ঢাকা ০৫:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নীরব শত্রু বজ্রপাত, একদিনে ১১ জনের প্রাণহানি

নিজস্ব প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধি
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:৪৫:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ৩৫ বার পড়া হয়েছে

ছবি এআই দ্বারা নির্মিত

বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। খোলা মাঠ, নদীঘেরা চর, কৃষিজমিতে কাজ করা মানুষ—সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে তারাই। জীবিকার তাগিদে যাদের প্রতিদিনই আকাশের নিচে দাঁড়াতে হয়, তাদের জন্য আকাশ এখন যেন এক নীরব শত্রু।

গ্রামের কৃষকরা সকালেই বের হন জমিতে। ধান কাটার ব্যস্ততা, মাছ ধরার তাড়া, কিংবা ঘাস কাটা—কাজের ফাঁকে কেউই ভাবেন না ঠিক কখন আকাশটা হঠাৎ বদলে যাবে। কিন্তু এক মুহূর্তেই সব পাল্টে যায়। দূরে বজ্রের গর্জন, তারপর আলোর ঝলক—এর মাঝেই থেমে যায় একটি জীবন, একটি পরিবারের সব স্বপ্ন।

মা হারানো সন্তানের কান্না, কিংবা স্বামী হারানো স্ত্রীর শূন্য দৃষ্টি—এই গল্পগুলো এখন প্রায়ই শোনা যায়। অনেক পরিবার জানেই না, কেন তাদের প্রিয়জন আর ফিরে এল না কাজ থেকে।

শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে সারা দেশে কালবৈশাখী ঝড়ে বজ্রাঘাতে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে, সুনামগঞ্জের তিন উপজেলায় পাঁচজন, রংপুরের মিঠাপুকুরে দুইজন, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে একজন, নেত্রকোনায় একজন ও ময়মনসিংহে দুইজনের মৃত্যু হয়।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের তিন উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ধান কাটার সময় পৃথক বজ্রাঘাতে পাঁচজন কৃষক নিহত হয়েছেন। শনিবার দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে কালবৈশাখী ঝড়ের সময় বজ্রাঘাতে এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

নিহতদের মধ্যে ধর্মপাশা উপজেলায় টগার হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে বাদশা গঞ্জ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী হবিবুর রহমান (২২) নিহত হন। এছাড়া একই উপজেলার সরস্বতীপুর গ্রামে ধান শুকানোর সময় বজ্রাঘাতে রহমত উল্লাহ নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়। এছাড়া জামালগঞ্জ উপজেলায় হাওরে ধান কাটার সময় নূর জামাল নামে এক ব্যক্তি এবং তাহিরপুর উপজেলায় হাঁস চড়ানোর সময় আবুল কালাম নামে আরেকজন বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান। দিরাই উপজেলার কালিয়াগোটার (আতরার) হাওরে ধান কাটার সময় লিটন মিয়া (৩৮) নামে এক কৃষক গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা উদ্ধার করে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। লিটন পেরুয়া আশনাবাজ গ্রামের চান্দু মিয়ার ছেলে। পৃথক এসব ঘটনায় আরও তিনজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার জানান, বজ্রাঘাতে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ এসব ঘটনার বিস্তারিত খোঁজখবর নিচ্ছে।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নবীগঞ্জ উপজেলায় হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে সুনাম উদ্দিন (৬০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে উপজেলার বড় ভাকৈর (পূর্ব) ইউনিয়নের বিবিয়ানা নদীর তীরবর্তী মমিনা হাওড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। মৃত সুনাম উদ্দিন ওই ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের মৃত সুন্দর আলী সাহেবের ছেলে।

জানা গেছে, সকালে জীবিকার তাগিদে সুনাম উদ্দিন মমিনা হাওরে ধান কাটতে যান। দুপুরের দিকে হঠাৎ আকাশ মেঘে ঢেকে গিয়ে শুরু হয় বৃষ্টি ও বজ্রাঘাত। এ সময় হাওরে ধান কাটার কাজে থাকা অবস্থায় বজ্রাঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

