরীক্ষামূলকভাবে বহুমুখী ব্যবহার চালু করা হবে।
তবে শুধু খনন করা হলেই কোনো খাল ‘মডেল খাল’ হবে না। খালের অবস্থান, পানি প্রবাহ, জমির মালিকানা, দখল পরিস্থিতি এবং স্থানীয় মানুষের ব্যবহার উপযোগিতা যাচাই করে চূড়ান্ত নির্বাচন করা হবে।
যুক্ত হবে দরিদ্র পরিবার, থাকবে সমবায় ব্যবস্থা
কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় অতিদরিদ্র পরিবার, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা দরিদ্র পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
উপকারভোগীদের নিয়ে গঠন করা হবে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো। এতে অন্তত ৫০ শতাংশ নারী সদস্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে খাল বা খালের পাড়ের সরকারি জমির ওপর কোনো ব্যক্তি বা সমবায়ের স্থায়ী মালিকানা থাকবে না। কেবল নির্দিষ্ট শর্তে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে।
বড় প্রকল্প নয়, ঘূর্ণায়মান তহবিলে চলবে কার্যক্রম
মডেল খাল কর্মসূচি বাস্তবায়নে আলাদা বড় কোনো প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে না। বিদ্যমান সরকারি কাঠামোর মধ্যেই জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে এটি পরিচালিত হবে।
প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই অর্থ অনুদান হিসেবে নয়, ঘূর্ণায়মান তহবিল হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
উৎপাদন থেকে আয় শুরু হলে স্থানীয় সমবায়গুলো নিজেদের খরচ নিজেরাই বহন করবে—এমন পরিকল্পনা রয়েছে।
লক্ষ্য আত্মনির্ভর গ্রাম, টেকসই জলসম্পদ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মডেল খালের মূল উদ্দেশ্য শুধু খাল রক্ষা নয়; বরং দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি জীবিকার সুযোগ তৈরি করা।
পাইলট পর্যায়ে ১২ মাস কার্যক্রম পরিচালনার পর ফলাফল মূল্যায়ন করে সারাদেশে এ মডেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের আশা, সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে খালগুলো আর শুধু পানি প্রবাহের পথ থাকবে না—গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের জীবিকার নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

























