গভীর সমুদ্রে আবহাওয়ার খবরই পৌঁছায় না
মৃত্যুর পর ৫০ হাজার, মৃত্যুর আগে নিরাপত্তা কত?
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:২০:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
কক্সবাজারে ৬৪ হাজারের বেশি নিবন্ধিত জেলে, ৫ হাজার ২৫০ ট্রলার; অথচ ৭২ অনুমোদিত পদের ৪৮টিই শূন্য। সাগরে যাওয়ার আগে সব ট্রলারে নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, তারও নেই স্পষ্ট হিসাব।
দুর্ঘটনায় নিহত নিবন্ধিত জেলের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা এবং আহতদের ৩০ হাজার টাকা সরকারি সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা মৎস্য অফিস। কিন্তু সাগরে একটি জীবন হারানোর পর দেওয়া এই অর্থ কি সেই জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে?
প্রশ্নটি তাই ক্ষতিপূরণের অঙ্কে নয়, বরং দুর্ঘটনার আগের ব্যবস্থাপনায়—সাগরে নামার আগে একজন জেলের গায়ে লাইফজ্যাকেট ছিল কি না, ট্রলারের ফিটনেস ঠিক ছিল কি না, আবহাওয়ার সতর্কবার্তা তাঁর কাছে পৌঁছেছিল কি না, জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল কি না।
মহেশখালীর সোনাদিয়া চ্যানেলে গত ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে ফরিদুল আলমের মাছ ধরার ট্রলার এফবি তাহসিন ডুবে যাওয়ার ঘটনা সেই প্রশ্নগুলোই নতুন করে সামনে এনেছে।
আটজনের ট্রলার, লাইফজ্যাকেট ছিল না কারও
ঝোড়ো বাতাস ও উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে ডুবে যায় ট্রলারটি। এতে ছিলেন আটজন জেলে। চারজন কোনোভাবে সাঁতরে তীরে ফিরতে সক্ষম হলেও নিখোঁজ হন আরও চারজন।পরে স্থানীয় জেলেদের তল্লাশিতে ফয়েজ আহমেদ ও সাইফুল ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নুরুল ও মুহিবের আর কোনো সন্ধান মেলেনি।
এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর একটি—ডুবে যাওয়ার সময় কোনো জেলের গায়েই লাইফজ্যাকেট ছিল না। বেঁচে যাওয়া জেলেরা জানান, ভাসমান বস্তু আঁকড়ে ধরে তাঁরা সাঁতরে তীরে ফিরেছেন।
সেখানেই বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—আটজন মানুষের জীবন নিয়ে সাগরে যাওয়া একটি ট্রলারে অন্তত জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেটগুলো নিশ্চিত করা গেল না কেন?
বছরে কত জেলে মারা যান, পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই
কক্সবাজারের উপকূলজুড়ে মাছ ধরেন হাজার হাজার মানুষ। জেলা মৎস্য অফিসের হিসাবে, নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬৪ হাজার ৪২৮। তালিকাভুক্ত মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে ৫ হাজার ২৫০টি।
নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে সমুদ্রনির্ভর জেলের সংখ্যা আরও বেশি। কিন্তু এত বড় জনগোষ্ঠীর দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পূর্ণাঙ্গ চিত্রই নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, গত এক বছরে কক্সবাজার উপকূলে আনুমানিক ৭ থেকে ৮টি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব দুর্ঘটনায় মোট কতজন মারা গেছেন, কতজন আহত হয়েছেন কিংবা কতজন এখনো নিখোঁজ—তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিতে পারেনি দপ্তরটি।
চলতি বছরেও কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে জেলা পর্যায়ের তথ্যে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে—দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্রই যদি স্পষ্ট না থাকে, তাহলে জেলেদের নিরাপত্তার পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে কোন তথ্যের ভিত্তিতে?
৬৪ হাজার জেলের বিপরীতে মাঠে জনবল কত?