বড় ভাকৈর (পূর্ব) ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জুয়েল মিয়া বলেন, সকালে তিনি হাওরে ধান কাটতে যান। দুপুরে আকস্মিক বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়।

নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোনায়েম মিয়া জানান, বজ্রপাতে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছে।

রংপুর প্রতিনিধি জানান, রংপুরের মিঠাপুকুরে মাছ ধরার সময় বজ্রাঘাতে দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। আজ দুপুরে উপজেলার বড় হযরতপুর ইউনিয়নের সখীপুর গ্রামে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন–রামেশ্বরপাড়া গ্রামের মাঝিপাড়া এলাকার মিলন মিয়া (৩৫) এবং সখীপুর গ্রামের আবু তালেব (৬৫)।

দুপুর ১২টার দিকে সখীপুর গ্রামের একটি মৎস্য খামারে জাল দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছিল। এ সময় খামারের পাড়ে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকজন স্থানীয় মানুষ মাছ ধরা দেখছিলেন। হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হয়। একপর্যায়ে শক্তিশালী বজ্রাঘাত খামারের পাড়ে আঘাত হানে বজ্রাঘাতের তীব্রতায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সবাই ছিটকে পড়ে এবং কয়েকজন গুরুতর দগ্ধ ও আহত হন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. এম এ হালিম লাভলু জানান, হাসপাতালে আনার আগেই ওই দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্যরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, জেলার গৌরীপুর ও গফরগাও উপজেলায় বজ্রাঘাতে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে ধান কাটার সময় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন–গফরগাওয়ের ধাইরগাওয়ের মৃত সেকান্দর আলির ছেলে মমতাজ খান (৫৮) এবং গৌরীপুরের কোনা পাড়া গ্রামের আলী মিয়ার ছেলে রহমত আলী (৩৫) ।

গৌরীপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আছিয়া আমিন এবং গফরগাও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ স ম আতিকুর রহমান এই খবর নিশ্চিত করেছেন । গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, নিহতের ক্ষতিপুরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে জানানো হবে। সেখান থেকে অনুদান এলে নিহতদের পরিবারকে দেওয়া হবে।

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, নেত্রকোনার আটপাড়ায় হাওড়ে গরুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে আলতু মিয়া (৬৫) নামের এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। বিকেলে উপজেলার সুখারী ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামের সামনের মেসির হাওড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আলতু মিয়া হাতিয়া গ্রামের মৃত লাল মিয়ার ছেলে।

জানা গেছে, দুপুর আড়াইটার দিকে গ্রামের সামনের মেসির হাওড়ে গরুর জন্য ঘাস কাটতে যান আলতু মিয়া।কিছুক্ষণ পর সেখানে আকাশ অন্ধকার করে বৃষ্টিসহ বজ্রাঘাত শুরু হয়। বৃষ্টি শেষ পর স্থানীয় বাসিন্দারা হাওরে গিয়ে আলতু মিয়ার নিথর দেহ পরে থাকতে দেখে বাড়িতে নিয়ে আসেন।

আটপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুবায়দুল আলম বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানোর পর মরদেহের সুরতাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

আটপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. শাহানুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি বজ্রাঘাতে নিহত পরিবারের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা করা হবে।

এদিকে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন, জলবায়ু ঝুঁকি এবং খোলা জায়গায় মানুষের কাজের বাধ্যবাধকতা—সব মিলিয়ে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো অনেক এলাকায় বজ্রপাত থেকে বাঁচার মতো পর্যাপ্ত সচেতনতা বা নিরাপদ আশ্রয় নেই।

গ্রামাঞ্চলে বেশিরভাগ সময়ই মানুষ খোলা আকাশের নিচেই কাজ করেন। গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ—এই তথ্য অনেকেই জানেন না। ফলে বিপদ বাড়ছে নীরবে, প্রতিদিনই।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

