ঢাকা ০৬:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

শেষ পর্যন্ত সেই জামাল উদ্দিনও চলে গেলেন

মোঃ মশিউর রহমান, টাঙ্গাইল
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:১৩:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

একসময় জীবিকার তাগিদে পাড়ি দিয়েছিলেন সৌদি আরবে। দীর্ঘদিন প্রবাসে কাটিয়ে কয়েক মাস আগে অসুস্থ শরীর নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন জামাল উদ্দিন। দেশে ফিরে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাও করতে পারছিলেন না। জীবনের শেষ সময়টুকু আপনজনদের পাশে কাটবে—সম্ভবত এমনটাই ছিল তাঁর প্রত্যাশা।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হলো একেবারেই অন্যভাবে।

অসুস্থ অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকার পর স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার হওয়া টাঙ্গাইলের সখীপুরের সেই প্রবাসফেরত জামাল উদ্দিন (৫৫) আর নেই।

সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেল ৩টার দিকে ভাতিজি ইসমত আরার বাড়িতে মারা যান তিনি। ইসমত আরা তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

রাতের রাস্তায় পড়ে ছিলেন অসুস্থ মানুষটি

গত ২ আগস্ট রাতে সখীপুর উপজেলার কালমেঘা এলাকায় অসুস্থ জামাল উদ্দিনকে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে।

রাতে অসুস্থ এক মানুষকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয় উদ্বেগ। পরদিন তাঁকে উদ্ধার করে ভাতিজি ইসমত আরার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। অসুস্থ একজন মানুষকে কীভাবে এমন অবস্থায় রাস্তায় ফেলে রাখা হলো—এই প্রশ্নে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।

অন্যের সহায়তায় চলছিল চিকিৎসা

জামাল উদ্দিন দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। কয়েক মাস আগে অসুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না।

রাস্তায় পড়ে যাওয়ার ঘটনার পরও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসেন স্থানীয়রাই। এলাকাবাসীর আর্থিক সহায়তায় গত ৬ আগস্ট তাঁকে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

সেখানে প্রায় এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

ইসমত আরা জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক সপ্তাহ চিকিৎসা নেওয়ার পর গত শুক্রবার তাঁর চাচাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেখানেই সোমবার বিকেলে তাঁর মৃত্যু হয়।

শেষ সময়ে পাশে ছিলেন না স্বজনেরা—এমন অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তায় ফেলে যাওয়ার পর প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও জামাল উদ্দিনের স্ত্রী ও সন্তানরা তাঁর খোঁজ নেননি।

তবে তাঁর স্ত্রী রিনা আক্তার ভিন্ন দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, প্রায় আড়াই মাস আগে তিনি জামাল উদ্দিনকে তালাক দিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে পরিবারের বক্তব্য ও স্থানীয়দের অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও জামাল উদ্দিনের শেষ সময়ের বাস্তবতা ছিল নির্মম—অসুস্থ অবস্থায় তিনি চিকিৎসা পেয়েছেন অন্যের সহায়তায়, আশ্রয় পেয়েছেন ভাতিজির বাড়িতে।

প্রবাসে কাটানো জীবনের শেষ ঠিকানা হলো অন্যের ঘর

বছরের পর বছর বিদেশের মাটিতে কাজ করেছেন জামাল উদ্দিন। প্রবাসজীবনের কষ্ট সহ্য করে হয়তো ভেবেছিলেন, একদিন দেশে ফিরবেন, আপনজনদের কাছে থাকবেন। কিন্তু দেশে ফেরার পর অসুস্থতা কেড়ে নেয় তাঁর স্বাভাবিক জীবন।

তারপর এক রাতে রাস্তায় পড়ে থাকা। মানুষের সহায়তায় উদ্ধার। স্থানীয়দের অর্থে চিকিৎসা। আর শেষ পর্যন্ত ভাতিজির বাড়িতে নিঃশব্দ বিদায়।

একজন অসুস্থ মানুষের জীবনের শেষ সময়টুকুতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল যত্ন, নিরাপত্তা ও আপনজনের সঙ্গ। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে জামাল উদ্দিনের শেষ দিনগুলো এখন স্থানীয়দের মনে রেখে গেছে একাধিক প্রশ্ন।

কে তাঁর পাশে থাকার কথা ছিল, আর শেষ পর্যন্ত কারা পাশে দাঁড়ালেন—এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো জামাল উদ্দিন আর দিতে পারবেন না।

তবে তাঁর মৃত্যুর পরও ঘটনাটি একটি কঠিন বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে—জীবনের শেষ সময়ে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো অর্থ নয়, বরং একটু আশ্রয়, একটু যত্ন আর পাশে থাকার মতো একজন মানুষ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

