দাম বাড়লেও কাটেনি সংকট, সিলেটে ১২ কেজির এলপিজি ২,৫০০ টাকা
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৫:১৭:২৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানোর পরও সিলেটে কাটেনি সরবরাহ সংকট। সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না রান্নার এই জ্বালানি। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। ফলে প্রতিটি সিলিন্ডারে গ্রাহককে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩৬৩ থেকে ৬৬৩ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।
নগরীর কিছু দোকানে তুলনামূলক কম দামে সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন। সেখানে ২ হাজার ৫০০ টাকার নিচে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ ভোক্তাদের। দাম বাড়ানোর পরও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় রান্নার জ্বালানি নিয়ে বাড়তি দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সিলেট নগরী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। রান্নার কাজে পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অনেক পরিবার এখন সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে বিক্রির কারণে পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় বাড়ছে। সরকার দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই মূল্যের সুফল পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা।
পরিবহন ব্যয়ের অজুহাত, বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের
এলপিজি পরিবেশকদের দাবি, কোম্পানি থেকে সিলিন্ডার সংগ্রহ করে সিলেটে নিয়ে আসতে পরিবহন খরচ বেশি পড়ে। এর সঙ্গে সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো, গুদামভাড়া, কর্মচারীদের মজুরি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যুক্ত হয়। এসব খরচ বিবেচনায় নিয়ে সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করলে তাঁদের লোকসান গুনতে হয় বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
সিলেট নগরীর সুবিদবাজার এলাকার এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে পাইকারি পর্যায় থেকে সিলিন্ডার কিনে একই দামে বিক্রি করলে তাঁদের কোনো মুনাফা থাকে না। এর বাইরে গ্রাহকের বাসায় সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার খরচও রয়েছে। এ কারণে বাধ্য হয়ে সিলিন্ডারপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা অতিরিক্ত নিতে হচ্ছে।
তবে ব্যবসায়ীদের ব্যয়সংক্রান্ত যুক্তির কারণে ভোক্তাদের বাড়তি দাম দেওয়ার চাপ কমছে না। বিশেষ করে যেসব পরিবার রান্নার জন্য পুরোপুরি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
এক মাসে দাম বেড়েছে ২৫২ টাকা
গত ৪ অক্টোবর অক্টোবর মাসের জন্য এলপিজির নতুন মূল্য ঘোষণা করে বিইআরসি। এতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। এর আগে সেপ্টেম্বরে একই সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ২৫২ টাকা।
কিন্তু নতুন মূল্য নির্ধারণের পরও সিলেটের বাজারে বিক্রয়মূল্য সরকার নির্ধারিত দামের কাছাকাছি আসেনি। বর্তমানে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে নির্ধারিত দামের তুলনায় গ্রাহকদের প্রায় ১৯ দশমিক ৮ থেকে ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ফলে মূল্য সমন্বয়ের পরও সাধারণ গ্রাহকদের দুর্ভোগ কমেনি। বরং নির্ধারিত মূল্য ও বাজারের বাস্তব দামের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কমিশন বাড়ানোর দাবি পরিবেশকদের
এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি পরিবেশক পর্যায়ে কমিশন ও পরিচালন ব্যয় সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, ২০২১ সালে পরিবেশকদের জন্য সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর পাঁচ বছরে পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু কমিশন না বাড়ায় বর্তমান ব্যয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানি থেকে পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত সিলিন্ডার পরিবহনে ব্যয় হয় ৫০ টাকা। ট্রাকে ওঠানো-নামানো এবং খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে খরচ হয় আরও ৩৫ টাকা। এ ছাড়া কর্মচারীদের মজুরি, গুদামভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য খাতে ব্যয় হয় ২৫ টাকা। সব মিলিয়ে এসব খাতে সিলিন্ডারপ্রতি ব্যয় দাঁড়ায় ১১০ টাকা।
এর সঙ্গে ৪০ টাকা মুনাফা যোগ করলে পরিবেশক পর্যায়ে সিলিন্ডারপ্রতি মোট ১৫০ টাকা প্রয়োজন বলে দাবি সংগঠনটির। অথচ বর্তমানে কমিশন নির্ধারিত রয়েছে ৫০ টাকা। সে হিসাবে পরিবেশকদের দাবি অনুযায়ী, সিলিন্ডারপ্রতি ১০০ টাকার ঘাটতি থাকছে।
গত ৬ অক্টোবর এ বিষয়ে বিইআরসিকে চিঠি দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি। চিঠিতে ব্যবসায়ীদের ব্যয় ও কমিশন সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজারে মূল্যসংক্রান্ত অস্থিতিশীলতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, বিভিন্ন কোম্পানির মূল্যতালিকায় পার্থক্য থাকায় বাজারে একই পণ্যের দামে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এতে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা সমস্যায় পড়ছেন। পাশাপাশি ভোক্তাদেরও বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি
সিলেটে এলপিজির সরবরাহ ও বিক্রয়মূল্য স্বাভাবিক না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। একদিকে পরিবেশকেরা কমিশন ও পরিচালন ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে গ্রাহকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পাওয়ায় তাঁদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, সরকার নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করা এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের যৌক্তিক ব্যয় বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাজারে প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতি যাচাই এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রি বন্ধে কার্যকর তদারকি না থাকলে ভোক্তাদের দুর্ভোগ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীদের ব্যয়সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ গ্রাহকদের ন্যায্যমূল্যে এলপিজি পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
