নীরব শত্রু বজ্রপাত, একদিনে ১১ জনের প্রাণহানি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:৪৫:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। খোলা মাঠ, নদীঘেরা চর, কৃষিজমিতে কাজ করা মানুষ—সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে তারাই। জীবিকার তাগিদে যাদের প্রতিদিনই আকাশের নিচে দাঁড়াতে হয়, তাদের জন্য আকাশ এখন যেন এক নীরব শত্রু।

গ্রামের কৃষকরা সকালেই বের হন জমিতে। ধান কাটার ব্যস্ততা, মাছ ধরার তাড়া, কিংবা ঘাস কাটা—কাজের ফাঁকে কেউই ভাবেন না ঠিক কখন আকাশটা হঠাৎ বদলে যাবে। কিন্তু এক মুহূর্তেই সব পাল্টে যায়। দূরে বজ্রের গর্জন, তারপর আলোর ঝলক—এর মাঝেই থেমে যায় একটি জীবন, একটি পরিবারের সব স্বপ্ন।

মা হারানো সন্তানের কান্না, কিংবা স্বামী হারানো স্ত্রীর শূন্য দৃষ্টি—এই গল্পগুলো এখন প্রায়ই শোনা যায়। অনেক পরিবার জানেই না, কেন তাদের প্রিয়জন আর ফিরে এল না কাজ থেকে।

শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে সারা দেশে কালবৈশাখী ঝড়ে বজ্রাঘাতে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে, সুনামগঞ্জের তিন উপজেলায় পাঁচজন, রংপুরের মিঠাপুকুরে দুইজন, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে একজন, নেত্রকোনায় একজন ও ময়মনসিংহে দুইজনের মৃত্যু হয়।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের তিন উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ধান কাটার সময় পৃথক বজ্রাঘাতে পাঁচজন কৃষক নিহত হয়েছেন। শনিবার দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে কালবৈশাখী ঝড়ের সময় বজ্রাঘাতে এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

নিহতদের মধ্যে ধর্মপাশা উপজেলায় টগার হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে বাদশা গঞ্জ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী হবিবুর রহমান (২২) নিহত হন। এছাড়া একই উপজেলার সরস্বতীপুর গ্রামে ধান শুকানোর সময় বজ্রাঘাতে রহমত উল্লাহ নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়। এছাড়া জামালগঞ্জ উপজেলায় হাওরে ধান কাটার সময় নূর জামাল নামে এক ব্যক্তি এবং তাহিরপুর উপজেলায় হাঁস চড়ানোর সময় আবুল কালাম নামে আরেকজন বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান। দিরাই উপজেলার কালিয়াগোটার (আতরার) হাওরে ধান কাটার সময় লিটন মিয়া (৩৮) নামে এক কৃষক গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা উদ্ধার করে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। লিটন পেরুয়া আশনাবাজ গ্রামের চান্দু মিয়ার ছেলে। পৃথক এসব ঘটনায় আরও তিনজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার জানান, বজ্রাঘাতে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ এসব ঘটনার বিস্তারিত খোঁজখবর নিচ্ছে।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নবীগঞ্জ উপজেলায় হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে সুনাম উদ্দিন (৬০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে উপজেলার বড় ভাকৈর (পূর্ব) ইউনিয়নের বিবিয়ানা নদীর তীরবর্তী মমিনা হাওড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। মৃত সুনাম উদ্দিন ওই ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের মৃত সুন্দর আলী সাহেবের ছেলে।

জানা গেছে, সকালে জীবিকার তাগিদে সুনাম উদ্দিন মমিনা হাওরে ধান কাটতে যান। দুপুরের দিকে হঠাৎ আকাশ মেঘে ঢেকে গিয়ে শুরু হয় বৃষ্টি ও বজ্রাঘাত। এ সময় হাওরে ধান কাটার কাজে থাকা অবস্থায় বজ্রাঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

