দুর্গম পাহাড়ে বন্দিশালা, নির্যাতন ও লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়
শীত নামতেই সক্রিয় মানবপাচার চক্র, পাহাড়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি মানুষ

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫৬:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্র। বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের তুলনামূলক শান্ত আবহাওয়াকে কাজে লাগিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে। চাকরি কিংবা উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে তাঁদের সংগ্রহ করার পর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ি আস্তানায়। সেখানে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে শারীরিক নির্যাতন, বিক্রি এবং পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
এই অপরাধের ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এসেছে ৫ নভেম্বর টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর। মানবপাচারকারীদের আস্তানায় অভিযান চলাকালে গোলাগুলিতে এক সেনাসদস্য নিহত হন। অভিযানে ছয় রোহিঙ্গাসহ ৫৬ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, কীভাবে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষকে অপহরণ করে পাহাড়ের বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। উদ্ধারের ঘটনা একদিকে পাচার চক্রের সক্রিয়তার প্রমাণ দিচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরাধীদের সশস্ত্র অবস্থান ও তাদের মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে আনছে।
বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন, শেষ ঠিকানা পাহাড়ের বন্দিশালা
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের কয়েকজনের দাবি, এসব আস্তানায় ৪০টির বেশি ভারী অস্ত্র রয়েছে। চক্রের সদস্যদের বড় একটি অংশ মিয়ানমারের নাগরিক। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা শুধু মানুষকে সমুদ্রপথে পাঠানোর ব্যবস্থা করে না; অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে তাঁদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কৌশলও নেয়।
ফরিদপুরের শান্তা উপজেলার কলাগাছিয়া গ্রামের বাসিন্দা এসএম আসাদুজ্জামানের অভিজ্ঞতা সেই নির্মমতারই উদাহরণ। কক্সবাজারে কাজ করার সুবাদে তিনজন রোহিঙ্গার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। পরে তাঁরা তাঁকে টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে মাত্র ১০ হাজার টাকায় অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর পরিবারের কাছে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
আসাদুজ্জামান বলেন, ‘কক্সবাজারে কাজ করার সুবাদে তিনজন রোহিঙ্গার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। পরে তারা আমাকে এখানে নিয়ে এসে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। এরপর আমার কাছে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। একপর্যায়ে যৌথ বাহিনী, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও পুলিশের অভিযানে আমরা উদ্ধার হই। এখন আমরা অনেকটাই নিরাপদ বোধ করছি।’
উদ্ধার হওয়া আরেক যুবক রিদুয়ান জানান, সন্ধ্যায় তাঁরা একটি পাহাড়ি আস্তানায় পৌঁছান। সেখানে এক রাত থাকার পর সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, ঘরের দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। বের হওয়ার চেষ্টা করলে দুজন ব্যক্তি এসে জানান, এক লাখ টাকার বিনিময়ে তাঁদের বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ফকিরারভিটা গ্রামের সোহেল আহমেদের অভিযোগ, পাহাড়ের আস্তানায় দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। মারধরে তাঁর হাত ফেটে যায়। নির্যাতনের ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন বলেও জানান তিনি।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের অভিযোগ, অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নিয়মিত মারধর করা হতো। এমনকি নামাজ আদায় করতে গেলেও নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যেত। তাঁদের দাবি, আস্তানায় প্রায় ৪০ জন সশস্ত্র সদস্য ছিল। কেফাইয়্যা নামের এক দালালসহ আরও পাঁচ-ছয়জন এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। অপরিচিত পাহাড়ি এলাকায় চোখ বেঁধে অস্ত্রের মুখে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলেও জানান একজন।
হতাশা ও অনিশ্চয়তাকে পুঁজি করছে পাচারকারীরা
উখিয়া-টেকনাফে মানবপাচার নতুন কোনো অপরাধ নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষও দীর্ঘদিন ধরে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও পাচারচক্রের ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত থাকা, শিবিরে দীর্ঘস্থায়ী জীবন, জীবিকার সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা পাচারকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মনে করেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের হতাশা ও অনিশ্চয়তা মানবপাচারের অন্যতম কারণ। প্রায় নয় বছর পার হলেও তাঁরা নিজ দেশে ফিরতে পারেননি। ফলে শিবিরের জীবন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে উন্নত জীবনের আশায় অনেকে সমুদ্রপথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
তাঁর ভাষ্য, মানবপাচারকারীরা এই অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে নানা প্রলোভন ও প্রতারণার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় উদ্বুদ্ধ করছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাচারকারীদের কার্যক্রম শুধু রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। আসাদুজ্জামানের মতো স্থানীয় বা দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। অর্থাৎ, এটি একক কোনো জনগোষ্ঠীর সমস্যা নয়; বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ সংগ্রহ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় এনে জিম্মি করার একটি বিস্তৃত অপরাধী নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শান্ত সমুদ্র, বাড়তি পাচারঝুঁকি
শীত মৌসুমে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের পানি তুলনামূলক শান্ত থাকে। এ সময় ছোট নৌযানে সমুদ্রপথে চলাচল কিছুটা সহজ হওয়ায় অবৈধ যাত্রার প্রবণতা বাড়ে। পাচারকারীরা এই মৌসুমি পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তাদের কার্যক্রম জোরদার করে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই শীতকালে মানবপাচার ও অবৈধভাবে মানুষ চলাচলে জড়িত চক্রগুলো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। মানবপাচার একটি সংঘবদ্ধ আন্তদেশীয় অপরাধ। এর সঙ্গে শুধু বাংলাদেশের পাচারকারীরা নয়, অন্য দেশের অপরাধী চক্রেরও যোগাযোগ ও সমন্বয় রয়েছে।
তাঁর মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় এসব চক্রের সঙ্গে সশস্ত্র ব্যক্তিরাও যুক্ত থাকে। নিজেদের নিরাপত্তা এবং পাচারের পথ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা অস্ত্র ব্যবহার করে। ফলে বিষয়টি কেবল মানবপাচারবিরোধী অভিযান দিয়ে মোকাবিলা করার মতো নয়; এর সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তদেশীয় অপরাধ দমনের প্রশ্নও জড়িত।