কক্সবাজার জেলা মৎস্য অফিসে অনুমোদিত পদ রয়েছে ৭২টি। এর মধ্যে ৪৮টি পদই শূন্য। কর্মরত আছেন মাত্র ২৪ জন।
তাঁদের সবাই আবার সরাসরি ট্রলার পরিদর্শন বা মাঠপর্যায়ের তদারকিতে নিয়োজিত নন। অর্থাৎ ৫ হাজার ২৫০টি ট্রলার এবং ৬৪ হাজারের বেশি নিবন্ধিত জেলের বিপরীতে বাস্তবে মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকির জনবল আরও কম।
কুতুবদিয়া, টেকনাফ ও মহেশখালীতে প্রতিটি উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার করে জেলে রয়েছেন। অথচ কুতুবদিয়ায় কর্মরত মাত্র একজন, টেকনাফে একজন এবং মহেশখালীতে তিনজন কর্মকর্তা। ঈদগাঁও ও নতুন সৃষ্ট মাতামুহুরী উপজেলায় নেই কোনো কর্মকর্তা।
একটি উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার জেলের নিরাপত্তা ও হাজার হাজার ট্রলারের তদারকিতে একজন বা দুজন কর্মকর্তা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন—সেটিও তাই বড় প্রশ্ন।
শুধু জনবল সংকট, নাকি নজরদারিতেও ঘাটতি?
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব শুধু ট্রলার তদারকিতে সীমাবদ্ধ নয়। হ্যাচারি, পোনা উৎপাদন, মাছ ধরা বন্ধসংক্রান্ত কার্যক্রম, শুঁটকি, জেলে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা, বোট রেজিস্ট্রেশন, জেলে নিবন্ধন, মৎস্যখাদ্যসহ নানা কাজ তাঁদের করতে হয়।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদাও জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও তদারকিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে জনবল সংকটে তাঁদের বেগ পেতে হয়।
কিন্তু জনবল কম হলে বিকল্প তদারকি ব্যবস্থা কোথায়? সাগরে যাওয়ার আগে প্রতিটি ট্রলারে লাইফজ্যাকেট, লাইফবয়া, যোগাযোগযন্ত্র ও অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম পরীক্ষা করার ব্যবস্থা কি থাকতে পারে না? নিয়মিত চেকপোস্টই বা থাকবে না কেন?
গভীর সমুদ্রে আবহাওয়ার খবরই পৌঁছায় না
জেলেদের নিরাপত্তার আরেকটি বড় দুর্বলতা আবহাওয়ার তথ্য পৌঁছানো নিয়ে। কক্সবাজার মাঝি-মাল্লা শ্রমজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি নুরুল বশরের অভিযোগ, গভীর সমুদ্রে থাকা জেলেদের কাছে অনেক সময় ঠিকমতো আবহাওয়ার খবর পৌঁছায় না। নেটওয়ার্ক না থাকায় তাঁরা সতর্কবার্তাও পান না।
ফলে সমুদ্রের পরিস্থিতি বুঝতে তাঁদের অনেকটাই অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতে হয়।
নুরুল বশরের দাবি, সভা-সেমিনারে বহুবার জেলেদের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরা হলেও বাস্তবে আশ্বাসের বাইরে তেমন অগ্রগতি দেখা যায় না।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগে কিছু ডিভাইস দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন করে এআই ডিভাইস আনার পরিকল্পনা চলছে।
এখানেও প্রশ্ন—পুরোনো ডিভাইস নষ্ট হওয়ার পর নতুন ব্যবস্থা চালু হতে এত সময় লাগল কেন? আর নতুন প্রযুক্তি চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত সমুদ্রে থাকা জেলেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা কী?
ট্রলারে নিরাপত্তা সরঞ্জাম আছে কি না, তারও স্পষ্ট হিসাব নেই
একটি মাছ ধরার ট্রলারে লাইফজ্যাকেট, লাইফবয়া, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, যোগাযোগযন্ত্র, নেভিগেশন ব্যবস্থা ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকা জরুরি।
কিন্তু ফিশারীঘাটে সরেজমিনে এসব নিরাপত্তা সরঞ্জামের উপস্থিতি নিয়ে সন্তোষজনক চিত্র পাওয়া যায়নি। জেলেদের অভিযোগ, ট্রলারগুলো নিয়মিত তদারকি করা হয় না। মৌসুম শুরু হলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে তাঁরা সাগরে চলে যান।
অন্যদিকে কোস্টগার্ডের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রলারে লাইফজ্যাকেট, লাইসেন্স ও ফিটনেস তদারকি করা হয়। তবে সব ট্রলার বা নৌযানে শতভাগ নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এখনো সম্ভব হয়নি।
অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বক্তব্যেই উঠে আসছে একটি বাস্তবতা—নিরাপত্তা সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক হলেও সব ট্রলারে তা নিশ্চিত করা যায়নি।
একের পর এক দুর্ঘটনা, একই প্রশ্ন
৩ সেপ্টেম্বরের দুর্ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত ১৩ জুলাই কুতুবদিয়ার কাছে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ে ১২ জন জেলেসহ একটি ট্রলার ডুবে যায়। সাতজন ফিরে এলেও নিখোঁজ হন পাঁচজন। পরে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এর আগে ৯ জানুয়ারি কুতুবদিয়ার অমজাখালী এলাকায় ১১ জেলেসহ একটি ট্রলার ডুবে যায়। আটজন আহত অবস্থায় উদ্ধার হন। পরে দুজনের মরদেহ পাওয়া যায়। নিখোঁজ থাকে ১২ বছরের কিশোর জেলে ফয়সাল।
অর্থাৎ কখনো বৈরী আবহাওয়া, কখনো যান্ত্রিক ত্রুটি, আবার কখনো নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি—বিভিন্ন কারণ সামনে এলেও দুর্ঘটনা থামছে না।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর যদি একই ধরনের ঘাটতি থেকে যায়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—এসব কি কেবল দুর্ভাগ্য, নাকি কিছু মৃত্যু আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল?
