ঢাকা ০৪:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টিকাবঞ্চিত ৩০ লাখ শিশু

মহামারি রূপ নিচ্ছে হাম, বাড়ছে উদ্বেগ

জয়নাল আবেদিন
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:৫৯:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

এক সময় যে রোগটিকে অনেকেই “শিশুকালের স্বাভাবিক অসুখ” ভেবে হালকাভাবে নিত, সেই হাম এখন আবার ভয়ংকর রূপে ফিরে আসছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই সংক্রামক রোগ, আর নীরবে তা মহামারির আশঙ্কা তৈরি করছে।

গ্রাম থেকে শহর—কোথাও যেন রেহাই নেই। ছোট ছোট শিশুদের জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি আর দুর্বলতা এখন অনেক পরিবারের নিত্য আতঙ্ক। হাসপাতালে বাড়ছে ভিড়, আর মায়েদের চোখে দেখা যাচ্ছে অনিশ্চয়তার ছাপ।

দেশে অন্তত ৩০ লাখ শিশু এখন ১১টি মারাত্মক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে—মূল কারণ সময়মতো টিকা না পাওয়া বা টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাত। এর মধ্যে আগে নির্মূল হওয়া পোলিও ও নবজাতকের ধনুষ্টংকারের মতো রোগও আবার ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত দেড় বছরে দেশের টিকাদান ব্যবস্থা ভঙ্গুর অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। টিকা ক্রয়ে জটিলতা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের কারণে কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

ঝুঁকিতে একাধিক রোগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম, রুবেলা, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি ও রাতকানা—যেগুলো প্রায় নির্মূলের পথে ছিল—সেগুলো আবার বাড়তে পারে। পাশাপাশি টিকার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে থাকা যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি ও নিউমোনিয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী Sardar Sakhawat Hossain Bakul নিজেও স্বীকার করেছেন, টিকা সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই হাম আবার ছড়িয়ে পড়ছে।

টিকাদানে বড় ঘাটতি

সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে টিকাদানের হার নেমে এসেছে ৫৯.৬ শতাংশে। ওই বছর প্রায় ১৬ লাখের বেশি শিশু টিকা পায়নি। আগের বছরগুলোর তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩৪ লাখ শিশু জন্ম নেয়। সেই হিসাবে গত কয়েক বছরে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছেছে—যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। প্রয়োজন ব্যাপক টিকাদান, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা।

হাম মহামারির শঙ্কা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ Benazir Ahmed সতর্ক করে বলেন, দেশে ইতোমধ্যেই বড় আকারে হাম ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত শিশু হাসপাতালে না আসায় প্রকৃত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তিনি জানান, গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়—যা এখন অর্জিত হচ্ছে না।

কেন ভেঙে পড়ল টিকাদান ব্যবস্থা?

সংশ্লিষ্টদের মতে, টিকা কেনার পুরোনো পদ্ধতি বাতিল করে নতুন অর্থায়ন কাঠামো চালুর ফলে জটিলতা তৈরি হয়। প্রকল্প অনুমোদন, অর্থ ছাড় ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় সরবরাহ ব্যাহত হয়।

ইপিআইয়ের উপপরিচালক Shahriar Sazzad জানান, বাজেট ও ক্রয়পদ্ধতির পরিবর্তনই এই সংকটের মূল কারণ। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট ও প্রশিক্ষণের অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনেও ধাক্কা

শুধু টিকাদান নয়, শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইনও এক বছরের বেশি সময় ধরে ব্যাহত। এতে শিশুদের পুষ্টিহীনতা ও রোগপ্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

টিকার ঘাটতি, তবু অপচয়

২০২৫-২৬ সময়ে কিছু টিকার ঘাটতি ২০-২৮ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। একই সঙ্গে একটি ভায়াল খুললে পুরোটা ব্যবহার করা না গেলে বড় অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—কখনো অপচয়ের হার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।

জনবল সংকটও বড় কারণ

দেশের অনেক এলাকায় টিকা থাকলেও কর্মী নেই, আবার কোথাও কর্মী থাকলেও টিকা নেই। প্রায় ৪৫ শতাংশ স্বাস্থ্য সহকারীর পদ খালি রয়েছে, যা টিকাদান কার্যক্রমকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।

চিকিৎসকরা যা বলেছন

চিকিৎসকরা বলছেন, হাম শুধু একটি সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ নয়—সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকাদানই এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। কিছু এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি ঠিকমতো পৌঁছায়নি, আবার কোথাও সচেতনতার অভাবে অভিভাবকেরা শিশুদের টিকা দিতে অনীহা দেখিয়েছেন। এর ফলেই তৈরি হয়েছে বড় এক ঝুঁকি।

হাম শুধু একটি রোগ নয়, এটি এখন একটি সতর্কবার্তা—স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সচেতনতা আর আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগের ঘাটতির প্রতিচ্ছবি। এখনই যদি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এই নীরব বিস্তার খুব দ্রুতই বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

