বাবার স্মৃতিগুলো শুধু কাঁদায় না, বাঁচতেও শেখায়
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:২৯:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬ ৫৬ বার পড়া হয়েছে
সময় এগিয়ে গেছে অনেকটা পথ। জীবন এখন অনেকটাই বদলে গেছে, চারপাশে ব্যস্ততা বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে—তবুও কিছু স্মৃতি আছে যা সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না। বরং আরও গভীরভাবে বুকের ভেতর জায়গা করে নেয়। বাবার স্মৃতিগুলো ঠিক তেমনই।
আজও কোনো নীরব বিকেলে হঠাৎ মনে পড়ে যায় তাঁর মুখটা। সেই পরিচিত ডাক, সেই শান্ত অথচ দৃঢ় উপস্থিতি—যা একসময় ঘরকে নিরাপদ করে রাখত। এখন সেই ঘরে নীরবতা আছে, কিন্তু সেই নিরাপত্তার ছায়া আর নেই।
দেখতে দেখতে কেটে গেছে ১৩টি বছর। সময় বদলেছে, জীবন বদলেছে, চারপাশে অনেক কিছুই নতুন হয়েছে—শুধু একটা জায়গা আজও ফাঁকা রয়ে গেছে। সেটা বাবার জায়গা।
বাবা চলে যাওয়ার পর প্রথম যে বিষয়টা মানুষ বুঝতে শেখে, তা হলো—একজন মানুষ শুধু সংসারের অভিভাবক নন, তিনি পুরো পরিবারের সাহস। তিনি থাকলে ঝড়ও যেন ছোট মনে হয়। আর তিনি না থাকলে ছোট কষ্টও পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়।
১৩ বছর আগে অর্থাৎ ২০১৩ সালের ১৫ মে বাবাকে হারিয়েছিলাম, সেদিন হয়তো পুরো পৃথিবী থেমে যায়নি। রাস্তায় গাড়ি চলেছে, মানুষ স্বাভাবিক জীবন কাটিয়েছে, সূর্যও ঠিকই উঠেছিল। কিন্তু আমার ভেতরের একটা পৃথিবী সেদিন নিঃশব্দে ভেঙে গিয়েছিল।
আমার বাবা শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন আলোর পথ দেখানো একজন মানুষ। শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের ভেতরে তিনি যেমন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দিতেন, তেমনি জীবনের মূল্যবোধও শেখাতেন নিঃস্বার্থভাবে।
আজও অনেক মানুষ বাবার কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। কেউ বলেন তিনি ছিলেন কঠোর কিন্তু ন্যায়বান, কেউ বলেন তিনি ছিলেন অভিভাবকের মতো একজন শিক্ষক। আর আমি জানি—তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের আদর্শ মানুষ।
বাবার জীবনে অর্থ কিংবা প্রভাবের চেয়ে সততা আর দায়িত্ববোধের মূল্য ছিল অনেক বেশি। খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন, কিন্তু চিন্তা আর আদর্শে ছিলেন অনেক বড়। তিনি সবসময় বলতেন, “মানুষ হিসেবে ভালো হওয়াটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা।”
বাবারা সাধারণত খুব বেশি আবেগ দেখান না। কিন্তু তাদের ভালোবাসা থাকে সবচেয়ে গভীরে। নিজের স্বপ্নগুলো চাপা দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করাই যেন তাদের নীরব দায়িত্ব।
আজ এত বছর পর বুঝি, বাবার শাসন ছিল মমতা, তার কষ্ট ছিল আমাদের ভবিষ্যতের জন্য যুদ্ধ, আর তার নীরবতা ছিল এক ধরনের ভালোবাসা—যা শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না।
সময়ের সঙ্গে মানুষ বেঁচে থাকতে শিখে যায় ঠিকই, কিন্তু বাবাকে ভুলে যায় না। কিছু অভ্যাস, কিছু স্মৃতি, কিছু কথা—হঠাৎ করেই ফিরে আসে। কখনো পুরোনো কোনো গন্ধে, কখনো সন্ধ্যার নীরবতায়, কখনো নিজের ভেতরের ক্লান্তিতে।
১৩ বছর পরও মনে হয়, বাবা যেন কোথাও আছেন। হয়তো চোখের আড়ালে, কিন্তু দোয়ার মতো, ছায়ার মতো, সাহসের মতো পাশে রয়ে গেছেন।
কারণ বাবা হারিয়ে যান না কখনো। তিনি বেঁচে থাকেন সন্তানের স্মৃতিতে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে, আর নিঃশব্দ ভালোবাসার গভীরে।
সময়ের সঙ্গে মানুষ বাঁচতে শেখে ঠিকই, কিন্তু কিছু অভাব কখনো পূরণ হয় না। বাবার জায়গাটা ঠিক তেমনই—যা হারিয়ে গেলে জীবনের ভেতর এক গভীর শূন্যতা থেকে যায়।
তবুও তিনি আছেন—স্মৃতিতে, অভ্যাসে, আর প্রতিটি নিঃশব্দ প্রার্থনায়।
আর তাই বাবার স্মৃতিগুলো শুধু কাঁদায় না, বাঁচতেও শেখায়।


