বড় ভাকৈর (পূর্ব) ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জুয়েল মিয়া বলেন, সকালে তিনি হাওরে ধান কাটতে যান। দুপুরে আকস্মিক বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়।

নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোনায়েম মিয়া জানান, বজ্রপাতে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছে।

রংপুর প্রতিনিধি জানান, রংপুরের মিঠাপুকুরে মাছ ধরার সময় বজ্রাঘাতে দুই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। আজ দুপুরে উপজেলার বড় হযরতপুর ইউনিয়নের সখীপুর গ্রামে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন–রামেশ্বরপাড়া গ্রামের মাঝিপাড়া এলাকার মিলন মিয়া (৩৫) এবং সখীপুর গ্রামের আবু তালেব (৬৫)।

দুপুর ১২টার দিকে সখীপুর গ্রামের একটি মৎস্য খামারে জাল দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছিল। এ সময় খামারের পাড়ে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকজন স্থানীয় মানুষ মাছ ধরা দেখছিলেন। হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হয়। একপর্যায়ে শক্তিশালী বজ্রাঘাত খামারের পাড়ে আঘাত হানে বজ্রাঘাতের তীব্রতায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সবাই ছিটকে পড়ে এবং কয়েকজন গুরুতর দগ্ধ ও আহত হন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. এম এ হালিম লাভলু জানান, হাসপাতালে আনার আগেই ওই দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্যরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, জেলার গৌরীপুর ও গফরগাও উপজেলায় বজ্রাঘাতে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে ধান কাটার সময় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন–গফরগাওয়ের ধাইরগাওয়ের মৃত সেকান্দর আলির ছেলে মমতাজ খান (৫৮) এবং গৌরীপুরের কোনা পাড়া গ্রামের আলী মিয়ার ছেলে রহমত আলী (৩৫) ।

গৌরীপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আছিয়া আমিন এবং গফরগাও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ স ম আতিকুর রহমান এই খবর নিশ্চিত করেছেন । গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, নিহতের ক্ষতিপুরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে জানানো হবে। সেখান থেকে অনুদান এলে নিহতদের পরিবারকে দেওয়া হবে।

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, নেত্রকোনার আটপাড়ায় হাওড়ে গরুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে আলতু মিয়া (৬৫) নামের এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। বিকেলে উপজেলার সুখারী ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামের সামনের মেসির হাওড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আলতু মিয়া হাতিয়া গ্রামের মৃত লাল মিয়ার ছেলে।

জানা গেছে, দুপুর আড়াইটার দিকে গ্রামের সামনের মেসির হাওড়ে গরুর জন্য ঘাস কাটতে যান আলতু মিয়া।কিছুক্ষণ পর সেখানে আকাশ অন্ধকার করে বৃষ্টিসহ বজ্রাঘাত শুরু হয়। বৃষ্টি শেষ পর স্থানীয় বাসিন্দারা হাওরে গিয়ে আলতু মিয়ার নিথর দেহ পরে থাকতে দেখে বাড়িতে নিয়ে আসেন।

আটপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুবায়দুল আলম বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানোর পর মরদেহের সুরতাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

আটপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. শাহানুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি বজ্রাঘাতে নিহত পরিবারের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা করা হবে।

এদিকে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন, জলবায়ু ঝুঁকি এবং খোলা জায়গায় মানুষের কাজের বাধ্যবাধকতা—সব মিলিয়ে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো অনেক এলাকায় বজ্রপাত থেকে বাঁচার মতো পর্যাপ্ত সচেতনতা বা নিরাপদ আশ্রয় নেই।

গ্রামাঞ্চলে বেশিরভাগ সময়ই মানুষ খোলা আকাশের নিচেই কাজ করেন। গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ—এই তথ্য অনেকেই জানেন না। ফলে বিপদ বাড়ছে নীরবে, প্রতিদিনই।