রেডিওথেরাপির সিরিয়াল ২০২৮ সালে, ক্যান্সার রোগীর অপেক্ষা কত দিন?
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:২৮:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
ক্যান্সারের চিকিৎসায় ভরসা রেডিওথেরাপি, অথচ জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে সচল মাত্র দুটি মেশিন। অপেক্ষমাণ তালিকা ঠেকেছে ২০২৮ সালে। যন্ত্রের সংকটে চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, বাড়ছে রোগীদের ঝুঁকি।
ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেই চিকিৎসা পেতেই যদি একজন রোগীকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেডিওথেরাপির জন্য অপেক্ষমাণ তালিকা ২০২৮ সাল পর্যন্ত গড়ানোর তথ্য সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—রেডিওথেরাপির মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা কেন যন্ত্রসংকটে আটকে আছে? বাজেটের অভাব, নাকি প্রশাসনিক জটিলতা? আর নতুন মেশিন আসার আগ পর্যন্ত যেসব রোগীর চিকিৎসা জরুরি, তাঁদের কী হবে?
চার মাস ধরে যন্ত্রণা, তবু চিকিৎসার অপেক্ষা
৭০ বছর বয়সী লুৎফুন্নেছা লিলি কয়েক বছর ধরে ওরাল ক্যান্সারে ভুগছেন। চার মাস ধরে দাঁতের তীব্র যন্ত্রণাও সহ্য করছেন তিনি। তাঁর পরিবারের ভাষ্য, ক্যান্সার শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসার জন্য রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হলেও এখনো নির্দিষ্ট তারিখ পাননি তিনি।
লিলি বলেন, ‘চার মাস ধরে দাঁতের এই যন্ত্রণা হচ্ছে।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁর মেয়ে জানান, ছোটবেলা থেকেই মায়ের পান খাওয়ার অভ্যাস ছিল। সেই অভ্যাস ছাড়ানোর জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে বহু চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এখন মায়ের শারীরিক অবস্থা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। রেডিওথেরাপির তারিখ পাওয়ার আশায় হাসপাতালে এসেছেন তাঁরা।
একটি পরিবারের কাছে এই অপেক্ষা শুধু চিকিৎসার তারিখের অপেক্ষা নয়; এটি প্রিয়জনের যন্ত্রণা কমানোর আশায় প্রতিদিন কাটানো অনিশ্চিত সময়।
অপেক্ষমাণ তালিকা ২০২৮ সাল পর্যন্ত
জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সংকটের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে সিরিয়াল দেওয়া বন্ধ রয়েছে এবং অপেক্ষমাণ তালিকা ২০২৮ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছে।
রেডিওথেরাপিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে বিকিরণ প্রয়োগ করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা বা তাদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী এটি ক্যান্সারের চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
কিন্তু প্রয়োজনীয় সময়ে চিকিৎসা শুরু করা না গেলে রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে; কিছু ক্ষেত্রে তা প্রাণঘাতীও হতে পারে।
তাই প্রশ্ন শুধু অপেক্ষমাণ তালিকা কত দীর্ঘ, তা নয়—এই অপেক্ষার মধ্যে রোগীদের চিকিৎসার বিকল্প কী, সেটিও জরুরি।
সাতটি মেশিন, সচল মাত্র দুটি
জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে রেডিওথেরাপির জন্য সাতটি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে দুটি সচল, আর বাকি পাঁচটি দীর্ঘদিন ধরে অচল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এসব মেশিন নিলামে বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে।
একদিকে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের বড় অংশই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে সচল মেশিনগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে এবং দীর্ঘ হচ্ছে রোগীদের অপেক্ষা।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—পুরোনো মেশিন অচল হওয়ার পর বিকল্প ব্যবস্থা নিতে এত বিলম্ব হলো কেন? নতুন যন্ত্র কেনা ও স্থাপনের প্রক্রিয়ায় কোথায় বাধা রয়েছে?
প্রয়োজন ২০০ মেশিন, সরকারি হাসপাতালে মাত্র সাত
জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের পরিচালক ডা. সুমন আজিজের ভাষ্য, বাংলাদেশে ন্যূনতম ২০০টি রেডিওথেরাপি মেশিন প্রয়োজন। অথচ সরকারি হাসপাতালে রয়েছে মাত্র সাতটি।
তিনি জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পুরোনো কোবাল্ট মেশিনের মাধ্যমে রেডিওথেরাপি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব মেশিন বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় আর ব্যবহার করা হয় না বললেই চলে।
এই পরিস্থিতি দেশের ক্যান্সার চিকিৎসার অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। রোগীর চাহিদার সঙ্গে চিকিৎসার যন্ত্রপাতি ও সক্ষমতার ব্যবধান কতটা বড়, প্রয়োজনীয় মেশিনের সংখ্যা তারই একটি ইঙ্গিত।
চিকিৎসায় দেরি মানেই বাড়তি ঝুঁকি
ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সব রোগীর চিকিৎসা একই রকম নয়। কারও ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি, আবার কারও চিকিৎসার সময় ও পদ্ধতি নির্ধারিত হয় রোগের ধরন, পর্যায় এবং চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে।
তবে যেসব রোগীর দ্রুত রেডিওথেরাপি প্রয়োজন, তাঁদের দীর্ঘদিন অপেক্ষায় রাখা চিকিৎসাগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে। রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, ব্যথা ও অন্যান্য উপসর্গের অবনতি এবং চিকিৎসার জটিলতা—সবই উদ্বেগের বিষয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে প্রতিবছর ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা সময়মতো পৌঁছে দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ক্যান্সার একজন রোগীর শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। চিকিৎসার খরচ, দীর্ঘ অপেক্ষা, কর্মক্ষমতা হারানো এবং মানসিক চাপের প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপরও।
দুই ডজন মেশিন আনার প্রতিশ্রুতি
সংকটের মধ্যে আশার কথা শুনিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি জানিয়েছেন, দ্রুত প্রায় দুই ডজন রেডিওথেরাপি মেশিন আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে সারা দেশের রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসার চাপ কমাতে রেডিওথেরাপি সেবা বিকেন্দ্রীকরণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এ জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাপিং করে বিভিন্ন অঞ্চলে সেবা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তাঁর বক্তব্য।
তবে নতুন মেশিন কেনা, স্থাপন, প্রয়োজনীয় জনবল প্রস্তুত করা এবং সেবা চালু করতে কত সময় লাগবে—তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কারণ রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজন কোনো প্রশাসনিক সময়সূচি মেনে অপেক্ষা করে না।
শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ হবে কার অপেক্ষা?
একদিকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত গড়ানো রেডিওথেরাপির সিরিয়াল, অন্যদিকে অচল পাঁচটি মেশিন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রের ঘাটতি, চিকিৎসার বাড়তি চাহিদা এবং সেবা বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজন—সব মিলিয়ে দেশের ক্যান্সার চিকিৎসাব্যবস্থার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রশ্ন তাই শুধু নতুন মেশিন কবে আসবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, যাঁদের চিকিৎসা এখনই প্রয়োজন, তাঁদের জন্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা কী? যন্ত্র কেনা ও স্থাপনের নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে কি? আর নতুন মেশিন চালু হলে অপেক্ষমাণ রোগীদের চিকিৎসা কীভাবে অগ্রাধিকার দিয়ে শুরু করা হবে?
ক্যান্সার রোগীর জন্য সময়ের মূল্য অপরিসীম। তাই এখন দেখার বিষয়—প্রতিশ্রুত মেশিন কত দ্রুত চালু হয়, আর চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলো কত দ্রুত সেবা পান।

























