প্রিপেইড মিটারে রিচার্জে ০.৫% ছাড়, খরচ নিয়ন্ত্রণে বাড়ছে আগ্রহ
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:৪৫:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
বিদ্যুৎ ব্যবহারে খরচ নিয়ন্ত্রণ ও প্রিপেইড মিটারের ব্যবহার বাড়াতে রিচার্জের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট দিচ্ছে সরকার। এ ব্যবস্থায় গ্রাহকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জ করতে পারছেন, পাশাপাশি মিটারে অবশিষ্ট ব্যালেন্স ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাবও জানতে পারছেন। এতে বিদ্যুতের ব্যয় সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রিপেইড মিটারে অগ্রিম বিল পরিশোধের কারণে বিতরণ সংস্থাগুলোর রাজস্ব আদায় সহজ হয়। একই সঙ্গে মিটার রিডিং নেওয়া, বিল তৈরি ও বিতরণের জন্য জনবল নিয়োগ এবং যাতায়াত ব্যয় কমানো সম্ভব। অন্যদিকে, পোস্টপেইড মিটারে মাস শেষে বিলের পরিমাণ জানা যায় বলে আগে থেকে খরচের হিসাব রাখা তুলনামূলক কঠিন।
প্রিপেইড মিটারে মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে যেকোনো সময় রিচার্জ করা যায়। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার ভেন্ডিং স্টেশন, পিওএস এজেন্ট ও ব্যাংকের বুথ থেকেও রিচার্জের সুযোগ রয়েছে। ব্যালেন্স কমে গেলে মিটারে সতর্কসংকেত পাওয়া যায়। নির্ধারিত ‘ফ্রেন্ডলি আওয়ারে’ ব্যালেন্স শেষ হলেও জরুরি ক্রেডিট সুবিধায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটারের সুবিধার মধ্যে রয়েছে অগ্রিম রাজস্ব আদায়, সিস্টেম লস হ্রাস, ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ, লোড ব্যবস্থাপনা এবং বিলিংয়ের নির্ভুলতা বৃদ্ধি। এ ছাড়া জরুরি ব্যালেন্স, সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনেও বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ এবং ভাড়াটিয়া ও সরকারি আবাসনে বিলিংসংক্রান্ত জটিলতা কমাতেও এ ব্যবস্থা ভূমিকা রাখছে।
রিচার্জের হিসাবেই নিয়ন্ত্রণে বিদ্যুৎ খরচ
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রিপেইড মিটারের বড় সুবিধা হলো বিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যয় সম্পর্কে আগেই ধারণা পাওয়া। মিটারে কত টাকা রয়েছে, তা দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফলে মাস শেষে বড় অঙ্কের বিল আসার আশঙ্কাও তুলনামূলক কম থাকে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সালেহ হাসান বলেন, মাসের শুরুতে কত টাকা রিচার্জ করছেন, তার ওপর নির্ভর করেই তিনি মাসজুড়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। ঘরে বসেই সহজে মিটার রিচার্জ করা যায়। একই সঙ্গে অবশিষ্ট ব্যালেন্স দেখা যায় বলে প্রয়োজন ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহার না করার বিষয়ে তিনি এখন বেশি সচেতন।
বগুড়া শহরের নেসকোর গ্রাহক মুজাহিদ শেখ বাসসকে বলেন, অল্প কিছুদিন আগে তাঁর বাসায় প্রিপেইড মিটার বসানো হয়েছে। আগে মাস শেষে কত টাকা বিল আসবে, তা জানা যেত না। এখন পরিকল্পনা অনুযায়ী রিচার্জ করেন এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন থাকেন।
তাঁর মতে, প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটারে বিদ্যুতের মূল খরচ একই হলেও সচেতনভাবে ব্যবহার করলে প্রিপেইড মিটারে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
কীভাবে হিসাব হয় রিবেট ও অন্যান্য চার্জের
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, প্রিপেইড সংযোগ নিতে কোনো নিরাপত্তা জামানত দিতে হয় না। আবাসিক গ্রাহকের অনুমোদিত লোডের প্রতি কিলোওয়াটের জন্য মাসে ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার সরবরাহ করা সিঙ্গেল ফেজ মিটারের মাসিক ভাড়া ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেজ মিটারের ভাড়া ২৫০ টাকা।
প্রতি মাসের প্রথম রিচার্জের সময় ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া সমন্বয় করা হয়। এরপর অবশিষ্ট অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট যোগ হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, ২ কিলোওয়াট অনুমোদিত লোডের একজন আবাসিক গ্রাহক জানুয়ারিতে প্রথমবার ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া বাবদ ১৭১ টাকা ৬২ পয়সা কাটা হবে। রিবেট যোগ হওয়ার পর বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে জমা থাকবে ৮৩২ টাকা ৫২ পয়সা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো মাসে মিটারে ব্যালেন্স অবশিষ্ট থাকলে পরের মাসে নতুন করে রিচার্জ না করেও সেই টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। তবে কোনো মাসে রিচার্জ না করলে ওই মাসের এবং আগের মাসগুলোর প্রযোজ্য ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া পরবর্তী রিচার্জের সময় সমন্বয় করা হয়।
সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞের
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বাসসকে বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বেগ ও সমস্যা কমাতে এবং এ ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি বলেন, ডেসকোর অ্যাপে মিটারের অবশিষ্ট ব্যালেন্স ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। এসব তথ্য বিল নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বেগ কমাতে সহায়তা করতে পারে। জরুরি ব্যালেন্স ব্যবহারের সুবিধা থাকায় রিচার্জের টাকা শেষ হয়ে গেলেও সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এড়ানো সম্ভব।
শফিকুল আলমের মতে, প্রিপেইড মিটারের সুবিধা ও ব্যবহারবিধি সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি এবং গ্রাহকদের উদ্বেগ দূর করতে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে তথ্য প্রচার করা প্রয়োজন।
বিতরণ সংস্থাগুলোতে প্রিপেইড মিটারের চিত্র
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) প্রায় ২০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে ১২ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (নেসকো) ২৩ লাখের বেশি গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ এ ব্যবস্থার আওতায় এসেছেন।
ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো) জানিয়েছে, তাদের ১৪ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ জন গ্রাহকের মধ্যে ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৩৮১ জন প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৪ জন গ্রাহকের মধ্যে প্রিপেইড মিটার রয়েছে ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬২৭ জনের।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বাবিউবো) মোট ৪৬ লাখ ৫ হাজার ১৯ জন গ্রাহকের মধ্যে প্রিপেইড মিটারের আওতায় এসেছেন ৩৬ লাখ ৮ হাজার ৩৩১ জন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীন প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন প্রায় ১৫ লাখ।
নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেশের সব গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা হবে। এ সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নও অনেকাংশে এগিয়েছে। শুরুতে কিছু এলাকায় গ্রাহকদের মধ্যে এ ব্যবস্থা নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব থাকলেও বর্তমানে তেমন সমস্যা নেই। নেসকোর ৬০ শতাংশের বেশি গ্রাহকের প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) নূর আহমদ বলেন, প্রিপেইড মিটারে রিবেটসহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে, যা গ্রাহকের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে পারে। বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার অপরিহার্য। এ ব্যবস্থায় কার্যক্রমের বিভিন্ন ধাপ কমিয়ে আনা সম্ভব।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, প্রিপেইড মিটার নিয়ে তথ্য বা অভিযোগ জানাতে কেন্দ্রীয় হটলাইন ১৬৯৯৯ চালু রয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর নিজস্ব হটলাইনও রয়েছে।






















