শাপলা চত্বর হত্যা মামলা
হাসিনা-আজিজ-বেনজীরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৪:১৬:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
রাজধানীর শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক বিজিবি মহাপরিচালক আজিজ আহমেদ, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
সোমবার (২৭ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ অভিযোগটি আমলে নেওয়ার পর বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংঘটিত ঘটনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের আওতায় ‘গণহত্যা (জেনোসাইড)’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় পুলিশ, বিজিবি, র্যাব এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে অভিযান চালিয়েছিল। তবে তৎকালীন সরকারের সময়ে এ ঘটনায় কোনো তদন্ত বা বিচার হয়নি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত হলে এক ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয় এবং তদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।
তিনি জানান, তদন্তে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’, হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা মোট ৬১ জন নিহত হওয়ার তথ্য পেয়েছেন। এর মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও তিনজনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
অভিযোগপত্রে দুটি পৃথক ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর একটি ৫ মে দিবাগত রাতে শাপলা চত্বরে ৩২ জন নিহত হওয়ার ঘটনা এবং অন্যটি পরদিন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জন নিহত হওয়ার ঘটনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩(সি) ধারায় এই দুই ঘটনার জন্য ৪১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন হত্যাকাণ্ডকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অভিযোগে এসব কর্মকাণ্ডকে অপরাধে সহায়তার (অ্যাবেটমেন্ট) অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ‘সমীকরণ’ নামে একটি সম্প্রচার এবং একাত্তর টেলিভিশনের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবুসহ কয়েকজনের নাম অভিযোগপত্রে রয়েছে বলে জানান তিনি।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. আব্দুর রাজ্জাক, মাহবুব উল আলম হানিফ, ড. হাছান মাহমুদ, বাহাউদ্দিন নাছিম, লতিফ সিদ্দিকী, মৃণাল কান্তি দাস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, দীপু মনি, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ওমর ফারুক চৌধুরী, সালাউদ্দিন মাহমুদ (জাহিদ), ডা. ইমরান এইচ সরকার, শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল হক বাবু, ফারজানা রূপা, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, বেনজীর আহমেদ, সাবেক র্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান, সাবেক বিজিবি মহাপরিচালক জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাবেক এনটিএমসি প্রধান জিয়াউল আহসান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, মোহাম্মদ আব্দুল জলিল মণ্ডল, শেখ মোহাম্মদ মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন, মনিরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, আশরাফুজ্জামান, এম এম মেহেদী হাসান, মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান, শিবলী নোমান এবং মতিঝিল থানার তৎকালীন ওসি ফরমান আলী।
চিফ প্রসিকিউটর দাবি করেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন মন্ত্রিসভার সদস্যরা বৈঠকের মাধ্যমে হেফাজতের সমাবেশ ভণ্ডুলের পরিকল্পনা করেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয় এবং মধ্যরাতে চারদিক থেকে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে সাউন্ড গ্রেনেড, গ্রেনেড ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
তিনি বলেন, তদন্তে পাওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই ৪১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, তবে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে তা অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ট্রাইব্যুনাল পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পাশাপাশি আগামী ১৬ আগস্ট মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন। ওই দিনের মধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শেষে অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। পাশাপাশি মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে স্পিডি ট্রায়ালের আবেদনও করা হয়েছে।




















