পা দিয়ে লিখেই আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর, বিচারক হওয়ার স্বপ্ন বিউটির

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৩:৩৩:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
জন্ম থেকেই দুটি হাত নেই। তবু থেমে থাকেনি পড়াশোনা, থামেনি স্বপ্নপূরণের লড়াই। পা দিয়ে লিখেই প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছেন জয়পুরহাটের বিউটি খাতুন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এই তরুণীর এখন স্বপ্ন বিচারক হওয়া। নিজের মেধা ও যোগ্যতায় সেই স্বপ্ন পূরণ করে শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান তিনি।
জন্মের পর থেকেই বিউটি খাতুনের জীবনের পথটা ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা। জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার প্রত্যন্ত শিবপুর গ্রামের একটি দরিদ্র কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। জন্ম থেকেই দুটি হাত না থাকায় তাঁকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতা যে তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন বিউটি নিজেই।
যে হাতে কলম ধরার কথা, সেই হাত তাঁর নেই। কিন্তু শেখার আগ্রহ থেমে থাকেনি। ছোটবেলা থেকেই পা দিয়ে লেখার অভ্যাস গড়ে তোলেন তিনি। ধীরে ধীরে পায়ের আঙুলে কলম ধরে অক্ষর লেখা, শব্দ গঠন, খাতায় উত্তর লেখা—সবই আয়ত্ত করেন। অন্যদের কাছে যে কাজ স্বাভাবিক, বিউটির কাছে তা ছিল দীর্ঘ অনুশীলন আর অধ্যবসায়ের ফল।
এভাবেই একের পর এক শিক্ষার ধাপ পেরিয়েছেন তিনি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায়ও তাঁর সঙ্গী ছিল সেই পা, যার সাহায্যে ছোটবেলায় প্রথম অক্ষর লিখতে শিখেছিলেন।
সম্প্রতি আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন বিউটি। এখন তাঁর চোখ আরও বড় এক লক্ষ্যে—বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিভিল জজ হওয়া।
কটু কথা পেরিয়ে নিজের পরিচয় গড়ার লড়াই
বিউটির এই পথচলা শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের গল্প নয়; এটি নিজের সক্ষমতা প্রমাণেরও গল্প।
শৈশব থেকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে মানুষের কটু কথা শুনতে হয়েছে। অনেক সময় অন্যদের কাছে যে কাজ সহজ, তা সম্পন্ন করতে তাঁকে বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়েছে। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতা তাঁর এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাকে থামাতে পারেনি।
বিউটি জানান, পড়াশোনার বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও শিক্ষানুরাগীদের কাছ থেকেও সহায়তা পেয়েছেন তিনি। তাঁদের সহযোগিতা তাঁর শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে।
তবে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁর প্রত্যাশা স্পষ্ট। কারও দয়ার ওপর নির্ভর করে নয়, নিজের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে আত্মনির্ভরশীল হতে চান তিনি।
এই প্রত্যাশার মধ্যেই ফুটে ওঠে বিউটির ব্যক্তিত্ব। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার না করেই তিনি চান, তাঁর পরিচয় নির্ধারিত হোক কাজ, শিক্ষা ও যোগ্যতা দিয়ে।
পা দিয়ে শুধু লেখেন না, সামলান দৈনন্দিন কাজও
বিউটির দক্ষতা শুধু পড়াশোনার খাতায় সীমাবদ্ধ নয়। পায়ের সাহায্যে সুন্দর করে লিখতে পারেন তিনি। পাশাপাশি নিজের দৈনন্দিন কাজও করতে পারেন পা দিয়েই।
এই সক্ষমতা এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের অভ্যাস, অনুশীলন ও নিজের ওপর আস্থা তাঁকে ধীরে ধীরে কাজগুলো আয়ত্ত করতে সাহায্য করেছে।
তাঁর জীবন দেখায়, শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও উপযুক্ত সুযোগ, সহায়তা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মানুষ নিজের দক্ষতা গড়ে তুলতে পারে। তবে সেই পথ সহজ নয়। প্রয়োজন হয় পরিবারের সমর্থন, শিক্ষার সুযোগ এবং এমন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে কাউকে তাঁর শারীরিক অবস্থার কারণে ছোট করে দেখা হবে না।
বিউটির শিক্ষাজীবনে পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতা সেই বাস্তবতারই একটি দিক তুলে ধরে।
এবার লক্ষ্য বিচারক হওয়া
আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর বিউটির সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের (বিজেএস) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বিচারক হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
তাঁর লক্ষ্য সিভিল জজ হয়ে মানুষের সেবা করা। বিশেষ করে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়াতে চান তিনি। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমাজে এগিয়ে চলার পথে কত ধরনের বাধার মুখোমুখি হতে হয়।
বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারলে নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে চান তিনি।
তবে বিচারক হওয়ার পথটি এখনো তাঁর জন্য একটি লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। বর্তমানে সেই প্রস্তুতিতেই সময় দিচ্ছেন বিউটি।
তাঁর বাবা বায়েজিদ হোসেন মেয়ের এই অদম্য পথচলাকে গর্বের বিষয় হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় শিক্ষক আজিজার রহমানও বিউটির প্রচেষ্টাকে সমাজের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন।
বিউটির গল্প শুধু অনুপ্রেরণার নয়, সুযোগেরও
বিউটি খাতুনের সাফল্যের গল্প শুনলে তাঁর ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রমের কথা সামনে আসে। কিন্তু এই গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে—শিক্ষার সুযোগ এবং সহায়তা পেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও উচ্চশিক্ষা অর্জন করে পেশাগত জীবনে এগিয়ে যেতে পারেন।
একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন সফল করতে শুধু ব্যক্তিগত চেষ্টা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা, প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা, আর্থিক সামর্থ্য এবং বৈষম্যহীন পরিবেশ। বিউটির ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের কিছু মানুষের সহযোগিতা তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রায় ভূমিকা রেখেছে।
তাই তাঁর অর্জনকে শুধু ব্যতিক্রমী ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়ে না। বরং এটি মনে করিয়ে দেয়, প্রতিবন্ধী মানুষের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা গেলে তাঁরাও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে পারেন।
জয়পুরহাটের প্রত্যন্ত গ্রামের যে মেয়েটি পা দিয়ে অক্ষর লিখে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন, তিনিই আজ আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। সামনে তাঁর লক্ষ্য বিচারক হওয়া।
বিজেএস পরীক্ষায় সফল হয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবেন কি না, তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে এখন পর্যন্ত তাঁর পথচলা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর শিক্ষার আকাঙ্ক্ষাকে থামাতে পারেনি।
বিউটি খাতুনের কাছে তাই পা দিয়ে লেখা শুধু একটি বিকল্প উপায় নয়; এটি নিজের ভবিষ্যৎ নিজের হাতে—অথবা বলা যায়, নিজের পায়ে—গড়ে তোলার দীর্ঘ অনুশীলন। তাঁর সেই যাত্রার পরবর্তী অধ্যায় এখন বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায়।





















