বাংলা টাইমস এক্সপ্লেইনার
হাসনাতদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ কি ‘প্রোপাগান্ডা’? বিতর্কের কেন্দ্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৩৯:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬ ৪১ বার পড়া হয়েছে
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অভিযোগ করেছে, বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া লিমিটেডের আওতাধীন কয়েকটি সংবাদমাধ্যম তাদের নেতা ও দলের দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে ‘মিথ্যাচার’ ও ‘সংঘবদ্ধ প্রোপাগান্ডা’ চালাচ্ছে। তবে দলটির এই অভিযোগ নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সামনে এনেছে—জনস্বার্থে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা কি গণমাধ্যমের অধিকার নয়?
শুক্রবার (৩ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এনসিপি দাবি করে, সাংবাদিকতার নীতিমালা উপেক্ষা করে কিছু সংবাদমাধ্যম প্রমাণ ছাড়া তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ করছে। দলটির ভাষ্য, এসব প্রতিবেদন জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বকে জনসম্মুখে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, জাতীয় সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহ কয়েকটি গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ তোলার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সংখ্যা বেড়ে যায়। পাশাপাশি দলটি একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনেরও দাবি জানায়।
অন্যদিকে গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এনসিপির একাধিক নেতা, অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং সাবেক ছাত্রনেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে নিয়োগে প্রভাব বিস্তার, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ, ব্যবসায়িক সুবিধা গ্রহণ, রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহারে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরেও একাধিক প্রতিবেদনে তার ঘনিষ্ঠদের ব্যবসায়িক সুবিধা, বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে, এসব প্রতিবেদনে নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে। তবে হাসনাত আবদুল্লাহ ও তার ঘনিষ্ঠরা বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
একই ধরনের অভিযোগ এনসিপির আরও কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়নি এবং কিছু তথ্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় থাকা বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারকারী যে কোনো ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড জনস্বার্থের বিষয়। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধান করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকাশ করা সাংবাদিকতার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তবে সেই অনুসন্ধান অবশ্যই হতে হবে তথ্যনির্ভর, ন্যায্য এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্যসংবলিত।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি যদি কোনো প্রতিবেদনে অসত্য তথ্য রয়েছে বলে মনে করেন, তাহলে তারাও প্রতিবাদ, ব্যাখ্যা, আইনি প্রতিকার বা প্রেস কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু সব সমালোচনামূলক প্রতিবেদনকে এককথায় ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে প্রত্যাখ্যান করলে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমের কাজ কেবল সরকারের নয়, ক্ষমতার প্রতিটি কেন্দ্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা। সেই ক্ষমতার কেন্দ্র পুরোনো রাজনৈতিক দল, নতুন রাজনৈতিক শক্তি কিংবা জনপ্রিয় কোনো নেতার হাতেই থাকুক না কেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মানদণ্ড সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।
অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে প্রতিটি প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তথ্যের যথাযথ যাচাই, নির্ভরযোগ্য নথির ব্যবহার, একাধিক সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরা। কোনো তথ্য ভুল প্রমাণিত হলে তা দ্রুত সংশোধন করাও গণমাধ্যমের পেশাগত দায়।
সব মিলিয়ে এনসিপির অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন—উভয়ই এখন জনপরিসরে আলোচনার বিষয়। তবে শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষের অবস্থান অধিকতর গ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারিত হবে তথ্য, নথি, স্বাধীন তদন্ত, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং জনসম্মুখে জবাবদিহির ভিত্তিতে; রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়।




