৫ হাজার ২৫০ ট্রলারের কতটি পরীক্ষা হয়েছে?
অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি এখানেই। কক্সবাজারে তালিকাভুক্ত ৫ হাজার ২৫০টি ট্রলারের মধ্যে গত এক বছরে কতটি পরিদর্শন করা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি মৎস্য বিভাগ।
কতটি ট্রলারে লাইফজ্যাকেট ছিল না, কতটিতে লাইফবয়া বা অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা অনুপস্থিত ছিল, কতটি ট্রলারের ফিটনেসে সমস্যা পাওয়া গেছে এবং কতটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নেরও পরিষ্কার উত্তর নেই।
এমনকি কোন কোন নিরাপত্তা সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক এবং নিয়ম ভাঙলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে স্পষ্টতা পাওয়া যায়নি। তাহলে প্রশ্ন উঠছে—নিয়ম আছে, কিন্তু প্রয়োগ কতটা?
চেকপোস্টের কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবায়ন কবে?
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনে করেন, ট্রলার সমুদ্রে যাওয়ার আগে নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে চেকপোস্ট প্রয়োজন। সেখানে লাইফজ্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম যাচাই করা সম্ভব হবে।
তিনি জানিয়েছেন, সাগরে যাওয়ার আগেই লাইফজ্যাকেট নিশ্চিত করা এবং জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কিন্তু সেই ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিদিন যারা সমুদ্রে যাচ্ছেন, তাঁদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? কারণ ঝড়ের মধ্যে একটি লাইফজ্যাকেট কখনো কখনো একজন জেলেকে তীরে ফেরার সুযোগ দিতে পারে। বিপরীতে সেটির অনুপস্থিতি পরিণত হতে পারে নিখোঁজের খবরে, পরে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায়।
প্রশ্নটা তাই ক্ষতিপূরণের অঙ্কে নয়
কক্সবাজারে ৬৪ হাজারের বেশি নিবন্ধিত জেলে, ৫ হাজার ২৫০টি তালিকাভুক্ত ট্রলার। অথচ জেলা মৎস্য অফিসের ৭২টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৪৮টিই শূন্য।
গভীর সমুদ্রে আবহাওয়ার সংকেত ঠিকমতো পৌঁছায় না। সব ট্রলারে নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা যায়নি। দুর্ঘটনায় নিহত, আহত ও নিখোঁজ জেলেদের পূর্ণাঙ্গ হিসাবও নেই। আবার উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তথ্যেও অসামঞ্জস্য রয়েছে।
তাই মূল প্রশ্নটি শুধু ‘আর কত জেলে মারা যাবেন?’ নয়। প্রশ্ন হলো—সাগরে নামার আগেই তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? জনবল ঘাটতি, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, নজরদারির দুর্বলতা—কোন জায়গায় সবচেয়ে বড় ফাঁক?
৩ সেপ্টেম্বরের সোনাদিয়া চ্যানেলের দুর্ঘটনা হয়তো দুর্ঘটনার তালিকায় আরেকটি ঘটনা হয়ে থাকবে। কিন্তু পরবর্তী ঝড়ের আগে যদি একই ঘাটতিগুলো থেকে যায়, তাহলে আবারও কি কোনো ট্রলার ডুববে, কেউ নিখোঁজ হবেন, মরদেহ উদ্ধার হবে—তারপর শুরু হবে নতুন করে আশ্বাস?
মৃত্যুর পর ৫০ হাজার টাকা হয়তো সরকারি সহায়তা। কিন্তু একজন জেলের জীবন বাঁচাতে মৃত্যুর আগেই কতটুকু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—সেই হিসাবটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।


