আসিফ মুনীরের পরামর্শ, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সতর্কতার সঙ্গে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি কক্সবাজার অঞ্চলে নিয়োজিত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় আন্তদেশীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
তবে শুধু অভিযান চালিয়ে মানবপাচার বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে মানবপাচারসংক্রান্ত মামলায় অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করেন এই বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, পাচারকারীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি মামলা, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াও কার্যকর করতে হবে। অপরাধীদের অর্থের উৎস, যোগাযোগের মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের শনাক্ত না করলে নেটওয়ার্ক ভাঙা কঠিন।
অপরাধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে স্থানীয় জনজীবনে
টেকনাফের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনজীবী মো. তৌহিদুল এহেছান। তাঁর মতে, টেকনাফের সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন কিংবা শুধু স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে এখানে মানবপাচার, মাদক চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশসহ নানা অপরাধ দীর্ঘদিন ধরে সংঘটিত হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতিও এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তৌহিদুল এহেছান বলেন, তিন বাহিনীর সমন্বয়ে পরিচালিত যৌথ অভিযান ইতিবাচক। তবে এ ধরনের অভিযান আরও আগে প্রয়োজন ছিল। গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এলাকার সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও মানবপাচারের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাঁর অভিযোগ, অপরাধীদের একটি নিজস্ব প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থার বাইরেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। পর্যটন কার্যক্রম শিথিল হওয়ার প্রেক্ষাপটে মানবপাচারের মতো অপরাধ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই অপরাধীদের শক্ত ঘাঁটি ভেঙে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা জরুরি।
যৌথ অভিযানে সেনাসদস্যের প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগের মূল্য অনেক। সন্ত্রাসীদের শক্তিশালী ঘাঁটি ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় টেকনাফ ও উখিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব স্থানীয় জনজীবন ও অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
বিশেষ পুলিশ ক্যাম্প, বাড়ছে নজরদারি
মানবপাচার ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে টেকনাফে বিশেষ পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করেছে প্রশাসন। মাদক ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে পুলিশের কার্যক্রম আরও জোরদার করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান বলেন, শীত মৌসুমে মানবপাচারকারীদের তৎপরতা তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে টেকনাফে বিশেষ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি জানান, মাদক কিংবা মানবপাচারকারীরা অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করলে এই ক্যাম্পের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। পুলিশের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি টেকনাফের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতেই ক্যাম্পটি স্থাপন করা হয়েছে।
তবে বিশেষ ক্যাম্প স্থাপন কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নির্ভর করবে নিয়মিত নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, পাহাড়ি এলাকায় প্রবেশের সক্ষমতা এবং স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পরিবেশ তৈরির ওপর। শুধু অভিযানকেন্দ্রিক তৎপরতা দিয়ে দীর্ঘদিনের অপরাধী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
সমুদ্রযাত্রায় মৃত্যু ও নিখোঁজের ভয়াবহ চিত্র
মানবপাচারের পাশাপাশি অনিয়মিত সমুদ্রযাত্রায় প্রাণহানির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সমুদ্রপথে রোহিঙ্গাদের জন্য বছরটি ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। ওই বছর ৬ হাজার ৫০১ জন রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁদের মধ্যে ৮৯২ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া চলতি বছরের ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে প্রায় ২৮০ যাত্রী নিয়ে একটি ট্রলারডুবির ঘটনায় অন্তত ৩৩ জনকে হত্যার অভিযোগ ওঠে। জুনের শেষ দিকে এবং ৮ জুলাই মিয়ানমার উপকূলে আরও দুটি নৌকাডুবির ঘটনায় পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হয়।
এসব ঘটনা দেখায়, বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে পাচারকারীরা মানুষকে কতটা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রার আগেই তাঁদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে। আর সমুদ্রে পাঠানো হলে জীবনহানির ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
অভিযান নয়, ভাঙতে হবে পুরো অপরাধী নেটওয়ার্ক
টেকনাফের সাম্প্রতিক অভিযান মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে একজন সেনাসদস্যের প্রাণহানি এবং ৫৬ জনকে উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করে, পাহাড়ি এলাকায় এসব অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি বদলাতে হলে কয়েকটি ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করা জরুরি। প্রথমত, পাহাড়ি আস্তানা ও সমুদ্রপথের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ সংগ্রহকারী দালালদের শনাক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাচারচক্রের অর্থ লেনদেন, মুক্তিপণ আদায়ের পদ্ধতি ও আন্তদেশীয় যোগাযোগের সূত্র অনুসন্ধান করতে হবে। তৃতীয়ত, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাঁরা আবার একই চক্রের শিকার না হন।
পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জীবিকা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা কমানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হতাশা ও জীবিকার সংকটকে পুঁজি করেই পাচারকারীরা নতুন মানুষ সংগ্রহ করছে।
শীত মৌসুমে সমুদ্রযাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাচারচক্রের তৎপরতাও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই এখনকার অভিযান শুধু কয়েকটি আস্তানা উদ্ধারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অপরাধীদের নেতৃত্ব, অর্থের জোগান, অস্ত্রের উৎস ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে না পারলে উখিয়া-টেকনাফে মানবপাচারের এই চক্র নতুন নামে, নতুন কৌশলে আবারও সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

