টিকাবঞ্চিত ৩০ লাখ শিশু

মহামারি রূপ নিচ্ছে হাম, বাড়ছে উদ্বেগ

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:৫৯:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

এক সময় যে রোগটিকে অনেকেই “শিশুকালের স্বাভাবিক অসুখ” ভেবে হালকাভাবে নিত, সেই হাম এখন আবার ভয়ংকর রূপে ফিরে আসছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই সংক্রামক রোগ, আর নীরবে তা মহামারির আশঙ্কা তৈরি করছে।

গ্রাম থেকে শহর—কোথাও যেন রেহাই নেই। ছোট ছোট শিশুদের জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি আর দুর্বলতা এখন অনেক পরিবারের নিত্য আতঙ্ক। হাসপাতালে বাড়ছে ভিড়, আর মায়েদের চোখে দেখা যাচ্ছে অনিশ্চয়তার ছাপ।

দেশে অন্তত ৩০ লাখ শিশু এখন ১১টি মারাত্মক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে—মূল কারণ সময়মতো টিকা না পাওয়া বা টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাত। এর মধ্যে আগে নির্মূল হওয়া পোলিও ও নবজাতকের ধনুষ্টংকারের মতো রোগও আবার ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত দেড় বছরে দেশের টিকাদান ব্যবস্থা ভঙ্গুর অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। টিকা ক্রয়ে জটিলতা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের কারণে কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

ঝুঁকিতে একাধিক রোগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম, রুবেলা, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি ও রাতকানা—যেগুলো প্রায় নির্মূলের পথে ছিল—সেগুলো আবার বাড়তে পারে। পাশাপাশি টিকার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে থাকা যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি ও নিউমোনিয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী Sardar Sakhawat Hossain Bakul নিজেও স্বীকার করেছেন, টিকা সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই হাম আবার ছড়িয়ে পড়ছে।

টিকাদানে বড় ঘাটতি

সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে টিকাদানের হার নেমে এসেছে ৫৯.৬ শতাংশে। ওই বছর প্রায় ১৬ লাখের বেশি শিশু টিকা পায়নি। আগের বছরগুলোর তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩৪ লাখ শিশু জন্ম নেয়। সেই হিসাবে গত কয়েক বছরে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছেছে—যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। প্রয়োজন ব্যাপক টিকাদান, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা।

হাম মহামারির শঙ্কা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ Benazir Ahmed সতর্ক করে বলেন, দেশে ইতোমধ্যেই বড় আকারে হাম ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত শিশু হাসপাতালে না আসায় প্রকৃত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তিনি জানান, গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়—যা এখন অর্জিত হচ্ছে না।

কেন ভেঙে পড়ল টিকাদান ব্যবস্থা?

সংশ্লিষ্টদের মতে, টিকা কেনার পুরোনো পদ্ধতি বাতিল করে নতুন অর্থায়ন কাঠামো চালুর ফলে জটিলতা তৈরি হয়। প্রকল্প অনুমোদন, অর্থ ছাড় ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ায় সরবরাহ ব্যাহত হয়।

ইপিআইয়ের উপপরিচালক Shahriar Sazzad জানান, বাজেট ও ক্রয়পদ্ধতির পরিবর্তনই এই সংকটের মূল কারণ। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট ও প্রশিক্ষণের অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনেও ধাক্কা

শুধু টিকাদান নয়, শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইনও এক বছরের বেশি সময় ধরে ব্যাহত। এতে শিশুদের পুষ্টিহীনতা ও রোগপ্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

টিকার ঘাটতি, তবু অপচয়

২০২৫-২৬ সময়ে কিছু টিকার ঘাটতি ২০-২৮ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। একই সঙ্গে একটি ভায়াল খুললে পুরোটা ব্যবহার করা না গেলে বড় অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—কখনো অপচয়ের হার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।

জনবল সংকটও বড় কারণ

দেশের অনেক এলাকায় টিকা থাকলেও কর্মী নেই, আবার কোথাও কর্মী থাকলেও টিকা নেই। প্রায় ৪৫ শতাংশ স্বাস্থ্য সহকারীর পদ খালি রয়েছে, যা টিকাদান কার্যক্রমকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।

চিকিৎসকরা যা বলেছন

চিকিৎসকরা বলছেন, হাম শুধু একটি সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ নয়—সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকাদানই এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। কিছু এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি ঠিকমতো পৌঁছায়নি, আবার কোথাও সচেতনতার অভাবে অভিভাবকেরা শিশুদের টিকা দিতে অনীহা দেখিয়েছেন। এর ফলেই তৈরি হয়েছে বড় এক ঝুঁকি।

হাম শুধু একটি রোগ নয়, এটি এখন একটি সতর্কবার্তা—স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সচেতনতা আর আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগের ঘাটতির প্রতিচ্ছবি। এখনই যদি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এই নীরব বিস্তার খুব দ্রুতই বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।