শেষ পর্যন্ত সেই জামাল উদ্দিনও চলে গেলেন

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:১৩:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

একসময় জীবিকার তাগিদে পাড়ি দিয়েছিলেন সৌদি আরবে। দীর্ঘদিন প্রবাসে কাটিয়ে কয়েক মাস আগে অসুস্থ শরীর নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন জামাল উদ্দিন। দেশে ফিরে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাও করতে পারছিলেন না। জীবনের শেষ সময়টুকু আপনজনদের পাশে কাটবে—সম্ভবত এমনটাই ছিল তাঁর প্রত্যাশা।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হলো একেবারেই অন্যভাবে।

অসুস্থ অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকার পর স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার হওয়া টাঙ্গাইলের সখীপুরের সেই প্রবাসফেরত জামাল উদ্দিন (৫৫) আর নেই।

সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেল ৩টার দিকে ভাতিজি ইসমত আরার বাড়িতে মারা যান তিনি। ইসমত আরা তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

রাতের রাস্তায় পড়ে ছিলেন অসুস্থ মানুষটি

গত ২ আগস্ট রাতে সখীপুর উপজেলার কালমেঘা এলাকায় অসুস্থ জামাল উদ্দিনকে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে।

রাতে অসুস্থ এক মানুষকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয় উদ্বেগ। পরদিন তাঁকে উদ্ধার করে ভাতিজি ইসমত আরার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। অসুস্থ একজন মানুষকে কীভাবে এমন অবস্থায় রাস্তায় ফেলে রাখা হলো—এই প্রশ্নে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।

অন্যের সহায়তায় চলছিল চিকিৎসা

জামাল উদ্দিন দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। কয়েক মাস আগে অসুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না।

রাস্তায় পড়ে যাওয়ার ঘটনার পরও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসেন স্থানীয়রাই। এলাকাবাসীর আর্থিক সহায়তায় গত ৬ আগস্ট তাঁকে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

সেখানে প্রায় এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

ইসমত আরা জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক সপ্তাহ চিকিৎসা নেওয়ার পর গত শুক্রবার তাঁর চাচাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেখানেই সোমবার বিকেলে তাঁর মৃত্যু হয়।

শেষ সময়ে পাশে ছিলেন না স্বজনেরা—এমন অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তায় ফেলে যাওয়ার পর প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও জামাল উদ্দিনের স্ত্রী ও সন্তানরা তাঁর খোঁজ নেননি।

তবে তাঁর স্ত্রী রিনা আক্তার ভিন্ন দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, প্রায় আড়াই মাস আগে তিনি জামাল উদ্দিনকে তালাক দিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে পরিবারের বক্তব্য ও স্থানীয়দের অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও জামাল উদ্দিনের শেষ সময়ের বাস্তবতা ছিল নির্মম—অসুস্থ অবস্থায় তিনি চিকিৎসা পেয়েছেন অন্যের সহায়তায়, আশ্রয় পেয়েছেন ভাতিজির বাড়িতে।

প্রবাসে কাটানো জীবনের শেষ ঠিকানা হলো অন্যের ঘর

বছরের পর বছর বিদেশের মাটিতে কাজ করেছেন জামাল উদ্দিন। প্রবাসজীবনের কষ্ট সহ্য করে হয়তো ভেবেছিলেন, একদিন দেশে ফিরবেন, আপনজনদের কাছে থাকবেন। কিন্তু দেশে ফেরার পর অসুস্থতা কেড়ে নেয় তাঁর স্বাভাবিক জীবন।

তারপর এক রাতে রাস্তায় পড়ে থাকা। মানুষের সহায়তায় উদ্ধার। স্থানীয়দের অর্থে চিকিৎসা। আর শেষ পর্যন্ত ভাতিজির বাড়িতে নিঃশব্দ বিদায়।

একজন অসুস্থ মানুষের জীবনের শেষ সময়টুকুতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল যত্ন, নিরাপত্তা ও আপনজনের সঙ্গ। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে জামাল উদ্দিনের শেষ দিনগুলো এখন স্থানীয়দের মনে রেখে গেছে একাধিক প্রশ্ন।

কে তাঁর পাশে থাকার কথা ছিল, আর শেষ পর্যন্ত কারা পাশে দাঁড়ালেন—এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো জামাল উদ্দিন আর দিতে পারবেন না।

তবে তাঁর মৃত্যুর পরও ঘটনাটি একটি কঠিন বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে—জীবনের শেষ সময়ে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো অর্থ নয়, বরং একটু আশ্রয়, একটু যত্ন আর পাশে থাকার মতো একজন মানুষ।