শিশুর ডিএনএ পরীক্ষা কি চাইলেই করা যায়? রয়েছে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:১৪:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত ‘মিঠাই’ নামের এক শিশুকে ঘিরে সম্প্রতি নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এক দম্পতি শিশুটিকে নিজেদের সন্তান বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে, শিশুটির বর্তমান পরিবার সেই দাবি অস্বীকার করেছে। বিরোধের নিষ্পত্তিতে ডিএনএ পরীক্ষার দাবি উঠলেও বাংলাদেশে চাইলেই কি কারও পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের এই পরীক্ষা করানো সম্ভব?
সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সরাসরি করানোর সুযোগ নেই। এ ধরনের পরীক্ষার জন্য সাধারণত মামলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা আদালতের নির্দেশ প্রয়োজন হয়। সরকারি দুটি নির্ধারিত পরীক্ষাগারে এ পরীক্ষা করা হয়।
নিখোঁজ শিশুকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিঠাই’ নামের পেজে শিশুটির বিভিন্ন বয়সের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়। শিশুটির মা নিয়মিত এসব কনটেন্ট প্রকাশের পাশাপাশি নিজের ব্যবসার প্রচারণামূলক ভিডিওও শেয়ার করেন।
সম্প্রতি এক নারী শিশুটিকে নিজের সন্তান বলে দাবি করে ডিএনএ পরীক্ষার দাবি তোলেন। তাঁর অভিযোগ, শিশুটি বিক্রি হয়ে গেছে এবং এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
ওই নারী ও তাঁর পরিবারের দাবি, ২০২৪ সালে কামরাঙ্গীর চর এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া একটি শিশুর সঙ্গে ‘মিঠাই’ পেজে দেখা শিশুটির সম্পর্ক রয়েছে। তবে শিশুটির বর্তমান পরিবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘আমার সন্তান কোথায়’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বেসরকারি সংস্থা জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশন। সেখানে নিখোঁজ শিশুদের কয়েকটি পরিবার অংশ নেয়। তাদের মধ্যে কামরাঙ্গীর চর থেকে নিখোঁজ হওয়া একটি শিশুর পরিবারও ছিল।
পরিবারটির দাবি, বাসার সামনে খেলতে গিয়ে শিশুটি নিখোঁজ হয়। পরে তাকে ‘মিঠাই’ নামে টিকটকে দেখা গেলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করে পরিবারটি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় করা মামলার তদন্ত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে গেলেও শিশুটির সন্ধান মেলেনি।
অন্যদিকে, শিশুটির বর্তমান মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে দাবি করেন, নিখোঁজের ঘটনার অনেক আগেই তাঁর সন্তানের জন্ম হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির জন্ম ২০২১ সালের জুলাইয়ে এবং একই বছরের অক্টোবরে ‘মিঠাই’ পেজটি খোলা হয়। তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালের ২ মার্চ নিখোঁজ হওয়া শিশুটির ভিডিও তার আগেই পেজে প্রকাশ করা হয়েছিল।
তাঁর অভিযোগ, প্রায় দেড় বছর ধরে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে হয়রানি করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই শিশুটির মাতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, যা শিশুটির ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে কামরাঙ্গীর চর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আজহারুল ইসলাম জানান, তাঁর থানায় ওই নামে কোনো নিখোঁজ শিশুর তথ্য বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে তিনি জানান, এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই। অন্যদিকে, খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি সম্প্রতি ওই থানায় যোগ দিয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা বা জিডি হয়েছে কি না, তা যাচাই করে জানাতে হবে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি, ভিডিও কিংবা দুই পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে শিশুটির পরিচয় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনসম্মতভাবে ডিএনএ পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ডিএনএ পরীক্ষা কীভাবে কাজ করে?
ডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড হলো জীবদেহের জিনগত তথ্য বহনকারী উপাদান। বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তান জিনগত বৈশিষ্ট্য পায়। ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দুই ব্যক্তির মধ্যে জৈবিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নির্ণয় করা সম্ভব।
সাধারণত গালের ভেতরের কোষ থেকে সোয়াব নমুনা সংগ্রহ করে এ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ করে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নমুনার জিনগত বৈশিষ্ট্য তুলনা করে পিতৃত্ব বা মাতৃত্বের সম্পর্ক মূল্যায়ন করা হয়।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান জানান, ডিএনএ পরীক্ষা সাধারণত দুই ধরনের—ফরেনসিক ও ডায়াগনস্টিক।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্ষণ বা হত্যার মতো অপরাধের তদন্ত এবং অজ্ঞাত মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। অন্যদিকে, বংশগত রোগ বা নির্দিষ্ট জিনগত ত্রুটি শনাক্তের জন্য ডায়াগনস্টিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। এ ধরনের কিছু পরীক্ষা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও করা যায়।
কোথায় করা যায় পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের পরীক্ষা?
বাংলাদেশে পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে।
- পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি): সংস্থাটির ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষাগার।
- ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি: মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন সংশ্লিষ্ট ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতাধীন পরীক্ষাগার।
আবু সুফিয়ান জানান, কেউ কোনো শিশুর জৈবিক বাবা-মায়ের পরিচয় জানতে চাইলে এসব পরীক্ষাগারের মাধ্যমে পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে সরাসরি গিয়ে পরীক্ষা করানোর সুযোগ নেই। মামলা থাকতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতে পরীক্ষা করা হয়।
তিনি বলেন, এসব পরীক্ষাগার মূলত ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত। তাই সংশ্লিষ্ট মামলা বা আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া পিতৃত্ব-মাতৃত্ব নির্ধারণের পরীক্ষা করা হয় না।
ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আবেদন করবেন কীভাবে?
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ জানান, আদালতের আদেশ ছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সিআইডির পরীক্ষাগারে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় না। পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রেও আদালতের নির্দেশ প্রয়োজন।
তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ ধরনের পরীক্ষার জন্য কয়েকটি পথে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে:
- থানায় জিডি বা মামলা: শিশুর নিখোঁজ হওয়া বা পরিচয়সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে থানায় অভিযোগ জানিয়ে তদন্তের আবেদন করা যেতে পারে।
- আদালতে আবেদন বা মামলা: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরাসরি ঢাকার বিচারিক আদালতের আমলি আদালতেও মামলা করতে পারেন।
- আদালতের নির্দেশ: প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দিলে সংশ্লিষ্ট সরকারি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়।
- নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ: নির্দেশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। এরপর পরীক্ষার ফল তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা যেতে পারে।
ছুফি উল্লাহর বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের আদেশের ভিত্তিতেই সিআইডি এ ধরনের পরীক্ষা করে থাকে।
বিশেষ কিছু ক্ষেত্রেও প্রয়োজন হয় ডিএনএ পরীক্ষা
পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের মামলা ছাড়াও কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন, বিদেশে অবস্থানরত কোনো বাবা তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে নিজের কাছে নিতে চাইলে অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় পারিবারিক সম্পর্ক যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের নির্দেশে পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দাতা ও গ্রহীতার আত্মীয়তার সম্পর্ক যাচাইয়েও ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগারের কর্মকর্তা।
‘মিঠাই’ শিশুকে ঘিরে বিরোধের নিষ্পত্তি কীভাবে?
শিশুটিকে নিয়ে দুই পক্ষের দাবির সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রথমে নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ, মামলা বা জিডির নথি, শিশুর জন্মসংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। এরপর তদন্তের প্রয়োজন ও আইনগত প্রক্রিয়া বিবেচনায় আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে জৈবিক সম্পর্ক সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া সম্ভব।
তবে ডিএনএ পরীক্ষার ফল একাই নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, সম্ভাব্য অপরাধ বা শিশুর বর্তমান অভিভাবকত্বের সব প্রশ্নের নিষ্পত্তি করে না। এসব বিষয় নির্ধারণে তদন্তের অন্যান্য প্রমাণ ও প্রযোজ্য আইনও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুটির পরিচয় নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তি যেন নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় হয়। একই সঙ্গে শিশুটির ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তথ্য ও সূত্র : বিবিসি
























